১
আশ্বিনের ডাঁসা রোদ চিড়চিড় করছে, বাস থেকে নেমেই দৌড় মারলো পুপুল।—এইইইইই…পেছনে উদ্বিগ্ন নন্দিনী, একহাতে পুপুলে’র ওয়াটার বটল, ব্যাগ, অন্যহাতে হাত’টা ধরেই ছিলো, আচমকা হ্যাঁচকা মেরে কি করে যে ছুটলো, বগলে চেপে রাখা পার্স’টা মাটিতে পড়ে গেল ঝনাত্ করে! চোখের চশমা’টা হড়কে এলো নাকে, কী দুরন্ত যে হয়েছে ছেলেটা! হাড়-বজ্জাত একেবারে। রাস্তা’র দুপাশ থেকে হাঁ হাঁ করে ছুটে এসেছে লোকজন, তার আগেই সে পৌঁছে গেছে ওপারে, প্যান্ডেলে’র সামনে। ভাগ্যিস!! একমুহূর্তে দমবন্ধ হয়ে এসেছিলো নন্দিনী’র, আলতো ঢোঁক গিলে ধাতস্থ হবার চেষ্টা করে সে। একলহমায় থেমে গেছে সব গাড়ি’র চাকা অথচ সিগন্যালে তখন সবুজ রঙ। মহালয়া সবে পেরিয়েছে, আজ-কাল করে ছুটি পড়ে যাবে ইস্কুল-কলেজে। এ শহরে নন্দিনী নতুন, ছেলে’র বদলি’র চাকরি, বৌমার’ও, ওদের সংসারে দু’মাস হলো এসেছে, অভ্যস্ত হতে একটু সময় লাগে তো! রাকা খুবই ভালো মেয়ে, বারবার বলেছিলো,
— তুমি ওকে সামলাতে পারবে না মামনি, খুব দুষ্টু ও।
বাবু’র অফিসে’র একটি ছেলে,ওর ড্রাইভার, রোজ বাসে তুলে দিয়ে আসে, নিয়েও আসে। আজ নন্দিনী’ই জেদ করেছিলো,
—তোরা থামতো বাপু, আমি ঠিক পারবো। রিকশা, অটো, ট্যাক্সি কত কী আছে, আমি ওকে ঠিক নিয়ে আসবো।
দেখতে শান্ত কিন্তু দারুণ দুর্দান্ত পুপুল যে এই কাণ্ড ঘটাবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি নন্দিনী। আজীবন ছাত্র পড়িয়েছে, ইংরেজি’র মাস্টারনী’কে যে এমন নাকানিচোবানি খাওয়াবে নাতি, তা কে জানতো!?কিছু যে অঘটন ঘটেনি তাই রক্ষে! বাবু আর রাকা বারবার বলেছিলো তখন শোনেনি কথা, নাহ, মাথায় চড়েছে একেবারে, একটু শাসন করা দরকার। গম্ভীর হয়ে যায় নন্দিনী, পুপুল রাস্তার ওপার থেকে হাত নেড়ে ডাকে। ছদ্মরাগ দেখিয়ে নন্দিনী সাড়া দেয়না, কাছে গিয়ে বলে
—বাড়ি চলো, আর কখনও তোমায় আমি নিতে আসবো না।
বড় বড় চোখ তুলে তাকায় পুপুল, ছোট ছোট, মোটা মোটা আঙুল দিয়ে নন্দিনী’কে খোঁচা দেয়,
—সরি ঠাম! ওওওওওওও! সরি!
