ভ্রমণ কথায় অমিতাভ দাস

অমিতাভ দাস । কবি , গল্পকার ও প্রাবন্ধিক । অবগুণ্ঠন সাহিত্য পত্রের সম্পাদক । প্রকাশিত বই ২৪টি । সদ্য প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ " বিষাদ-সুন্দরী ও লালপদ্ম " । পেয়েছেন নানা পুরস্কার ও সম্মান ।

শ্রীরামপুরে একদিন 

সেদিন একটা কাজে রিষরা গেছিলাম । কাজটা দ্রুত শেষ হয়ে গেল , হাতে ঘন্টা দুয়েক সময় । সঙ্গী দুইজন বললে , চলুন শ্রীরামপুর থেকে বেড়িয়ে আসি ।আমি খুব খুশি । একটা সুযোগ পেলাম ব্যস্ত জীবনে ।সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন পেয়ে গেলাম– মাত্র একটা স্টেশান ।
শ্রীরামপুর নেমেই আমার অতি পুরাতন এক বন্ধুকে ফোন করলাম । ফোন কয়েকবার বেজে গেল । বন্ধুর আর খোঁজ পেলাম না । ফলে দুই সঙ্গীসহ অটোতে চললাম মাহেশের পথে — জগন্নাথ মন্দির । অনেকটাই পথ । পৌঁছে দেখলাম রাস্তার ডানদিকে জগন্নাথ মন্দির , বা-দিকে বিরাট একটি রথ । মেলাটা কোথায় হয় ? বলতেই অটোঅলা ডাইনে একটা মাঠ দেখিয়ে বললে , এখানেই মেলা বসে । সেদিকে তাকিয়ে কল্পনায় একটা বৃষ্টিভেজা রথের মেলা দেখতে পেলাম । দেখতে পেলাম রাধারাণীকে , যে কাদা-জলে ঝড়বৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল । এসেছিল মালা বেঁচতে ।

আমরা জগন্নাথ মন্দির দেখলাম । ছবি তুললাম । মূর্তির ছবি তোলা যাবে না । প্রণাম করে মন্দির প্রদক্ষিণ করলাম । চমৎকার প্রভু জগন্নাথের রূপ মাধুর্য ।মন ভরে দেখলাম । বা-দিকে আরো কিছু ছোট ছোট মন্দির –শিব , হনুমানজী আছেন । একজন বয়স্ক মানুষ ভাগবৎপাঠ করছিলেন : ” সব মায়া , মায়া ত্যাগ করতে না পারলে মুক্তি নাই— রোজ একটু একটু করে মায়া ত্যাগ করতে হবে…”শুনতে শুনতে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম । নাটমন্দিরটি প্রাচীন কালের শৈলী বহন করছে । নাটমন্দিরে ঢোকার মুখে গৌর-নিতাইয়ের মূর্তি ।অনেকেই দেখলাম নাটমন্দিরে বসে গল্প করছে ।
রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম । এবার আমাদের গন্তব্য? বললে এক সঙ্গী । বললাম , শ্রীরামপুর কলেজ । এদিকে সন্ধ্যা নেমে আসছে । বাতিস্তম্ভে জ্বলে উঠেছে  আলো ।একটা টোটো এসে দাঁড়াল আমাদের সামনে ।
টোটোতে বসে বললাম শ্রীরামপুর কলেজ । টোটোঅলা লোকটি বেশ ভালো– খোলা মনের । অনেক গল্প করল । কেবল শ্রীরামপুর কলেজ নয় , রাজবাড়ি , শ্রীরামপুর গঙ্গার ঘাট , রাধাবল্লভজীর মন্দির , তারা মা মন্দির দেখিয়ে দিলো । ভালো লাগল তাঁর আন্তরিক ব্যবহার । এমন অনেক মানুষ থাকে যাদের সঙ্গে জীবনে আর কখনো দেখা হবে না , কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই মনের মধ্যে দাগ কাটে ।
হালকা শীতের সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে । মৃদু মৃদু উত্তুরে বাতাস । নতুন একটা জনপদ । আমার চোখে সকলি নবীন । দূর থেকেই দেখলাম শ্রীরামপুর কলেজ । মনে পড়ে গেল ইতিহাস –বাংলা গদ্য– ছাপাখানা— উইলিয়াম কেরি আরো কতো কী ।কাছেই নদীর ঘাটে কেরি সাহেবের সমাধি দেখে ফেরার পথে অটোঅলা দেখাল রাজবাড়ির একটি জীর্ণ পুরাতন ভগ্ন অংশ । আজো অতীতের সুবিশাল ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে ।কাছাকাছি একটি অতীত ঐতিহ্যশালী গীর্জাও দেখে নিলাম । বন্ধ ছিল । বিশেষ বিশেষ দিনে খোলা থাকে ।তাই বাইরে থেকেই একটা ছবি নিলাম । স্থানটি চমৎকার , পরিচ্ছন্ন ।

এরপর টোটো থামল রাধাবল্লভজীর মন্দিরের সামনে । চমৎকার পরিবেশ । সান্ধপুজোর আয়োজন চলছে । এই বিরাট আটচালার মন্দিরটি বৈষ্ণবদের কাছে তীর্থ বিশেষ । ১৭৬৪তে কলকাতার নয়নচাঁদ মল্লিক মন্দিরটি তৈরী করান । ছোট্ট চমৎকার নয়নাভিরাম মূর্তি রাধাবল্লভের । প্রণাম করে , মন্দির প্রদক্ষিণ করে আমরা চলে এলাম । হাতে সময় কম । ইচ্ছে করলেও বসা হল না ।
এরপর তারা মা মন্দির দেখা ফিরলাম । অটোঅলা স্টেশানে পৌঁছে দিল । বললাম , কত দেব ? সে বললে , আপনার যা ইচ্ছে । একশো টাকা দিলাম । সে খুশি মনে চলে গেল ।
টোটো থেকে নেমেই দেখি উল্টোদিকে বিখ্যাত বাঞ্ছারাম দাঁড়িয়ে । ঢুকে পড়লাম তিনজনে । প্রিয়ান আগে কখনো ধোকলা খায়নি । সে ধোকলা খেল পরম বিস্ময়ে । আমি আর মধু প্যাটিশ ও অন্য মিষ্টি খেয়ে ও মিষ্টি কিনে বাড়ি ফিরলাম । আবার একদিন ঠিক করেছি বাঞ্ছারামে মিষ্টি খেতে যাব , যেতেই হবে । তাঁদের আন্তরিক ব্যবহার আমাদের মুগ্ধ করেছে। ফেরার সময় বললেন , আবার আসবেন ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।