কলকাতাকে ভালোবেসে অনুষ্কা চ্যাটার্জী

কল্লোলিনী মহানগরীকে খোলা চিঠি

প্রিয় প্রাণের শহর….
শুভ জন্মদিন কলকাতা!
বিগত কয়েক বছরে তোমাকে অনেকটা কাছে পেয়েছি; আপন করে পেয়েছি। তোমার পরতে – পরতে বহু নোনতা – মিষ্টি স্মৃতি জড়িয়ে আছে, যা আমার আগামীদিনের পথ চলার পাথেয় হয়ে থাকবে। অকস্মাৎ একই পরিবেশনায় সমগ্রটা না; বরং সময়ের সাথে – সাথে মন্থরগতিতে একটু – একটু করে তোমায় আস্বাদন করে প্রেমে পড়েছি তোমার। কখনো হার্ড রক ক্যাফের উদ্দাম – মাতাল লয়ে গা ভাসিয়েছি, আবার কখনো স্রোতস্বিনী গঙ্গার ঘাটের শান্ত – স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছি। তোমার প্রতিটি কোণে আধুনিকতা ও প্রাচীনত্ব ঠিক এমনই হরিহর আত্মারূপে বিরাজ করে। ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভাবে নিজেকে উজাড় করে আমার সাথে একাত্ম হয়ে ওঠাতে কোনোদিনই বিমুখ হওনি তুমি। এইভাবে কিছুদিনের মধ্যেই যে তুমি কিভাবে আমার সুখ – দুঃখের সাথী হয়ে উঠলে তা আজও সঠিক ভাবে ব্যক্ত করতে পারবোনা হয়ত। আজকাল আমি তোমায় ছেড়ে এসে খুব একটা ভালো থাকতে পারিনা; বড় মন কেমন করে তোমায় ছাড়া। কি অদ্ভুত অথচ কি দৃঢ় এই মানসিক টান! আমার চারিত্রিক পূর্ণতা লাভ তোমার বুকেই; আমার সমস্ত আনন্দ ও বেনামী মনখারাপের কেন্দ্রবিন্দু তুমিই। তোমার অচেনা অলিগলিতে হাঁটতে হাঁটতে কত বার নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চেয়েছি, হারিয়েছি; পরক্ষণেই আবার খুঁজেও পেয়েছি। আমার সংবেদনশীল অথচ স্বনির্ভর স্বত্তা কে গড়ে তোলার পিছনে তোমার অবদান একজন মায়ের চাইতে কিছু কম নেই। তোমার সাথে আমার যে আত্মার সম্পর্ক নাড়ির টানের সমান বিশুদ্ধ, তা অনস্বীকার্য।
জানো চার বছর আগেও তুমি আমার পছন্দের খাতায় সামান্য একটি নাম হিসেবেও ছিলেনা। প্রথম যখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে বিভোর হয়ে তোমার কাছে আসি, বড় বিপদজ্জনক লাগতো তোমায়; বাড়ির স্বাচ্ছন্দের জন্য মন ছটফট করতো। আমি আবার বরাবরের সহজ সাধারণ ঘরোয়া মেয়ে কিনা! তখন চোখ শুধুমাত্র তোমার চমক ও আতিশয্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছিলো, যা আমার একদম ভালো লাগতো না। দমবন্ধ হয়ে আসতো রুক্ষ কংক্রিটের জঞ্জালে। তখন তো জানতামই না যে এই নীরস কাঠখোট্টা চেহারার বাইরেও তোমার আরো অনেক মায়াময় মনোমুগ্ধকর রূপ আছে, কাব্যিক লাবণ্য তোমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য! তোমায় চিনে উঠতে সময় লেগেছিল ঠিকই কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে যে অতুলনীয় আনন্দ ও তৃপ্তি ছিল সেটা হয়ত আমার পক্ষে ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়; কারণ কিছু আবেগ শুধুমাত্র মন দিয়ে অনুভব করেই উপভোগ করা যায়, চাইলেও বলে বোঝানো যায়না।