নন্দিনী পাত্তা দিচ্ছে না। অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, ট্যাক্সি’র জানলা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে শরতে’র ঝকঝকে নীল আকাশ, কচি কচি মেঘ।
২
রাতে সবাই একসাথে খেতে বসেছে, পুপুলে’র প্রিয় চিকেন স্ট্যু বানিয়েছে নন্দিনী, বাবু একটু স্পাইসি খেতে পছন্দ করে তাই ওর জন্য চিকেন-বাটার-মসালা। ছেলে’কে আর তেমন করে কাছে কোথায় পেলো! সারাজীবন গ্রামে মাস্টারি করে কাটলো নিজের, কোন সকালে বেরিয়ে যাওয়া আর বাবু’ও তো হস্টেলে হস্টেলে’ই কাটিয়ে দিলো।এই রিটায়ারমেন্টে’র পর যা একটু সময়, সারাজীবন মানুষ কেন যে ছোটে, কিসের জন্য? তা সে নিজেই কি জানে ঠিক করে? কতবার ওরা রাগ করেছে,বাবু বলেছে,
—মা, আমাদের কাছে এসে থাকো, আর কেন চাকরি করবে?! বাবা আর তুমি চলে এসো।
পারেনি নন্দিনী। এতদিনের অভ্যেস, ঘরকন্না, এসব ফেলে আসা যে কী কঠিন!
বাবু’র বাবা এতদিন অন্য শহরে এসে থাকার মানুষ না, অগত্যা…
নন্দিনী’ই ফাঁস করে পুপুলের কীর্তি। বাবু, রাকা দু’জনেই বকাবকি করে তাকে, কী সাংঘাতিক বিপদ হতে পারতো ইত্যাদি বোঝানোর পর, শাস্তিস্বরূপ রাকা ওকে ঘুম পাড়াতে নিয়ে চলে যায় ওদের বেডরুমে, এতদিন ঠামে’র কাছে শুতো সে, রাতে কত গল্প বলতো ঠাম,চুলে বিলি কেটে দিত, ফুঁ দিয়ে সুড়সুড়ি দিতো চোখের পাতায়! মনে মনে খুব রাগ হয় ঠামের ওপর। বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে পুপুল, বাবাই ফোনে কী সব দেখছে, মামমাম ক্রিম মাখছে আর গল্প করছে বাবাইয়ের সাথে, পুপুলের একদম ভালো লাগছেনা। স্কুল ছুটি পড়ে যাবে। রন, তুন্না, সৃজা,রিশান’দের সাথে কত্বদিন দেখা হবে না। ঠাম’ই পুপুলে’র সবচেয়ে ভালো বন্ধু। সেটা ঠাম জানেনা, ঠামে’র লেখা বইগুলো পুপুল দ্যাখে, বুঝতে পারেনা সব লেখা, ছবিও নেই, তবু দ্যাখে। ওর বার্থডে’তে সব বন্ধুদের বলেছিল ও,
—আমার ঠামে’র লেখা বই। দ্যাখো সবাই। আমি ছবি এঁকে জুড়ে দেবো, দেখবে খুব মজা লাগবে পড়তে।
সেই ঠাম’ই যে, বাবাই মামমাম’কে বলে দেবে এমন করে,ভাবেনি পুপুল! কী এমন করেছিলো সে, দুর্গাঠাকুর হচ্ছিলো তাই, অসুরটা’কে একবার দেখতে গেছিলো শুধু।
ওঘরে ঘুম আসেনি নন্দিনী’র ও। ইনবক্সে ক’টা মেল চেক করলো, পুজোসংখ্যা’র সম্মাননাস্বরূপ জবাবী মেল প্রকাশকদের, এটা-সেটা নাড়াচাড়া করলো অভ্যাসবশত, দু-একপাতা পড়া’র চেষ্টা, নাহ্! শুয়ে পড়লো সে। এই চন্ডীগড় শহর’টা ভারী পরিচ্ছন্ন, ফাঁকা ফাঁকা, অনেক লেক আর পার্ক আছে, তাই সবুজে ভরা। খুব ভালোলাগে নন্দিনী’র, বাবু রাকা যে যার কাজে ব্যস্ত, পুপুল’কে নিয়ে পায়ে হেঁটে কাছে-পিঠে ঘুরে বেড়িয়ে আসে, ছোটবেলায় তার দাদু ছোট্ট নিনি’কে নিয়ে ওরকম করে ঘুরে বেড়াতেন। নিনি তার ডাকনাম, দাদু ডাকতেন। দাদু’র কোলে-কাঁখে চড়ে, বড় হওয়ার প্রথম পাঠ নেওয়া।