হৈচৈ গল্পে অরূপ চট্টোপাধ্যায়

ফিরে দেখা

[ধরা যাক – এই ছিন্নপত্র- এর “আমি” চরিত্র টি বিগত নব্বই দশকের কোনো মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি , যাঁর নিভৃত একাকী জীবন কাটছে তখন উত্তরবঙ্গে ]

বন্ধুবরেসু,
সোনালী বিকালের বিদায়ী আলোর আভা যখন হারিয়ে গেলো দিগন্তরেখার ওপারে , যখন ইউক্যালিপটাস গাছের মিষ্টি গন্ধ আর পাহাড়ী নদীর চলার ছন্দ ভরিয়ে তুললো বাতাস – তখন সন্ধ্যার আকাশে ছায়াপথটিকে দেখতে দেখতে মনে পড়লো তোমাকে ।
যেন স্মৃতির ছায়াপথ ধরে আমাদের ছাত্রজীবনের কলকাতা এলো মনের মণিকোঠায় ।
তাই ঝর্না কলমের কালি আর বুকভরা একরাশ নস্টালজিক আবেগ উজাড় করে – স্মৃতিভরা হরফ আঁকতে শুরু করলাম সাদা কাগজটার বুকে ।
মনে পড়ে তোমার সৈকত-কে? প্রেসিডেন্সি-র ইকনমিকস অনার্স-এর সেই মেধাবী সৈকত ! কলেজে , খেলার মাঠে , কফি হাউসের মজলিশী মেজাজে অথবা সফদর হাশমী-র নাট্য পরিবেশনাতে সে ছিল সেরাদের একজন । নামের সাথে কতই না তার বিশেষণের বাহার । শুভানুধ্যায়ীরা বলতো “প্রগতিবাদী” , সমবয়সী বন্ধুরা বলতো “বিপ্লবী” , পরশ্রীকাতর নিন্দুকরা বলতো “ফেরেব্বাজ , মাতব্বর” । বাপ্ মা হারা ছেলেটা মানুষ হয়েছিল ওর অর্থলিপ্সু কাকার কাছে। ওর জীবনের ছকটা এইভাবে উল্টে পাল্টে যাবে, সেটা বোধহয় ও নিজেও ভাবে নি । তাই বাহাত্তর সালের সেই ভয়াবহ দুপুরে , মধ্য কলকাতার ছাত্র – পুলিশের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ওর গুলিবিদ্ধ লাশ যখন পাওয়া গেলো লাশকাটা ঘরে , তখন তুমি বা আমি কেউই সেটা মেনে নিতে পারি নি।
মনে পড়ে আমার শৈশবের সহপাঠিনী চাঁপার কথা । এন্টালি বস্তি-র সেই ছোট্ট চাঁপা । ওর অল্প বয়সেই ওর মজুর বাবা প্রাণ হারিয়েছিল মিলের মেশিনে পড়ে গিয়ে। সংসারের বোঝা তাড়াতে, এক দালালের কাছে ওকে বেচে দিয়েছিল ওর সৎমা । পরে জানা গিয়েছিল , ক্ষুন্নিবৃত্তি- র তাগিদে চাঁপাকে বেছে নিতে হয়েছিলো সোনাগাছি পাড়ার আঁধার গলিপথ ।
বিদগ্ধ, মনস্বী বুদ্ধিজীবীরা নাক সিঁটকে বলেছিলেন “পার্ভার্টেড” । ঘুনাক্ষরেও জানতে চান নি “পার্ভারশান” এর ইতিবৃত্তটা কে ।
মনে পড়ে যায় – তোমার জীবনটার কথা । স্বপ্নদ্রষ্টা শিল্পী ছিলে তুমি । হতে চাইতে শিল্পসাধক , শিল্পব্যবসায়ী তো নয় । সারস্বত সাধনায় তদগত আমার বন্ধুটিকে আমি বরাবর দেখতাম – পাঠ্যসূচির মগ্নতার বাইরেও ভ্যান গঘের হাতের প্রোফাইল এবং মাইকেলেঞ্জেলো অন্তেনিয়নী-র চিত্রনাট্য নিয়ে ডুবে থাকতে । কেতাবী প্রাচীরের গণ্ডির বাইরে জীবনের একটি নতুন অর্থ খুঁজে দেওয়ার জন্য কলেজ ক্যান্টিনে আমি নিজেই তোমাকে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম নীলনয়না শর্মিলার সাথে ।
জীবনের নূতন অর্থ খুঁজে হয়তো পেলে তুমি, কিন্তু একেবারেই হারিয়ে ফেললে শাশ্বত অর্থ এবং মূল্যবোধকে । হারিয়ে গেল তোমার বিবেক, ধুয়ে মুছে গেল আদর্শের বাগ্মিতা । শর্মিলা তো হতে চেয়েছিল তোমার সাধনার প্রেরণা, অন্তরায় তো নয় । স্মৃতির সাগর মন্থন করলে আজও মনে ভেসে ওঠে সেই ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ , প্রলয়ঙ্কর রাত্রি – যে রাতে নার্সিং হোমের বিছানায় শুয়ে ব্লাড ক্যান্সারের রোগিনী শর্মিলা সাস্রুনয়নে শেষ বার তোমাকে আর আমাকে দেখেছিল কোনো মতে ।
আজ প্যারিসের বুকে , অ্যালিসকে নিয়ে তুমি ডুবে আছো সুখে । আমার পরিবারের সদস্য আজ তিনজন । আমি, অতীতের স্মৃতি আর তোমাদের ভুলক্রমেও পাঠানো দু-চার টি পত্র পাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।