গল্পেসল্পে আলিনূর চৌধুরী (পর্ব – ৪)

তুলির অন্তর্ধান
সকালে তুলি ঘুম থেকে উঠলো না। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকলো।ঘুম থেকে জাগতে দেরি দেখে শাশুড়ি ঘরে ডুকলো। দেখলো নুরল ঘরে নেই।
ও বউ মা।কি ব্যপার, ঘুম থাইকা উঠোনা যে! তুলি কোনো কথা বললো না,ঘুমের ভান করেই শুইয়ে রইলো। শরীর খারাপ ভেবে শাশুড়ি কপালে হাত দিলো জ্বরটর হলো কিনা- গায়ে তো কোনো জ্বর নাই। তাইলে বউ মার কি অইলো! আবার ডাকলো শাশুড়ি- ও বউ মা ; উঠো না ক্যা! কি অইলো তোমার! বাড়ির কথা মনে পরছে ?
হ! বুঝছি, মেলা দিন অয় আইছো তো, তাই বাপ মায়ের কথা মনে অইছে।
খারাপ লাগলে কও, বাড়িত খবর পাঠাই। তোমার বাপ আইসা নিয়া যাইক।
তুলি কেঁদে ফেলে।
হতভম্ভ হয়ে যায় শাশুড়ি ; কি অইছে কওতো?
মা, বাড়ি যামু । ভালো লাগতেছে না। কষ্ট অয়।
রাতের ঘটনা প্রকাশ করলো না।
ঠিক আছে যাও। খবর পাঠালো।
সস্তি পেলো তুলি।
হাছেন শেখ খবর পেয়ে তুলিকে বাড়ি নিয়ে এলো। তখন সবে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। বাঁশ ঝাড়ে পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত। বাড়িতে ডুকেই মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো তুলি। কান্না দেখে তুলির মা হতভম্ভ হয়ে গেলো।মেয়ের আবার কি হলো? জিজ্ঞেস করলো- তোর কি হইছে? কান্দোস ক্যা, আমাকে খুইলা ক তো?
মার বুকে মুখ লুকিয়ে তুলি বললো- মা, ও বাড়িতে আমি আর যামুনা।
-তুই কি কইতাছোস? যাবি না ক্যা?
ও বাড়িতে আমার ভাল্লাগেনা। তোমাগোর জামাই ভালো না,খারাপ মানুষ। রাইতে ডাকাতি করে।আমি কইছিলাম দেইখা, আমার গলা চাইপা ধরছিলো। ছুরি দিয়া গলা কাইটা ফালার ভয় দেহাইছে।আমি আর ঐ বাড়িতে যামুনা কইতেছি। তুমি বাজানেরে কইও।
মায়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো।কি হলো বুঝতে পারলো না,ভাবনায় ঘুরপাক খেলো- ভালো বাড়ি, ভালো সংসার দেখে বিয়ে দিলাম তাও সমস্যা হইলো। সরকার বিয়াই কইলো ভালো সমন্ধ, ছেলে ভালো, তুই কইতাছোস খারাপ, কি হুনাইলি তুই!
হ। ঠিকই কইছি। যা দেখছি, তাই কইলাম।এক বিন্দু মিছা কইনাই আমি।
আইচ্ছা।তুই ঘরে যা। দেহি; তোর বাজানেরে কয়া দেহি কি কয়।
তুলি ঘরে ডুকেই ডকডক করে এক গ্লাস পানি খেলো। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে চৌকিতে বসে পড়লো। মনে জমানো কষ্টের কথাগুলো বলতে পেরে নিজেকে অনেক হালকা লাগলো।যেন সস্তি পেলো।
শনিবার বিকেলে ফুলমতি এলো তুলিদের বাড়ি। তুলির সাথে দেখা করতে। ফুলমতি তুলির সই। একই গাঁয়ে বাড়ি। উত্তরপাড়ার ছমির মৃধার মাইজলা মেয়ে। তারা বাল্য সখি,খেলাধূলা,ঘুরে বেড়ানো গ্রাম্য মেলা দেখা ও ঈদ উৎসব সবই এক সঙ্গে হতো। বছর তিনেক আগে ফুলমতির বিয়ে হয় ভাটির গাঁয়ে। বর কারখানায় কাজ করে।দুই এক মাস অন্তর অন্তর বাড়ি আসে। আসার সময় ফুলমতির জন্য কত কি নিয়ে আসে! দেখে ফুলমতির মনটা ভরে উঠে।
ফুলমতি এসেই তুলির ঘরে ডুকলো। ডুকেই সইকে জড়িয়ে ধরলো।তুলি ফুলমতিকে বললো- কিবা আছো সই? মেলা দিন অয় দেহি না তোমায়। তোমার পোলাডারে আনো নাই? কতবড় হইছে এহন?