জীবনের শ্রেষ্ঠ সেইসব দিনের মধুর স্মৃতি নিয়ে আরও কয়েকটা জীবন অনায়াসেই কাটিয়ে দেওয়া যায়। ছোটবেলার গ্রাম, দুর্গাপুজো, ঢাকের আওয়াজ, নদীর চরা, মনে হয় যেন আগের জন্ম। সারাদিনে একটাও অংক ভুল না করলে দাদু বিকালে কেষ্ট ময়রা’র দোকানে গরম রসগোল্লা খাওয়াতে নিয়ে যেতেন। নন্দিনী জানতো, দু-একখানা ভুল হলেও ঠিকই জুটবে রসগোল্লা, তাইই কি সারাজীবন অংকে ভুল করে গেলো নিনি? পুপুল’কে কিইবা তেমন করে দিতে পারলো! ওর জন্মের পরপরই বাবু ট্রান্সফার হলো চন্ডীগড়, কলকাতায় থাকতে যেটুকু বা ঘনঘন যাতায়াত করতে পারা যেত, তাও গেল বন্ধ হয়ে। এখনও সেই টানাপোড়েন রয়েই গেলো। এবার তো শতরঞ্জি গোটানো’র পালা, প্রেসার চড়চড় করে চড়ে যাচ্ছে ভাদরের রোদের মতো, নানারকম আধি-ব্যাধি, এটা-ওটা ওষুধ-বিষুধ, ডাক্তার-ক্লিনিক লেগেই আছে! নিজের সামান্য বৃত্তে’ও আজ চলে যাওয়ার সুর। এই তো মাসকয়েক আগে একদিন লাইব্রেরী ফেরত সুকল্যাণের সাথে দেখা, সেই কোন কলেজবেলা’র বন্ধু, মাঝে মাঝে ফোনে এস.এম.এস বা দু’একটা কেজো কথা ছাড়া যোগাযোগের সুতো সরু হয়ে এসেছিলো, হঠাৎ দেখা হওয়ায় কী যে ভালোলেগেছিল তাদের, ভার্সিটি’র ছায়াঢাকা রাস্তায় পাশাপাশি হেঁটে যেতে যেতে কত কথা’ই না হয়েছিল। সেই সুকল্যাণ অবধি… স্ট্রোক, ভোররাতে বাথরুমে। শেষকৃত্যে ওর মুখে বিষাদ দেখতে যেতে আর মন চায়নি নন্দিনী’র। কোনদিন কার ডাক আসে! পুপুল কি ঘুমিয়ে পড়েছে? রাকা কিছু মনে করলো না তো! অন্ধকারে দূরে কোথাও টিপটিপ করে জ্বলছে নাগরিক আবাসনে’র আলো, মোবাইল ফোনের টাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে অনড়, পুজো মিটলেই ফিরে যাবে, অনেকদিন হলো এসেছে তো! বিয়ে হয়ে আসা ইস্তক ওই বাড়িটাতেই এতগুলো বছর কাটলো, একটা মায়া পড়ে গেছে আর কী! রাত, মানুষের চোখে যেরকম মায়া-কাজল পড়িয়ে দেয়! যে বোঝে, সে বোঝে!
৩
অঞ্জলি’র তাড়াহুড়ো’য় রাকা’র মাথার ঠিক নেই, কোথায় যে রাখলো পুপুলের পাঞ্জাবীখানা! এখানে প্রবাসী বাঙালি’রা মিলে বেশ বড়ো করে পুজো করে, অঞ্জলি, ভোগ, ধুনুচি-নাচ, ভাসান, একেবারে জমজমাট। পুপুল’কে সামলায় কার সাধ্যি! ছুটে বেড়াচ্ছে, তরতরিয়ে ওঠানামা করছে সিঁড়ি বেয়ে, নন্দিনী হিমসিম খাচ্ছে তাকে সামলাতে! বিরক্ত রাকা দুমদুম দু’ঘা বসিয়ে দেয় পিঠে, এমনিতেই তার শাড়ি পড়ে ওঠা হয়নি এখনও,
—খুব দুষ্টুমি হচ্ছে না? বাঁদর ছেলে, মাথা খারাপ করে দিচ্ছে একেবারে!
—আহ! মারলি কেন? আমি দেখছি।
আয় এদিকে, কি যে করিস! এই ধৈর্য্য নিয়ে ছেলে মানুষ করবি?
