সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অভিজিৎ চৌধুরী (পর্ব – ৭)

না – মানুষের সংসদ

মন অংক করতে থাকল । একদম একা একা । বাইরে বৃষ্টির টুপুর-টাপুর শব্দ বাড়ছিল । মাঠগুলিও জলে থই থই করছে । খুব মজা হচ্ছে তার । খিচুড়ির গন্ধ পেল সে । বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি রান্না করে মা । মাছ-মাংস, ভাত তার খেতে ভালো লাগে না কিন্তু খিচুড়ি বেশ লাগে । অংকগুলি ফটাফট হয়ে যাচ্ছিল । পক্ষীরাজ ঘোড়ার পীঠে চড়ে বোধহয় তরতর করে ছুটে চলছিল মনের হোম-টাস্ক ।
অংকগুলি হয়ে গেলে মায়ের কাছে সে দৌড়ে গেল । চিত্রলেখা তখন অনেকদিন পর হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছিল কিন্তু তবুও মনের অংকগুলি দেখে দিলো, দেখল সব ঠিক করেছে মন । বাইরের বৃষ্টি থেমে গেছে । আকাশের নীল রং আবার ফিরে এসেছে ।
মন এক ঘর থেকে আরেক ঘর দৌড়ে বেড়াচ্ছে । মুখে শব্দ করছে টগবগ টগবগ । হাত দুটো দুপাশে মেলে দিয়েছে যেন সে উড়ে উড়ে চলেছে । কৈলাস বোস লেনের সেই দাদু ছিলেন বাউণ্ডুলে মানুষ । সংসার ছিল না তাঁর । কিশোরবেলায় জাহাজে করে ইংল্যাণ্ডে গেছিলেন পালিয়ে । বাড়ির কাউকে কিচ্ছুটি ‘না’ বলে । ওখানেই এঞ্জিনিয়ারিং করেন । অর্থ, সম্পদের অভাব ছিল না ওঁর কিন্তু ছিল এক ল্যাবরেটারি । শেষ বয়সে ওখানে তিনি কিসব গবেষণা করতেন । প্রযুক্তি নয় ইতর প্রাণিদের, অনু-পরমাণু নিয়ে অনেক অনেক খ্যাপামি ছিল ওঁর । কৈলাস বোস লেনের সেই বাড়িটা অনেকটা রাজবাড়ির মতন । মস্তো ফটক । ঘরের পর ঘর । আগে বিয়ে বাড়ির জন্য ভাড়া হতো । দাদু সবটাই কিনে নিয়েছিলেন । একাই থাকতেন । স্বপাক আহার করতেন । কেউ গেলে নিজেই রেঁধে খাওয়াতেন ।
কলকাতার সেই বাড়িতে একটা শিউলি ফুলের গাছও ছিল । শরতকালেই গেছিল চিত্রলেখারা । মস্তো ছাদে উঠলে সীমাহীন আকাশ । কোলকাতা শহরটাকে দেখে মনে হতো নীল সুতোর বাধনে আটকে থাকা কোন নকসি কাঁথার সংসার । সেই দাদুর বাড়িতে কোন কাজের লোক ছিল না । বলতেন পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তে ওসবের চল নেই । নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয় । ফলে অভ্যেস হয়ে গেছে ।
এছাড়াও ছিল বিচিত্র সব ঘর । তাতে সব পোকা জীব-জন্তু, সাপ, এমনকি কীট-পতঙ্গও । একটি ঘরের নাম ছিল ‘সুরথ পাখিরালয়’ । দাদুর বাবার নামে । আরেকটি ঘরের নাম ছিল ‘দয়াময়ীর জীবেরা’ । সেটা অবশ্য ঘর না বলে আস্তাবল বলাই ভাল । হাতী, ঘোড়া, কুকুর, বেড়াল, গরু – বিচিত্র প্রাণীদের সহাবস্থান ছিল সেখানে । সারা দিন নিজের হাতেই যাবতীয় দেখাশোনা করতেন ।
সন্ধ্যেবেলায় কীট-পতঙ্গদের ঘরে আসতেন । সবুজ একটা আলো জ্বলত । মাকড়সা, মৌমাছি, গুবরে পোকা, থুতুপোকাদের বিচিত্র সমাহার ।

( চলবে )

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।