।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় অভিজিৎ চৌধুরী

শ্যামল কংসবণিক

প্যাংগং লেক থেকে সুচরিতা একটা নীল পোস্টকার্ড পাঠিয়ে ভিডিও কল করেছে । সন্দীপ ধরতে পারল না , ব্যাংকে বেশ ভীড় । কয়েকদিন লক ডাউনের পর ব্যাংক খুললে ভীড় উপচে পড়ছে ।
দত্ত-দা বলল , ব্রাদার , তোমাকে কিন্তু ইয়াং অফিসার-ই মনে হয় । কে বলবে – এক বছর পর তুমি অবসর নেবে ।
সুযোগ বুঝে সন্দীপ দত্ত-দা কে প্যাংগং লেকের ছবিটা দেখাল আর মৃদু স্বরে বলল – সুচরিতা ।
দত্ত-দা খুব দ্রুত কাজ করতে পারেন , আর খুব রসিক মানুষ । একটাই দুর্বলতা বা সবলতা ঘুমোনোর আগে ২ পেগ ভ্যাট সিক্সটি নাইন ।
দত্ত-দা বলল – ব্রাদার , কি রোমান্টিক সব ব্যাপার তোমার ।
কাজ করতে করতে সামান্য হাসল সন্দীপ ।
স্বপ্না ইদানিং কবিতা লিখছে । সে লস অ্যাঞ্জেলস থেকে পাঠায় মাঝে মাঝে ।
কয়েকদিন ছুটি পেয়েছে । সন্দীপ আজ রাতে ব্যাংকের গাড়িতে বাড়ি যাবে । নবগ্রাম , রেলওয়ে স্টেশনের নাম কোন্নগর ।
দীপংকর মুম্বাই থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নবগ্রামে ফিরে এসেছে । মনটা খারাপ-ই বলা যায় । জুহু বিচের চেয়েও বারবার ফিরে আসছে ওদের নাট্যগোষ্ঠীর কথা । রূপম-দা, রিহার্সাল আর প্রতিটি শোয়ের পর স্ট্যান্ডিং ওভেসন পাওয়া ।
নবগ্রামের রাস্তায় দু-চাকার একটা সাইকেল নিয়ে বের হয়েছে । গলি ভুল হচ্ছে । বদল তো কিছু হয়েছে-ই । অবশ্য সেই মতিচ্ছন্ন চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব নেই , সবটাই হ্যালোজেন । কল্পনাগুলি আর নেই , অনেকটাই ঝকঝকে বাস্তব ।
একটা ঠিকানা তার বুকের মধ্যে রয়েছে – শ্যামল কংসবণিক । ওর স্টুডিও বলেছিল ধর্মডাঙায় । টুক করে সবটা মনে পড়ল দীপংকরের ।
কলেজের পিছন দিকটায় এসে সেই পুরোনো রেললাইনের গলি ধরল । কালভার্ট এখনও নীচু । দীঘল চেহেরার দীপংকর মাথাটা যতোদূর সম্ভব নামিয়ে যখন কালভার্ট পার করল – বেশ হাঁফ ধরল অনভ্যাসের দরুণ ।
একটি কিশোর ছেলেকে সামনে পেলো দীপংকর । সাইকেল থেকে নেমে জিজ্ঞেস করল – ভাই , শ্যামল কংসবণিকের স্টুডিও-টা দেখাতে পারো !
ছেলেটি বলল – উনি আমার বাবা । চলুন নিয়ে যাচ্ছি ।
মুম্বাইয়ের প্রবাসী বাঙালিদের পুজোয় শ্যামল কংসবণিকের দুর্গা প্রতিমা নিয়েছিল দীপংকর ।
পরে সন্দীপের কাছ থেকে শুনেছে – সুচরিতা , রিংকু – ওরাও নিউ জার্সি , লস অ্যাঞ্জেলসে শ্যামলের প্রতিমা নিয়ে গেছে ।
ছেলেটি একটি এক তলা বাড়িতে এলে ডাক দিলো – বাবা , তোমার বন্ধু এসেছেন ।
ক্ষীণ কণ্ঠে একটা আওয়াজ ভেসে এলো – স্টুডিও-তে নিয়ে আয় ।
শ্যামল কংসবণিককে মুখোমুখি দেখেনি বহু বহু বছর । কালো , রোগা চেহেরার একটা ছেলে স্কুলে সরস্বতী প্রতিমা নির্মাণ করেছিল । একেবারে অন্য রকমের প্রতিমা । তখনও অতো বছর আগে আর্টের ঠাকুরের চল হয়নি ।
স্টুডিও-তে ঢুকলো দীপংকর । সারি সারি দুর্গামূর্তি । শ্যামল লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে রয়েছে । মোটা হয়েছে অর্থাৎ শরীরে মেদ এসেছে ।
চশমাটা নাকের ওপর থেকে খানিকটা নামিয়ে শ্যামল বলল – আপনি কে !