রাকা’কে কাছে ডাকে নন্দিনী, এমনিতেই ওয়ার্কিং ওম্যান’দের সারাটাবছর দৌড়ঝাঁপে কাটে, শাড়ি পড়ার সময় বা শখ কোনোটাই বাঁচে না, তার নিজেরও তো এমন দিন গেছে, মনে মনে মুচকি হেসে, রাকা’র শাড়ি’র নিঁখুত প্লিট করে দেয়। লাল ব্লাউজ আর অফহোয়াইটে লালে’র কাজ করা জামদানী’তে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে রাকা’কে। সে নিজে বিশেষ গয়নাগাটি পরতে কোনোদিনই পছন্দ করতো না, তবে, সাজাতে ভালোবাসে আজও নন্দিনী, বড় বড় কানে’র টপদুটো রাকা’কে পরিয়ে দিতে দিতে মনে পড়ে যায়, তখনও মা বেঁচে, পুজো-আচ্চা’য় গ্রামে’র বাড়িতে গেলে মা বলতো,
—কান, গলা খালি করে রাখিস কেন রে? যত অলক্ষণ।
নন্দিনী কোনোদিন ওইসব ধাতব মোহে ধরা দেয়নি, কখনও না। একঝাঁক অল্পবয়সী মেয়ের সাথে কলকল করে চলে যায় রাকা। পুপুল গোঁজ হয়ে আছে, ভালোই লেগেছে তার, গাল’টা এখনো লাল হয়ে আছে। কাছে ডাকে নন্দিনী তাকে,
— চলো পুপুল, আমরাও যাই ঠাকুরপুজো দেখতে!
—না।
ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে নেয় সে।
—এই তো, খুঁজে পেয়েছি পাঞ্জাবী’টা, তাড়াহুড়ো’য় তোমার মা, ফ্রিজে’র মাথায় রেখে দিয়েছিল। চলো, পরে নাও এবার, দেরি হয়ে যাচ্ছে তো!
—বললাম তো যাব না।
—কেন যাবে না পুপুলসোনা?
—তোমার মা ওরকম করে মারলে তুমি যেতে?
একঝটকায় নন্দিনী’র মনে পড়ে যায় একটা আবছা হয়ে আসা হলদেটে ছবি, গ্রামে’র পুজো, ঢাক বাজছে, ছোট্ট নিনি ঘ্যানঘ্যান করছে মায়ে’র কাছে, ঠাকুর দেখতে যাবার বায়না করছে, মা রান্নাঘরে ভীষণ ব্যস্ত, ভিন্ন হেঁসেল, আঁশ-রান্না, নিরামিষ আলাদা আলাদা,তিতিবিরক্ত মা দু’ঘা কষিয়ে দিতেই নিনি ভ্যাঁ, অতঃপর ঠাকুরদা’র সহায়তায় একখানি ছিটে’র জামা পরে, মাথায় ঝুঁটি বেঁধে ঠাকুর দেখতে যাওয়া। ট্রেনে’র ঝমঝম শব্দে’র মত ভীড় করে এলো সব স্মৃতি, পরিযায়ী পাখি’র ডানা’য় ভেসে।
— মা মারলে লাগে না পুপুল, এসো আমার কাছে।
নন্দিনী কাছে টানে, ঠিক যেমন করে ছোট্ট নিনি’কে তার ঠাকুরদা কোলে নিতেন। নাতি’কে সাজিয়ে-গুজিয়ে নিয়ে মন্ডপে’র কাছে আসতেই মন ফুরফুরে হয়ে যায় নন্দিনী’র। যে যাই বলুক, দুর্গাপুজো মাছে-ভাতে বাঙালি’র জেনেটিক প্লেজার। এই আবাসনে’র পুজো-কমিটি’র মানুষজন বেশ ভালো, সাবেকি সংস্কৃতি’র ঘেরাটোপে খুব ভালো আয়োজন করেছে, মাইকে স্তোত্রপাঠ হচ্ছে, একশ-আট প্রদীপ জ্বালানো হচ্ছে একধারে। বয়স্ক আবাসিকদের জন্য বসা’র ব্যবস্থাও করেছে। পুপুলের নজর ক্যাপ-গানে’র দিকে, ফটাফট ট্রিগার টিপছে, নিজেই এফেক্ট দিচ্ছে মুখে আওয়াজ করে