আজ তুমি যে বড় প্রিয়; বড় স্বীয়। যবে থেকে তোমার সাথে সখ্যতা হয়েছে তবে থেকে তোমার উপচে পরা ভালোবাসা মন ভরে গ্রহণ করেছি। আমি যে সেই মানুষটির কাছেও সারাজীবন আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবো যে আমায় হাতে ধরে স্নেহভরে তোমার প্রত্যেকটি অণু – পরমাণু চিনিয়েছে; আগামী দিনে আরো অন্তরঙ্গভাবে চেনাবে সেই আশায় আছি। এই হৃদিটান অগ্রাহ্য করার রূঢ় ক্ষমতা বা চেষ্টা কোনোটাই আমার নেই; তাই বারে বারে ছুটে এসেছি, তোমার সাথে মিলেমিশে এক হয়ে যেতে, তোমার সকল প্রাকৃতিক জাগতিক খামখেয়ালি মুহূর্তগুলোর রোদ – ঝড় – বৃষ্টির সাক্ষী হতে; ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম হবেনা। তুমি যে মানুষকে তোমার নরম শীতের আবেশের ন্যায় নিখাদ ভালোবাসায় মুড়তে জানো; তোমার আমায় দেওয়া আজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও আশা করি মিথ্যে নয়! আজ কতদিন হলো, করোনা নামক ভয়ংকর জেদী মহামারী তোমার স্নেহ – মমতা থেকে বঞ্চিত করেছে আমায়; তাই এই বিচ্ছেদকালে বসে কিছু মধুর স্মৃতি – উদযাপনের মধ্যে দিয়ে ব্যাকুল মনকে একটু সান্তনা দেওয়ার উদ্দেশেই তোমায় এই চিঠি। কথায় বলে, সাময়িক বিচ্ছেদ নাকি সম্পর্কে মাধুর্য আনে। এই অজুহাতেই আজকাল অবুঝ মন শান্তি খোঁজে, অপেক্ষা নামক পাঁচন গলাধঃকরণ করি। জানি আবার ফিরে যাবো তোমার কাছে, তোমার বুকে মুখ গুঁজে আহ্লাদ করবো আবারও। এখনও যে তোমায় পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে জানা বাকি; তোমার রহস্যময়ী সত্বার গভীরতা মাপা বাকি।
ততদিন ভালো থেকো কলকাতা। শীঘ্র সেরে ওঠো। মহামারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ভোরের শিশিরের মতো স্মিত হাস্যে আগের মতোই অতুলনীয়া হয়ে ওঠো। প্রেমে থেকো, অপ্রেমে থেকো, সুখে থেকো, দুঃখে থেকো, হাসিতে থেকো, কান্নাতে থেকো; সর্বোপরি তোমায় অগাধ বিশ্বাস করে যেসকল মানুষ তোমাকে আঁকড়ে বেঁচে আছে, যাদের তুমিই একমাত্র সম্বল, তাদের পাশে থেকো! তোমার বুকে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা সকল সুন্দর ঘটনারা পূর্ণতা পাক! দীর্ঘায়ু হও! সবার নয়নের মণি হয়ে চিরকাল হৃদকমলে বিরাজ কর। হাজার ব্যস্ততা, অভাব – অনটন ও নাছোড় আতঙ্কের মাঝেও সমগ্র কলকাতাবাসীর মনে আন্তরিক ভালোবাসা ও মানবিকতার যোগান দিতে ভুলো না যেন। তোমার কাছের মানুষগুলো যে আজও তোমার মুখ চেয়ে পুরোপুরি আবেগবিহীন কতগুলো যন্ত্র হয়ে ওঠেনি; সেটাই তো তোমার সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব। তুমি তোমার অফুরন্ত সৌন্দর্য ও মায়া নিয়ে স্বমহিমায় মাথা তুলে বেঁচে থেকো।
অনেক শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা!
ইতি
এক মনেপ্রাণে কলকাতাপ্রেমী
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।