T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় অপর্ণা চৌধুরী

মদ্দা

“ঢ্যামনাগুলোর রাত দিন সিত গিস্য কিচুরই খেয়াল নেইকো! ডেকে পাটালেই হল! “ গজগজ করতে করতে মুখে জর্দা পানটা গুঁজে দিল খ্যান্তমনি। খ্যান্তমণিকে পাড়ার মেয়েরা আড়ালে মদ্দা বলে।  মেয়েদের কোন গুণই ওর নেই, ও কাঁদে না , ডরায় না, সাজে না, প্রানে দয়া মায়াও নেই ।
আজ খ্যান্তর কাজে যাবার একেবার ইচ্ছে নেই। গাটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে, বোধহয় ঘুসঘুসে জ্বর আছে। আজকাল রাতের দিকে মাঝে মাঝে এরকম জ্বর আসে । বয়স বাড়ছে। শরীরের আর দোষ কি?
কয়েকটা পান একটা ছোট কৌটোতে ভরে কোমরে গুঁজে নিল ও। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। পায়ে প্লাস্টিকের চটিটা গলাতে গিয়ে ছিঁড়ে গেল। বিরক্ত হয়ে একটা বিশ্রী খিস্তি করে চটিতে সেফটিপিন লাগিয়ে, মাথার কাপড়টা তুলে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল ও। ছাতা টাতা নেওয়া ওর পোষায় না।
রাস্তা নিজ্ঝুম। এই বৃষ্টির রাতে কে আর শখ করে রাস্তায় বেরোয়! ওরই পোড়া কপাল ! নিশ্চয়ই ওই অনামুখোগুলো কেউ রাজি হয়নি, তাই ওর ডাক পড়েছে। পুরুষ সহকর্মীদের ওপর ওর খুব রাগ। ওদের জন্যেই তো ওর কাজটা পার্মানেন্ট  হচ্ছে না!
এই কাজটা খ্যান্ত পেয়েছিল ওর স্বামী গোবিন্দর মারা যাবার পর। যখন গোবিন্দ বেহেড মাতাল হয়ে নালায় পড়ে মারা গেল তখন খ্যান্তর এক কুড়ি চার বছর বয়স। দুটো ছোট ছেলে। সকলে বলল “আহা এই কাঁচা বয়সে বেচারি অনাথ হয়েগেল!“
গোবিন্দর লাশের সামনে বসেও খ্যান্তর একটুও কান্না পাচ্ছিল না। সবাই অবাক, “চোকে একটু জল নেই গো! কোন মেয়েমানুষ পারে, না কেঁদে থাকতে? মদ্দা মদ্দা…”
খ্যান্ত বরং মুক্তি পেয়েছিল গোবিন্দর সপ্রেম থাপ্পড়, কিল, লাথির থেকে। তখন ওর চিন্তা এই দুটি দুধের শিশুকে নিয়ে। এদের বড় করে তুলতে হবে।
সকলে বলল , “ তোর বয়স আছে আবার বিয়ে কর!”
খ্যান্ত মনে মনে বলল, রক্ষে কর!
গরিবের ঘরে শোক করার জন্যেও খুব বেশী সময় থাকে না। মড়া পুড়িয়ে সবাই যে যার কাজে চলে গেল । কুলি কামিনের দল, কাজে না গেলে একদিনের মজুরি যাবে।
ছেলেগুলোর ফ্যাল ফ্যাল করে সবাইকে দেখছিল। বুঝতেই পারছিল না কেন সবাই এত কাঁদছে। বাবা তো রোজই এসে ওরকম পড়ে থাকে। তবে আজ শুধু ফিরে মাকে পেটায়নি।
সেদিনই গভীর রাতে প্রথম ডাক এসেছিল খ্যান্তর কাছে, গোবিন্দর বদলে কাজ করার। ডাক্তারবাবু নিজে এসেছিলেন গাড়ি নিয়ে, “ আমি দেখিয়ে দেব, করতে পারবি?” খ্যান্ত আর দেরী করেনি, এই সুযোগ বার বার আসবে না। দরজায় তালা লাগিয়ে চলে গিয়েছিল সরকারী হাসপাতালের লাশকাটা ঘরে । হ্যাঁ, গোবিন্দ ওই কাজই করতো। খ্যান্তও তাই করে। সবাই বলে মদ্দা, নাহলে ওই কাজ করতে পারে? প্রথমদিন কাজ থেকে ফিরে কিছু খেতে পারেনি। কিন্তু হার মানেনি।
তবে ও কন্ট্রাক্টে কাজ করে। একদিন কাজ করলে তিনশো আশি টাকা। লাশ প্রতি টাকা নয়। দিন প্রতি টাকা। যদি দশটা লাশও আসে ওকে ওই টাকাই দেওয়া হয়। আর যেদিন লাশ আসেনা সেদিন হরি মটর।  এই নিয়ে ও অনেক দরবার করেছে কিন্তু কোন ফল হয়নি। ডাক্তারবাবুদের সোজা উত্তর  , “আমাদের হাতে কিছু নেই। এসব সরকারী ব্যাপার। এই সর্তে রাজি থাকলে কর নাহলে অনেক লোক আছে করার।“
অনেক লোক যে নেই সেটা ও জানে। নইলে রাতবিরেতে ওর ডাক পড়ে কেন? পার্মানেন্ট বাবুরা যখন তখন ডাকলে আসেন না। বেশীরভাগ সময় মাতাল হয়ে পড়ে থাকেন। এইতো করোনার সময় ওরা যখন কেউই লাশ ছুঁতে রাজি হল না তখন তো ওকেই ডাকতে হল। তখন বড় ডাক্তারবাবুর কি মিঠে মিঠে কথা,  “ তুমি কাজটা করে দাও খ্যান্তমণি, আমি নিজে তোমার চিঠির ব্যবস্থা করব।“
