গল্পে অভিজিৎ চৌধুরী

প্রেম


বিদিশা তার শুভ্র ত্বকে আলগা হয়ে থাকা কালো ব্রা-র হুক লাগাতে লাগাতে বলল – তুমি ওকে মারলে কেন !
নীলাদ্রি বলল – দরদ উথলে উঠল যে !
দরদ নয় , আমাদের তো সব একই ।
স্তন , জঙ্ঘা, সব সব এক ।
দীর্ঘশ্বাস চাপল নীলাদ্রি ।
ফাঁসলে কিন্তু দুজনেই !
সে-কথা বলছি না , কিন্তু আমার প্রতি অনুরাগ ওর প্রতি বীতরাগ কেন !
রমণ-পর্ব মিটে গেলে আনন্দের বদলে এক বিতৃষ্ণার জন্ম হয় ।
তখন নীলাদ্রিরও বিবেক জাগ্রত হয় ।
বলল – তোমার প্রভেকশনও ছিল ।
বিদিশা বলল – একজন নারীর তার মতোনই দেখতে আরেকজন নারীকে পৃথিবীতে সহ্য করতে পারবে না , এটাই তো স্বাভাবিক ।
নীলাদ্রি বলল – আমি মরলে তোমাকেও মরতে হবে ।
বিদিশা হেসে বলল – মন্দ কি ! একটা খুনের পর যৌথ আত্মহত্যা ।
চমকে উঠল নীলাদ্রি ।


