সাপ্তাহিক ধারাবাহিক ঐতিহ্যে “কলকাতার চার্চ (কোম্পানীর যুগ)” (পর্ব – ৭) – লিখেছেন অরুণিতা চন্দ্র

ইতিপূর্বের পর্বগুলিতে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসিত কলকাতায় প্রোটেস্টেন্ট মিশনারীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে তবে তাঁরা কেউ ইংলণ্ড থেকে আগত ছিলেন না। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ মিশনারীরা অখ্রিষ্টান দেশে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই উদ্দেশ্যে যে তিনটি মিশনারী সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয় সেগুলো হল Baptist Missionary Society, London Missionary Society এবং Church Missionary Society যা যথাক্রমে ১৭৯২, ১৭৯৫ এবং ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রোটেস্টেন্ট খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসী হলেও অন্যান্য ধারার থেকে Baptist ধারার পার্থক্য ছিল এই যে এই ধারায় বিশ্বাসী ব্যক্তি কে তার সম্পূর্ণ শরীর জলে নিমজ্জিত করে ঈশ্বরের প্রতি তাঁর ভক্তি প্রদর্শন করতে হত। উইলিয়াম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪ খ্রি:) ছিলেন বাংলার প্রথম ব্যাপটিস্ট মিশনারি। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নভেম্বর মাসে তাঁর দুই সহকর্মী ড: উইলিয়াম ওয়ার্ড আর জন মার্শম্যানের সাথে তিনি কলকাতা পৌঁছন। কিন্তু সেসময় কোম্পানি শাসিত উপনিবেশগুলিতে মিশনারী কার্যকলাপ সম্পর্কে বিধিনিষেধ ছিল। তাছাড়া জার্মানিতে সেসময় ক্যাথলিক পেপিস্ট আন্দোলন চলছিল। ব্যাপ্টিস্ট শব্দটিকে ভুল করে পেপিস্ট পড়ার ফলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাঁদের কলকাতায় পদার্পনের অনুমতি দিতে অসম্মত হয়। ফলে তাঁরা ডেনিশ উপনিবেশ ফ্রেডরিকনগর বা শ্রীরামপুরে পৌঁছন। ফলে শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশনের প্রথম কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। অনতিকালেই কেরি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশে ও শিক্ষা প্রসারে শ্রীরামপুর মিশনারীরা এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর কলেজ গৌরবজ্জ্বল ভূমিকা রাখেন। পরে অবশ্য ব্যাপটিস্ট মিশনারীরা কলকাতায় আসার অনুমতি পান। ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট দের শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলির প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাথেও কেরি যুক্ত হন।
কলকাতার প্রথম ব্যাপ্টিস্ট চার্চটি নির্মিত হয় বউবাজার এলাকায় কেরি মার্শম্যান এবং ওয়ার্ডের অর্থানুকূল্যে। ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিনে চার্চটির উদ্বোধন হয়। ১৮০৯ থেকে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কেরি এই চার্চের মিনিস্টার পদে ছিলেন তাই এই গির্জাটি Carey’s Baptist Church নামেই পরিচিত। কেরি এখানে বার্মার প্রথম খ্রিস্টান মিশনারী Judson কেও দীক্ষিত করেন। ব্যাপ্টিস্ট ঐতিহ্য অনুসারেই চার্চটির কোন প্রতীকী সজ্জা নেই নেই উপাসনা বেদী ও। কেরির ব্যবহৃত চেয়ার মঞ্চ টি এখনো চার্চে সংরক্ষিত। এই চার্চের বিশেষত্ব এই যে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা দিবস থেকে একদিনের জন্য ও তার প্রার্থনা বন্ধ থাকেনি।
কলকাতার দ্বিতীয় ব্যাপ্টিস্ট চার্চটি প্রতিষ্ঠা হয় ১৮১৮ বা মতান্তরে ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে সার্কুলার রোড এলাকায়। তাই এটি Circular Road Baptist Church নামে পরিচিত। ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দের Charter Act এ মিশনারিদের কার্যকলাপের উপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হলে কলকাতায় ব্যাপ্টিস্ট মিশনের যে শাখা প্রতিষ্ঠা হয় তার নাম ‘The Junior Brethren’। এদের দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত চার্চটির বর্তমান চ্যাপেল বা প্রার্থনাকক্ষ ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। উইলিয়াম কেরির ভাইপো Ustece Carey এই শাখায় যোগ দেন। উইলিয়াম কেরির স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি মার্বেল ফলক আজো চার্চে রক্ষিত আছে।
কলকাতার তৃতীয় ব্যাপ্টিস্ট চার্চটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে লেনিন সরণী এলাকায়। এই অঞ্চলের নাম সেসময় ছিল কলিঙ্গা বা কালুঙ্গা। তাই চার্চটির নাম হয় Kalinga Baptist Church।
কলকাতার চতুর্থ ব্যাপ্টিস্ট চার্চটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে এন্টালি এলাকায়। তাই এর নাম Entally Baptist Church. লালবাজার এলাকায় উনিশ শতকের শুরুতেই খ্রিষ্টান মহিলাদের জন্য এক অনাথালয় গড়ে উঠেছিল। সেখান থেকে Miss Jones নামক এক মহিলা এন্টালিতে বসবাস করতে আসেন। তাঁর জমি সংলগ্ন রাস্তা সাউথ রোড নামে পরিচিত ছিল। এখানে চার্চের প্রয়োজন অনুভূত হওয়ায় এই চার্চটি নির্মিত হয়। ইংল্যান্ডের চার্চ সংগঠন ১০০০০ টাকার অনুদান দেয় চার্চ নির্মাণের জন্য। পরে চার্চের জমিতে Baptist Girls’ School প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংলন্ড থেকে আগত রেভারেন্ড D. Elyce ছিলেন চার্চের প্রথম প্যাস্টর। ১৯৮৬ তে চার্চটি মেরামতি হয়। বাংলায় লেখা পুরাতন চার্চের চিত্র খচিত মার্বেল ফলক টি চার্চের সামনের দেওয়ালে সজ্জিত আছে। এই চার্চে প্রার্থনা বাংলা ও ওড়িয়ায় সম্পন্ন হয়।
এই চার্চগুলি ছাড়াও খ্রিস্টান ছাত্রদের খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থাপনার জন্য কলকাতায় কলেজ স্কোয়ার অঞ্চলে বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রীট-এ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল Baptist Mission Student’s Hall সম্ভবত: ১৮১১ খ্রিষ্টাব্দে। এখানে প্রার্থনা বাংলায় সম্পন্ন হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য কলকাতার এইসকল ব্যাপ্টিস্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে কিন্তু শ্রীরামপুরের ব্যাপ্টিস্ট মিশনের কোন সম্পর্ক ছিল না। অনুমান করা হয় কেরির সাথেও ব্যাপ্টিস্ট মিশনের কিছু মতানৈক্য ঘটে থাকতে পারে।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।