ভালোই আছি সই। পোলাডা বাইড্ডাগে পোলাপানের সাথে খেলাইতেছে, তাই আনি নাই।
যাইকগা তুমি কেমুন আছো তাই কও সই । হুনলাম তুমি নাকি পোয়াতি হইছো। মাইনকার মাও হেদিন কইলো। হুইনা ভালো লাগলো, তয় কয় মাস হইছে?
ভালো নাই সই। মনে মেলা কষ্ট। এ কষ্টের কোন পার নাই।
কি কষ্ট সই! আমারে খুইলা কওছে!
পরথম যে দিন হশুর বাড়ি যাই,তহন এসব কিছুই জানতাম না। কোনো দিন টেরও পাই নাই। যহন ছয় মাস কাটলো, পেটে বাচ্ছা আইলো তহন টের পাইলাম।
থামলা ক্যা সই! কও, কি টের পাইলা?
আমার জামাইডা ভালো না। একটা খারাপ মানুষ।
কও কি সই! কি খারাপি করে?
তোমারে কইতে বাধা নাই সই। তয় হোনো- মানুষটা রাইতে ঘরে থাকে না। সারা রাইত বাইরে থাকে শেষ রাইতে ঘরে ফেরে। রাইতভর বাইরে কি করে আগে বুঝিনাই। এহন সব জাইনা গেছি। দলবল নিয়া নদীতে ডাকাতি কইরা বেড়ায়।
থামলা ক্যা? তারপর!
একদিন কইছিলাম বইলা, আমার গলা টিপা ধরছিলো,ছুড়ি বারকইরা গলায় ধরে, তারপর শাসাইয়া বলে – সাবধান কাওরে বললে কল্লা কাইটা ভাসাইয়া দিমু। কাক পক্ষিও টের পাইবো না।
কি ভয়ানক! এত খারাপ লোক! কেমনে থাকো সই? এরকম একটা মানুষের সাথে।
কি করমু সই? বুঝি না। তাছাড়া পেটে বাচ্ছা। তাও মা’রে কাইল কইছি, মা আমি আর ঐ বাড়ি যামুনা; বাজানেরে কইও।
সই,তোমার কষ্ট হুইনা আমারই কান্দোন আইসে।আমি কই কি, চাচাজান কে সব খুইলা কও। তারা নিশ্চয় একটা উপায় বার করবো। লুকাইও না কিছু।
আমিও তাই ভাবছি সই, রাইতে কমু।
ফুলমতি আনমনা হয়ে যায়, ভাবে তার জামাইটা কত ভালো মানুষ। আদর সোহাগের কমতি নেই।বাড়ি আসার সময় কত কি নিয়ে আসে। নিজ হাতে মুখে তুলে দেয়। যে কয়দিন বাড়ি থাকে একদন্ড চোখের আড়াল হতে দেয় না। লজ্জায় মাথা কাটা যাবার অবস্থা। সবই কপাল। এসব শুনলে সই আরো মন মরা হয়ে যাবে তাই তার জামাইয়ের কথা পারলো না। মনস্থির করে ফুলমতি বললো- সই একমাস অইলো বাড়ি আইছি। কাইলকাই চইলা যামু। তয় আসি সই – তুমি ভালো থাইকো।
ফুলমতি সাথে তুলিও চিকুর কদমতলা পর্যন্ত আগাইয়া গেলো।
চলবে