—ঢাঢাঢাঢাঢা…
কেউ আদর করে গাল টিপে দিলে তার প্রবল আপত্তি। পুপুল’কে হাত জোড় করিয়েছে নন্দিনী,
—ঠাকুর নমো করো পুপুল, বলো মা আমায় জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, বিবেক দাও, ভালো রেখো আমায়, তার সাথে সব্বাইকে।
ফিসফিস করে নন্দিনী। ওদিকে মন নেই পুপুলে’র। যাহোক করে ঠেলেঠুলে সামনে এগোনোর চেষ্টা করছে, পিছনে নন্দিনী। হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে বলে,
— ঠাকুর যদি সবাইকে ভালো রাখে তবে অসুর’টা কি করলো? ওকে মারছে কেন!? ও ঠাম…
নন্দিনী বলে,
—তোমায় বলেছি তো পুপুল, এখন নমো করো, আবার বলবো সে গল্প, অসুর তো দুষ্টু লোক ছিলো।
পুপুলের মনঃপুত হল’না ঠিক। ভীড়, ঢাকের আওয়াজ ছাপিয়ে শোনা গেলো না পুপুলের কথা।
৪
গোছগাছ প্রায় শেষে’র দিকে, ফ্লাইটে’র টিকেট কেটে দিয়েছে বাবু। প্রায়ই অফিস-ফেরত রাকা নিয়ে আসছে এটা-ওটা,
—আর ক’দিন থেকে যাও না মামনি। এই দ্যাখো, তোমার আর বাবা’র জন্য দুটো মাফলার নিলাম, এখানে উইন্টার ওয়্যার বেশ ভালো, সস্তাও। তোমাদের জন্য দুটো ভালো চাদর এনে দিই মামনি?!
_তোর কি মাথা’টা একেবারেই গেলো রে?
রাকা’কে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় নন্দিনী। বয়কাট চুল, টিকালো নাক,নাদুস-নুদুস রাকা’কে একঝলক দেখলে উঁচু ক্লাসের ছাত্রী বলে ভুল হয়! নিজের মেয়ে নেই বলেই কি এই মেয়েটাকে এত স্নেহ করে সে? দুহাতে তার কোমর জড়ায় রাকা,
—আবার কবে আসবে মামনি?
—এই তো, আবার এলাম বলে! পুপুল’কে না দেখে কতদিনই বা থাকবো বল?
— বাবা’কে নিয়ে এসো মামনি এবার, তা’হলে তোমার ফেরার তাড়া থাকবে না।
— ব্যবসাপত্তর ছেড়ে সে আসবে ভেবেছিস?
বাবু চিরকাল চাপা স্বভাবের, সেও ঘোরাঘুরি করে আশেপাশে,
— আমারও তো তোমাদের সাথে থাকতে ইচ্ছে করে মা। বাবা যদি এখনো না বোঝে!
চিরকাল বাপ-ছেলে’র সিদ্ধান্তে’র মাঝে পড়ে দীর্ণ হয়েছে নন্দিনী, আজও আর একবার সেই পুনরাবৃত্তি। পুপুল বড়ো বড়ো চোখ করে একটা অদ্ভূত প্রশ্ন রেখেছিল সেদিন,
—মা দুর্গা যদি সবাই’কে ক্ষমা করে দেয়, তাহলে অসুর’কে এখনো মারছে কেন?
—অসুর তো দেবতা’দের মেরে ফেলছিল, তাই মা দুর্গা অসুর’কে বধ করেছেন।
—সে তো আগে মেরেছিলো,এখন বাঁচাচ্ছে না কেন? তুমি তো বল্লে মা সব্বাইকে ক্ষমা করে দেয়!
আচ্ছা বেকায়দায় পড়েছে নন্দিনী, এ ছেলে সি.আই.ডি’র বাবা!
—দুষ্টু লোকে’র পুজো তবে কেন হচ্ছে, ও ঠাম, ওওওওওওওও,জেলে দিতে পারতো, মেরে ফেললো কেন একেবারে?
