টিকটিকির খুব ভালো লাগল । সাধুসঙ্গ ছাড়া মহৎ কাজ করা সম্ভব নয় । পেঁচা সহজে শেয়ালের সামনে আসবে না । আর শেয়ালের যেমন লোভ রয়েছে তেমনই রয়েছে ক্ষমতা । ওর আড়ালেই ইতর প্রাণিদের সংবিধান লেখার কাজ শুরু করতে হবে । শেয়াল সম্পর্কে বেশ সংশয় রয়েছে টিকটিকির । সম্পাদক-মণ্ডলীর বিশেষ সভাও শেয়াল ডাকছে না ।
নন্দ-মাস্টার ঘরে এসেই ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন নিয়ে বসে গেছেন । সেই নিলকন পার্কারের হলদেটে হয়ে যাওয়া পুঁথির ওপর এখন তাঁর যাবতীয় একাগ্রতা । তবে তিনি ইদানিং টিকটিকির আচরণে একটা পরিবর্তন টের পাচ্ছেন । কোন কথা না হলেও তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী এই টিকটিকি । নিঃসঙ্গ জীবন তাঁর এখন বেশ লাগে । এই বয়সে জ্ঞানচর্চা ছাড়া বাকি কিছু অনর্থই মনে হয় ।
তবে প্রাণিদের স্বাভাবিক শরীর-চর্চা ওঁকে উৎসাহ দেয় । জগিং করেন বলেই তো তিনি ফুটবল ভোলেননি । নিজের হাতেই লিকার ‘চা’ তৈরি করেছেন । সঙ্গে দুটো টোস্ট বিস্কুট । চোখ বুজে আরাম করে ‘চা’ পান করছেন নন্দ-মাস্টার । এই সময় জীর্ণ কাঠের টেবিলে ঝুপ করে শব্দ হলো । চোখ খুলে দেখলেন বহু বছরের সঙ্গী টিকটিকি জুলজুল চোখে তাঁকে দেখছে ।
কথোপকথনে চিরকালই অনীহা নন্দ-মাস্টারের । তিনি আজকাল মানুষের সঙ্গে কথা বলেন না । শুধুমাত্র ক্লাসের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ওঁর বন্ধু । তিনি ওদের ভালোবাসেন । কমন রুমে তিনি পারমুটেশন, কম্বিনেশনের অঙ্ক করেন । কখনও কখনও ক্যালকুলাস । সহকর্মীদের সঙ্গে একদম কথা বলেন না । তাঁরাও নন্দ-মাস্টারকে মানুষ পদবাচ্য মনে করেন না ।
আলাপ তিনিই শুরু করলেন ।
কি – হে টিকটিকি – তুমি দেখছি কয়েকদিন ধরেই বেশ চিন্তাক্লিষ্ট ।
টিকটিকি দুটো পায়ে ভর দিয়ে শরীরটা খানিকটা উঠিয়ে প্রণাম করল নন্দ-মাস্টারকে । বিগলিত হলেন নন্দ-মাস্টার । শ্রদ্ধা-ভক্তির চাষ এখন একদম নেই । অথচ এই ইতর প্রাণির কি অসাধারণ শিষ্টাচার বোধ ।
টিকটিকি বলল,
স্যার – ইতরপ্রাণিদের জন্য কি সংবিধান রচনা সম্ভব!
অবাক হয়ে গেলেন নন্দ-মাস্টার । সচরাচর তাঁর আচরণেই সকলেই অবাক হয় । আড়ালে – আবডালে, এমনকি কোন কোন অর্বাচীন প্রকাশ্যেই তাঁকে ‘পাগলা – নন্দ’ বলে ডাকে ।