দীপংকর – তোর ছেলেবেলার বন্ধু ।
মুখ দেখে বোঝা গেলে শ্যামল মনে করতে পারছে না ।
দীপংকর খানিকটা কাছাকাছি সময়ের চলভাষ দিয়ে সাহায্য করল ।
মুম্বাই-তে প্রতিমা নিয়েছিলাম তোর । প্রবাসী ক্লাবে ।
আরে !
এবার চিনতে পেরে লজ্জিত হল শিল্পী শ্যামল কংসবণিক ।
‘চা’ । দু-বার হাঁক দিলো শ্যামল । ভিতর থেকে জবাব এলো ‘দিচ্ছি’ ।
তখনই সন্দীপ আরেক বন্ধু শংকরকে নিয়ে ঢুকল । সন্দীপ চীৎকার করে বলল – ম্যাডাম , ৪ টে হবে । লিকার , চিনি ছাড়া।
দীপংকরের দারুণ লাগলো একসঙ্গে পুরোনো বন্ধুদের দেখে ।
সন্দীপ , আমাদের সবার কি মধুমেহ !
না হোক । অতিরিক্ত শর্করা তো কাজের জিনিস নয় ।
সন্দীপ এবার শংকর দত্তের দিকে তাকিয়ে বলল – বৈশাখী ফোন করেছিল !
শংকরের সামনের দিকের মাথার চুলটা খানিকটা নেই কিন্তু চমৎকার হাসিটা এখনও লেগে রয়েছে ।
সন্দীপ আবার বলল – বৈশাখী , ফোন করেছিল ।
শংকর বলল – শালা , আমার কি !
সন্দীপ হেসে বলল – তুই কি যেন কি বলতিস !
গাইতিস , সরি !
দীপংকর বলল – কেসটা কি বলতো !
শংকর-ই বলল – দীপক স্যারের কোচিনে মেয়েদের ব্যাচে বৈশাখী আসত ।
সন্দীপ বাকিটা বলল – আর তখনই শংকর গাইত – এক বৈশাখে দেখা হলো দু-জনার ।
এবার ‘চা’ চলে এলো । লিকার ‘চা’ সঙ্গে সিঙ্গারা ।
সামান্য একটু মাটির প্রলেপ প্রতিমায় লাগিয়ে হাত ধুয়ে নিলো । সকলের হাতে স্যানিটাইজার দিলো ।
এবার শংকর বলল – কোভিডে তোর প্রতিমার বাজার কেমন !
শ্যামল বলল – ভালো না ।
দীপংকর বলল হঠাৎ – আমরা ৩ জন তোকে অর্ডার করলাম । মুম্বাই , বীরভূম , নবগ্রাম ।
শংকর বলল – রাইট । আমার বাড়ির প্রতিমা তুই-ই তো দিস ।
শ্যামল হেসে ঘাড় কাঁত করল ।
তারপর বলল – মুম্বাই-তে পুজো হবে !
দীপংকর ঠিক জানে না আর পুজো হবে কিনা !
তবু সে মিথ্যে করেই বলল – হবে । পকেট থেকে ৫০০০ টাকা বের করে বলল – অ্যাডভান্স ।
সন্দীপও ২০০০ টাকা দিলো । বাড়ির পুজোতো আছেই । শ্যামলের প্রতিমা হোক তবে এবার ।
সিঙারা , চা খেয়ে সন্দীপ বলল – এক জায়গায় যেতে হবে আমায় !
শংকর আর দীপংকর বলল – কোথায় !
শর্মিলার শরীরটা একদম ভালো নেই ।
আমরাও যাব ।
ওরা চলে যেতে শ্যামল কাজে ডুব দিলো ।
ভাদ্র মাসের আকাশে গুমোট সংকেত । হাওয়া নেই একটুও । প্রকৃতির কোন দাক্ষিণ্য নেই এবার । এক মরণ ভাইরাস মৃৎ শিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছে । বন্ধুদের দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে কাজে শ্যামল কংসবণিক ।
ভাদ্র এক সময় শেষ হল । আশ্বিন এলো । ঢাকের বাদ্যি মৃদু হলেও শোনা যাচ্ছে ।
দীপংকর , সন্দীপ , শংকর । প্রতিমার মুখে আশ্চর্যভাবে তাদের সেই হারানো বান্ধবীদের ছাপ । কোথাও লাস্য , কোথাও সুখ , কোথাও বা অন্তর্লীন বেদনা ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।