সেদিন পুপুল’কে মারা’র জন্য রাকা’কে বেশ একটু বকাবকিই করেছিল নন্দিনী, পুপুল সেটা মন দিয়ে শুনেছে কান খাড়া করে। অসুরের প্রতি সিম্প্যাথেটিক পুপুল, সবুজ রং অসুরটা’কে তার দুষ্টু লোক মনে হচ্ছে না একবারও। সেদিন স্কুল-ফেরত দেখেছে সে লোকটা’র বুকে লাল-রং দিয়ে রক্ত করে দিলো, যে ঠাকুর বানাচ্ছে,ওই দাদু। ও তো তবে আরও বদমাশ। তাকেও তো বাবাই’দের পুজো কমিটি থেকে কিসব পুরষ্কার দিলো, অষ্টমী’তে লুচি’ও খাচ্ছিল। ওকে কতবার সেদিন পুপুল বলেছিলো,
—এই সবুজ অসুরটা’কে কিন্তু মেরো না। বুঝলে? চারদিন ঠাকুরের পায়ের তলায় থাক, তা’হলেই জব্দ হয়ে যাবে। কাওকে মারতে নেই। আমার ঠাম বলে, সবাই ঠাকুরের জীব। বুঝলে?
ওই দাদু’দা বিশেষ পাত্তা দিলো না পুপুল’কে। মন দিয়ে ঠাকুরের কী যেন করছে!
—যাও দাদু, বাড়ি যাও, দ্যাখো তোমার ঠাম্মা কী বলছে তোমায়!
সেদিনের পর ঠাম’কে বলা হয়নি সেকথা পুপুলের।
গোছানো জামাকাপড়ে’র ব্যাগে’র পাশে এসে চুপটি করে বসে সে। তার মা আজ তাকে খেলতে যেতে দেয়নি বাড়ির সামনের পার্কে। অন্যদিন এখন সে হইহই করে ছুটে বেড়াতো। বিকেল ফুরিয়ে এলো, ফ্ল্যাটে’র আলোগুলো জ্বেলে দিয়েছে রাকা, ধূপে’র গন্ধ, দিন ফুরিয়ে আসা ক্লান্তি’র গন্ধ, মনখারাপের গন্ধ মিলেমিশে যাচ্ছে। কাল সকালে ফেরার ফ্লাইট।
—তুমি সত্যিই চলে যাবে?
পুপুল’কে কোলের ভেতর তুলে নেয় নন্দিনী, চুমো খায় চোখে, মুখে, খুদেমত নাকটায়,
—আমি আবার আসবো তো সোনা! তুমিও যাবে তো, ওখানে কত্ত বড়ো একটা ছাদ আছে। মনে আছে পুপুল? —না, তুমি যেওনা ঠাম!
গলা জড়িয়ে ধরে পুপুল, বুকের ভেতর মুখ গুঁজেছে, ফোঁসফোঁস করছে। অপত্য স্নেহে বুক উথলে ওঠে নন্দিনী’র, এই ষাটোর্ধ শুকিয়ে আসা বুকও। গলার কাছে একটা দারুণ কষ্ট দলা পাকায়!
৫
এয়ারপোর্টে’র ভেতর এসে ভিসা’টা হ্যান্ডব্যাগে আরেকবার দেখে নিতে বলে বাবু। জড়িয়ে ধরেছে রাকা, নাক -চোখ টসটসে,
—পৌঁছে একটা ফোন কোরো মামনি।
—হ্যাঁ রে, যা তোরা এবার,ফ্লাইট দিয়ে দিয়েছে। চোখে’র জল দেখাবে না বলে সাতসকালে চোখে সানগ্লাস’টা পরেছে নন্দিনী। পুপুল উদাসীন এদিক ওদিক তাকাচ্ছে যেন কিছুই ঘটছে না। চলে আসার সময় জড়িয়ে ধরেছে নন্দিনী
—ফিরেই তোমায় ভিডিও-কল করবো পুপুল। আমি আসবো আবার।
কানে কানে পুপুল কিছু বললো।সারা রাস্তা নন্দিনী’র কানে বাজছিলো
—তুমি খুব খারাপ, ওই সবুজ অসুরটা’র থেকেও খারাপ।