গল্পেসল্পে আলিনূর চৌধুরী (পর্ব – ৩)

তুলির অন্তর্ধান
বোশেখের তাপদাহে ত্রাহিত্রাহি অবস্থা।আকাশে মেঘ নেই,নেই কোন বৃষ্টি।মাটি শুকিয়ে খড়খড় করছে।এক ফোঁটা রসও নেই মাটিতে। চাষিরা জমিতে ফসলের বীজ বপণ করতে পারছেনা।বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তারা অধির অপেক্ষায় দিন গুনছে।কখন বৃষ্টি হবে, মাটিতে রসে ভরে উঠবে ; তখন বীজ বপণ করবে।পুরোচর জুড়ে রোদে খা-খা করছে,প্রখর তাপে আবহাওয়া তাতিয়ে উঠেছে।সহ্য করা যায় না।কোথাও কোনো গাছগাছালি নেই যে, গাছের শীতল ছায়ায় মানুষ একটু জিরিয়ে নিবে, সে উপায় নেই।গাছ থাকবেই কিভাবে মাটিতে রস না থাকলে গাছগাছালি টিকবেইবা কিভাবে! এক দুই ফুট নীচেই কড়কড়ে বালু। বৃক্ষ গজালেও অকালে মরে যায়। এ সময়টা চাষিদের, খারাপ সময়, বসে বসে দিন গোনা ছাড়া উপায় নেই।বসে বসে তো আর দিন যায় না, তাই রোজগারের তাগিদে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। নুরলের মাছ ধরার সময় তেমন একটা মেলে না। পালে দশ বার টা গরু, গাভী, ষাড় ও বাছুর মিলিয়ে ছোটখাটো একটা বাতান। কাইশার আঁখে গরু চড়ায়। ঘাস কাটতে হয়না বললেই চলে। বছর বছর তিন চারটি গরু বিক্রি করতে পারে,তাতে সংসার ভালোই চলে যায়। এটা না করলে ঘাটতিতে পড়তে হয় কেননা প্রকৃতির উপর নির্ভর করে চাষাবাদ চলে,প্রকৃতি বিরূপ হলে ফসলের আশাই নেই।
অভাবের কারণে কিছু মানুষ বিপথগামি হয়ে পড়ে।অসত পথে রোজগারের পথ খুঁজে নেয়। দুর্গম চরে কিছু সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠে। তারা রাতের আঁধারে অস্র ঠেকিয়ে ডাকাতি,ছিনতাই,রাহাজানি ও লুটপাট করে। উজান হতে বর্ডার এলাকা ও সানন্দবাড়ি থেকে ব্যবসা নৌকা যাতায়ত করে এবং বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট, বালাসিঘাট ও ফুলছড়ি ঘাটে মানুষ নৌকা দিয়ে পারাপার হয়। চক্রটি সুযোগ বুঝে এসব নৌকা ডাকাতি করে। দিনের বেলায় আত্নগোপণে থাকে রাতের আঁধারে অস্র নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠে এবং নদীর বুক চিরে শিকার খু্ঁজতে চষে বেড়ায়। নুরল এই সংঘবদ্ধ দলের সক্রিয় সদস্য। তার পরিবারের কেউ জানে না সে এসব করে থাকে। বিয়ের পর থেকে তার স্ত্রী বিষয়টা জেনে যায়। তাই নুরল বিকল্প পথ বেছে নেয়,বউকে কঠোর শাসিয়ে বলে- আমি কোথায় যাই কি করি এসব যেন বাবা মা না জানে।
তুলি তার অতীত বর্তমান জেনে যায়, তার কৌতহল নিজেই শুনতে চায় নুরলের কাছে। সাহস ও বুকে বল নিয়ে বললো- প্রতিদিন রাইতে তোমার এত কি কাজ থাকে? অধিক রাইতে ঘরে ফেরো।আমি একলা ঘরে থাকি ; ভয় ডর আছে তো নাকি?
-কিসের ভয়? পাসের ঘরেই তো মানুষ থাকে, বাবা মা ভাই বোন, এখানে তো আর আর বাঘ ভাল্লুক আইসে না, যে ভয় করবে।
-তাই বলে প্রতিদিন তোমার কাজ থাকে?
-হ! কাজ থাকে বলেই তো যাই।
-কাজটা কি জানবার চাই।
-সাবধান! আমার কাজ নিয়া নাক গলাবিনা। তাইলে কিন্তু কপালে খারাপ আছে তোর।
-কি করবা? মা কে বলে দিবো সব। আমি জানি তুমি কি করো।
রেগে গিয়ে তুলির গলা চেপে ধরে। চোখ রাঙিয়ে বলে কি বলবি? কি বলবি তুই? সিলিংয়ের উপর থেকে কম্বা ছোরা বের করে বললো- এই দেখছোস এটা কি? গলা কেঁটে মাথাটা ধর হইতে একেবারে আলাদা কইরা ফেলামু। তারপর নদীতে ভাসাইয়া দিমু,কাক পক্ষিও টের পাইবো না বুঝলি? বাঁচতে চাইলে চুপ মাইরা থাকবি।
-ভরকাইয়া গেলো তুলি, তাই চুপ মাইরা গেলো। জবাব দিলে যদি কিছু কইরা ফেলায়!
ছোরাটা নিয়ে নুরল হনহন করে বাহিরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো।তুলির সারারাত ঘুম হলো না।বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদলো। রাগে দুঃখে বাবা মা কে ধিক্কার দিলো, আমি কি বাবা মা’ র কাছে এতই বোঝা হইছিলাম? আমাকে এই দুর্গম চরে বনবাস দিলো! এহানে কি মানুষ থাইকতে পারে? ধম বন্ধ হয়া আইসে। না পাইলাম ভালো স্বামী, না পাইলাম কোনো সুখ।জীবনডা বরবাদ হইয়া গেলো আমার। মনডা বসাইতে পাইনা, খালি ফাপুর করে। শুধু এক নলা ভাতের জন্য নির্বাসনে দিলো; এ কেমুন সুখ! সে ভাত তাও আবার কাউন ও চিনার ; ধানের ভাত চক্ষেও দেহিনা। ঐসব কি খাওয়ন যায়? গলায় নামতে চায়না, তাও গিলতে হয়।
চলবে