শুনে খ্যান্ত খুশী হয়ে কাজটা করে দিল। তারপর যখন চিঠি চাইতে গেল তখন ডাক্তারবাবু বললেন, “ হবে হবে, এত অধৈর্য হলে চলে? পরে এসো।“
সেই পরে পরে করতে করতে বছর ঘুরে গেল। কথাটা মনে করে থক করে এক দলা পানের পিক ফেলল খ্যান্ত।
পুলিশ কোথা থেকে একটা বেওয়ারিশ লাশ এনেছে, তিন দিনের পুরনো। আজকের কাজটার খুব দরকার ছিল, হাতে একটা পয়সা নেই। এ মাসে দুর্গা পুজো। ছেলেদের জন্য নতুন জামা কিনবে।
ছেলে দুটো বড় ভালো হয়েছে ওর। বড় ছেলে মন্টু একটা কাজ পেয়েছে। মাঝে মাঝে বেরোয়, দু তিনদিন গায়েব থাকে। কোথায় যায় কিছু বলে না। তবে অনেক টাকা নিয়ে ফেরে। সেদিন বলল,” মা এবার আমি কামাচ্ছি, তুমি কাজটা ছেড়ে দাও।“
কথাটা শুনে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায় খ্যান্তর, অবসর! এবার ও ঘরে বসবে। পাড়ার বৌ ঝিদের সাথে গপ্পো করবে। ঘরে আচার, বড়ি বানাবে। ছেলের বৌ আনবে। ছোট ছেলে সন্তুটা ড্রাইভারি শিখছে। আর অভাব থাকবে না।
ফ্যাস করে একটা শব্দ হতেই খ্যান্ত খিঁচিয় উঠলো ,” যাহ গেল!”
হাসপাতালের লোহার দরজায় খোঁচা লেগে শাড়িটা ছিঁড়ে গেল। আবার একটা ক্ষতি। আজ দিনটাই খারাপ। আসার সময় চটি ছিঁড়ল, এখন শাড়ি। যাক গে আর বেশী দিন তো নয়। ছেলেদুটো একবার দাঁড়িয়ে গেলে ওর দুঃখের দিন শেষ।
আবছা অন্ধকার ঘরের মাঝখানে লোহার খাটে পড়ে আছে লাশটা। আচ্ছা একটা বড় আলো লাগালে কি হয় এই ঘরে? হাসপাতালের সব জায়গায় রঙ হয়, নতুন আসবাব আসে, কিন্তু এখানে কিচ্ছু বদলায় না।
একটা সিমেন্টের টেবিল দরকার , ভিতরে একটা হাত ধোবার কল… কবে থেকে বলছে ও কিন্তু  কারুর টনক নড়ে না। লাশ কেটে, বাইরে গিয়ে হাত ধুতে হয়।
ডাক্তারবাবুরা এই ঘরে খুব একটা আসেন না। ওরা গিয়ে জিজ্ঞাসা করে আসে কি করতে হবে। তারপর কাটাকুটি হয়েগেলে ডাক্তারবাবু নাকে রুমাল দিয়ে এসে দেখে রিপোর্টে  সই করে চলে যান। এত দুর্গন্ধ এখানে যে ওনাদের দোষও দেওয়া যায় না। এই দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারেনা বলে অনেক কর্মী মদ খায়। খ্যান্ত মদ খায়না, ও খায় পান।
মুখে আর একটা পান গুঁজে আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে কাজ করার জন্য তৈরি হয়ে যায় খ্যান্ত। ডাক্তারবাবু বলেছেন লাশের হেড ইঞ্জুরি আছে, কোন ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে মাথায় মারা হয়েছে, খুলি চুরমার হয়ে গেছে। ওসব সয়ে গেছে মদ্দা খ্যান্তর। পচা, গলা, পোড়া, থ্যাতলানো, কচুকাটা কত লাশ দেখল। তারপর ওই লাশের বাড়ির লোকেদের মড়া কান্না। সেও সয়ে গেছে। কেউ কেউ তো কেঁদে একেবারে গড়াগড়ি খায়। যত আদিখ্যেতা! কাঁদলে যদি মানুষ ফেরত আসতো, তাহলে তো কথাই ছিল না।
আসার সময় মন্টুর জন্য আলুসিদ্ধ ভাত করে ঢেকে রেখে এসেছে। চারদিন হল ছেলেটা গেছে এখনো ফেরেনি। কে জানে কখন ফিরবে? যখনই ফিরুক এসে খাবে’খন।
একটাই লাশ…আধ ঘণ্টার বেশী লাগবে না। তারপরই কড়কড়ে তিনশো আশি টাকা, কাল সকালেই ও যাবে বাজারে। ভেবেই মনটা খুশী হয়ে উঠলো খ্যান্তর।
একটা ছেঁড়া চাদরে ঢাকা রয়েছে লাশটা। তিন দিনে পচে ফুলে উঠেছে দেহ। অভ্যস্ত হাতে চাদরটা টেনে খুলে ফেলতেই থমকে গেল খ্যান্ত। বুকটা কেঁপে উঠলো, মুখটা বড় চেনা,বড় আদরের। ফোলা, রক্তমাখা রয়েছে বলে এক মুহূর্ত সময় লাগলো।
“ মন্টু রে! বাপ আমার…”  একটা আর্ত চিৎকার বেরিয়ে এলো খ্যান্তর গলা থেকে। তারপর লাশকাটা ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগলো মদ্দা খ্যান্ত।

সমাপ্ত

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।