ডি. এস. পি সাহেব একদিন নিয়ে এলেন । বললেন – আপনার বিট হাউসের বড় বাবু ।
থানার ও. সি সাহেব বললেন – স্যার ভালো ছেলে , একটু দেখে রাখবেন ।
সেদিনের পর থেকেই আমার অস্থায়ী থানার বড়বাবুর পাত্তা পেলাম না । ফোনেও পাচ্ছি না ।
তারপর এক রাতে হঠাৎ এসে হাজির ।
নিজেই নিয়ে এসেছে দেশি মুর্গির মাংস । তখন খেতে বসবো বসবো করছি ।
ভালোই হল । বললাম ।
‘তুমি’ বলেই ডাকি ! বয়স তো অনেক কম তোমার !
বলল , কোন অসুবিধে নেই স্যার ।
কি নাম তোমার !
সুমন্ত ব্রহ্মচারী ।
বাড়ি !
পুরুলিয়া । অনেকটা ভিতরের দিকে এক গ্রামে ।
এরপর ‘ও’ যখনই আসত রাত ৯ টার পর ।
‘চা’ খেতে বললে , বলত – না ।
পড়ার টেবিল থেকে যে বই পেতো , নিয়ে নিতো । দারুণ পাঠক ছিল । আমার লেখা বইও নিতো আর ভুলও ধরতো ।
আমার কিন্তু বেশ ভাল লাগত ।
সত্যিকারের পাঠকই মনে হতো ।
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে কখনও কখনও একেবারে বেপাত্তা । আবার ফিরে এলে ইতিহাস , ভূগোল নিয়ে গল্প করত ।
একদিন বলল , আপনাকে নিয়ে রাত ৯ টার পর গনগনি যাব ।
আমি বললাম – গনগনি গেছি তো !
সুমন্ত বললো – চাঁদনি রাতে গেছেন !
বললাম – হ্যাঁ ।
কিন্তু গনগনির যেখানে নিয়ে যাব চাঁদনি রাতে সেখানে যাননি ।
অগত্যা বললাম – যাব ।
ভেবেছিলাম খেয়ালি মানুষ ভুলে যাবে । আর থানার কাজের চাপ তো আছেই ।
ভোলেনি সে ।
এলো হুটখোলা জিপ নিয়ে । গাড়িটা ঠিক হুটখোলা জিপও নয় । খুব মোটা চাকা ।
আমাকে ড্রাইভারের পাশে বসালো । নিজে মইয়ের মতোন কিছুতে উঠে বসল ।
পথঘাট । তুলসীচটি , আরাবাড়ি – একের পর এক অরণ্য পার হচ্ছি ।
চাঁদ লুকোচুরি খেলছে কখনও মেঘের ফাঁকে , কখনও বা উঁচু শাল গাছের ডালে যেন ঝুঁকে রয়েছে ।
গড়বেতার কাছে এসে দেখলাম হাতীর পাল বেরিয়ে পড়েছে ।
সুমন্ত বলল – ওরা বিশুদ্ধ বায়ুসেবনে বের হয়েছে ।
একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম হরিণের ঝাঁক শিলাবতীর পাড় ঘেঁষে চকিত গতিতে মিলিয়ে গেল ।
এবার বলল – ওরা সব আলুর গো-ডাউনে আটকে ছিল । রাতে ছেড়ে দিতে বলেছিলাম ।
যে ক’জন ফিরলে ফিরবে – না হলে আরো জঙ্গলের গভীরে হারিয়ে যাবে ।
বেশ লাগছে কিন্তু তখনও বুঝতে পারছি না গনগনিতে এমন কি আর আছে এতো রাতে !
এই পথটা দিয়ে সত্যি আসিনি কোনদিন । বনানীর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে করতে মনে হচ্ছে যেন কোন শেষ নেই এই পথের ।
ভয় হচ্ছে , কেন যে এলাম ! কোথায় বা চলেছি ।
গাড়ি এসে একটা জায়গায় থামল । চমকে গেলাম । আরেকটু গেলেই অতলান্ত খাদ । অচেনা শিলাবতী বয়ে চলেছে বেঙ্গল গ্র্যান্ড ক্যানিয়নকে বুকে জড়িয়ে ।
চাঁদের আলোয় রূপোর মতোন চকচক করছে নদীর জল । একটা ট্রেন গেল এই সময় । থরথর করে কেঁপে উঠল গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ।
আমায় হেসে জিজ্ঞেস করল – কেমন লাগছে !
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই ডেকে উঠল দোয়েল তারপর বউ কথা কও , একদম শেষে কোকিল ।
আমি বললাম , অপূর্ব ।
বলল – আমি এখানে প্রায়ই আসি ।
তারপর নদীর জলের দিকে তাকিয়ে বলল – দুটো লাশকে ছইয়ে চাপিয়ে বয়ে নিয়ে এসেছিলাম ।
কেন ?
আত্মহত্যা করার পর লাশ পাওয়া যাচ্ছিল না । অবৈধ প্রেমিক-প্রেমিকা ছিল মনে হয় ।
অনেকক্ষণ রূপমুগ্ধতায় কাটানোর পর বললাম চলো , ফিরে যাই ।
সুমন্ত বলল – না । আমি এখানে সারারাত কাটাবো । আপনি যান ।
কি করবে !
এখানেই শুয়ে থাকব । ভোর হলে যাব । আপনাকে গাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে ।
বললাম – খেয়েছো !
বলল – হ্যাঁ ।
হঠাৎ কি মনে করে বললাম – ওরা তোমার কাছে আসবে !
হেসে বলল – কারা !
যে দুজনের লাশ উদ্ধার করেছিল !
সুমন্ত বলল – ৩ জন আসবে ।
চুপ করে রইলাম ।
খাদের কিনারায় এগিয়ে গিয়ে বলল – ভয়ংকরকে পার করলে ওপারে পৃথিবী খুব সুন্দর ।
বললাম – ওরা যাকে খুন করেছিল , সেও আসবে ।
হ্যাঁ । তিনজনই আসবে ।
খুব অবিশ্বাস্য লাগল সবটাই । তবে এই রাত , শিলাবতী নদী , অরণ্য আর গনগনি যেন বলে উঠল – চুপ , কোন কথা নয় ।
গাড়িতে উঠে একবার ফিরে তাকালাম ।
দেখলাম সুমন্ত দিব্যি আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রয়েছে এক অপার্থিব প্রেমের টানে ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।