T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় অন্তরা দাঁ

তব অচিন্ত্য রূপচরিত মহিমা…
ঘন অন্ধকার, ঘোর অমাবস্যার ভোরে দৈববাণীর মতো ভেসে আসতো —
“আশ্বিনের শারদ প্রাতে, বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর… ”
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জাদুকন্ঠের বশীকরণে আমরা অবশ, সাত থেকে সাতাশি সব্বাই। আমার বাপ-পিতেমোর আমল থেকে একখানা সন্তোষ রেডিওতে আমরা মহালয়া শুনতাম। সে এক অলৌকিক রাত্রিযাপন। মা সজাগ করে দিতো,
—শুনছিস?
—হ্যাঁ…
দিব্যি গুটিশুটি মেরে তখন ঘুম আর জেগে থাকার মাঝামাঝি দুলছি। কানে আসতো ছেঁড়া ছেঁড়া ভাষ্য, গানের কলি। আকাশে তখনও দু-একটি তারা রাত শেষে ঘুমোতে যাবে ভোরের দেশে, সাগরপারে। নারকেলগাছের মাথায় পেঁচাদের তুমুল হইচই, ছানার সবজেটে জলের মত ঘোলাটে হয়ে আসতো রাত, ফর্সা ফর্সা হচ্ছে পূবের আকাশ। তখন রেডিওতে শেষ পর্যায় চলছে, এরপরই দূরদর্শনে শুরু হবে, তারই ফাঁকটুকুতে দুধ খেয়ে নেওয়ার তাড়া থাকতো, মা ততক্ষণে ঘেঁটি ধরে তুলে দিয়েছে, ঘুমচোখে দেখছি মারুলি পড়ছে দুয়ারে দুয়ারে, শাঁখের শব্দ… মা আসছেন !
পুজো তবে এসেই গেলো ! মা দুগ্গা মহিষাসুর বধ করে দেবতাদের ফিরিয়ে দিলেন হৃত স্বর্গরাজ্য। ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’, মর্ত্যবাসী মায়ের আরাধনায় ব্যস্ত, মা আসবেন বাপের ঘরে। গিরিরাজ আর মেনকার কন্যা সিংহবাহিনী দশভুজা দুর্গাপ্রতিমার আবাহন শুরু হয় বহু আগে। মহালয়া, সেই যজ্ঞে সীলমোহর দেগে দেয় যেন ! পিতৃপক্ষের শেষ দেবীপক্ষের শুরু, পিতৃপুরুষদের তিল ও জলদানের মাধ্যমে হয় তর্পণ। বাড়ি বাড়ি, সাজো সাজো রব তখন। মেয়ে বাড়ি আসছে যে, বাপের ঘরের যত্ন-আত্তি, ওই তো চারটে দিন। সম্বচ্ছর শ্বশুরঘরে থাকা, স্বামী শ্মশান-মশানবাসী, নেশা-ভাঙ করে, উমাকে আনতে তাই উদগ্রীব মা মেনকা। চারটে দিন ভালো-মন্দ খাইয়ে দাইয়ে, নাতি-নাতনিদের তোয়াজ করে তবেই সাধপূরণ হয়। মহালয়া, পুজোর অনুষঙ্গ, আর পুজো বাঙালির জেনেটিক প্লেজার। অকাল-বোধনে দেবীত্ব আরোপ করা হয়, হয় চক্ষুদান। সেই অচিন্ত্য রূপসাধনার নিবিড় সময় ! শাসন শাসন চোখের দেবীর আবাহন। শঙ্খে, চক্রে, পদ্মে, ত্রিশূলে সে এক অলৌকিক ভয়াল-সুন্দর মূর্তি। আবার স-পরিবারে, স-বাহনে বিবিধের মাঝে একতার একতারা ধ্বনি যেন শিশিরে শিশিরে বেজে ওঠে। পদ্মপলাশ চোখের দৃষ্টি তখন নরম হয়ে আসে, অকুন্ঠ বরাভয় বিরাজ করে স্ব-মহিমায়। রূপের মাঝে অরূপ হয়ে আছে যে ধ্যানমগ্ন বোধ তারই সাধনা করি আমরা, পত্রে, পুষ্পে, চন্দনে, মন্ত্রে, নবরূপে, নবশোভায়। এ এক উত্তরণ বইকি !
আমাদের জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন কবে হবে মা? মহালয়া ভোর একসময় সকাল হয়, নক্ষত্রের মতো ডাকের সাজের রাংতা, চুমকিতে ঝলমল করে ওঠে মন্ডপ,আম-বাঙালি চায়ের কাপে টাটকা প্রিয়া মারী ডুবিয়ে, নাকে চশমা এঁটে খবরের কাগজ পড়ে—দুগ্গাপুজোর পদ্মফুল তুলতে এসে রেললাইনের নয়ানজুলিতে পড়ে রইলো পনেরো বছরের মেয়েটির দেহ। ধর্ষণ করে খুন। প্রমাণ লোপাটের জন্য মুন্ডু ধড় থেকে আলাদা করে দূরে ঝোপে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুলিশী কুকুর দিয়ে সনাক্তকরণের কাজ চলছে।
মহালয়ার সকালে অসুরনিধন হলো কই? দলে দলে অসুরেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে, অশ্লীল হ্যা হ্যা করে, পুজোর নামে চলছে মচ্ছব। অঞ্জলি দিতে গিয়ে আজকাল ধূপ-ধুনোর ধোঁয়ায় মা’র মুখ দেখতে পাইনা, মন্ডপের ধারে প্রসাদ নেওয়ার প্রত্যাশায় দাঁড়িয়ে থাকা লাইনে ফুটে ওঠে অবিকল এক আদল, কবন্ধ মেয়েটির ভয়ার্ত চাহনি।
বরাভয় জগৎজননী মাতৃস্বরূপা, অভয় দাও মা !