রম্য রচনায় অর্পিতা চ্যাটার্জী

যেবার হস্টেলে বাঘ এসেছিল সে রাত্রের কথা। সে ভারি সুখের দিন ছিল। কথা নেই বার্তা নেই সুবচনীর পিঠে চড়ে বসা। জিরাফের মত লম্বা গলা করে অঙ্ক পরীক্ষায় এর খাতায় অঙ্ক খুঁজি ওর খাতায় অঙ্ক খুঁজি আর মনে মনে বলি ঢের হয়েছে ঠাকুর সাদা প্লেটে রসগোল্লা যতটা ভালবাসি সাদা পাতায় রসগোল্লা দেখলেই ততোটা কান্না পায়। কাল থেকে পড়তে বসব আজকের পরীক্ষাটি ভালোয় ভালোয় পার করে দাও ঠাকুর। পেরিয়ে তো গেছি তীরপূর্ণির ঘাট পেরিয়ে গেছি তেপান্তরের মাঠ। ফিরেও এসেছি সন্ধ্যেবেলা। স্টাডিতে নিজের লম্পের তেল নেই বলে এর আলো তার আলো ভাগ করে নিয়ে বই খুলে খানিক ঢুলে খানিক একে খুঁচিয়ে ওকে ডেকে বুক ক্রিকেট খেলে লাইন ভেঙে প্রিয়বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে হেঁটে কোয়ামত সে কোয়ামত তকের সেই সূর্যাস্ত প্রেমের ঝোলে কিচেনের রুটি ডুবিয়ে খেয়ে রাতের বিছানা ঝেড়ে গোলাপি মশারি টাঙিয়ে শুয়েই পড়েছিলাম। ক্লান্ত কৈশোরের পথচাওয়া মন তখন প্রেম মুখের ঝাপসা ছবি জড়িয়ে ঘুমোতে যায়। ঘরের আলো নিভে গেছে ঘুম ঘুম ভাব হঠাৎ দেখি নড়ছি। একটু নড়ছি। আলো আঁধারিতে হঠাৎ পাশের ঘরে দেখি ভেক আপ্রাণ খাটের তলায় ঢুকছে আর চীৎকার করছে বাঘ বাঘ। সব নড়ছে তার মধ্যে সবাই বাঘ শুনে ভয়ে অস্থির। তারপর মণিমাসির সেই বিখ্যাত গলা শুনে বোঝা গেল “ভূমিকম্প “।
এমন কম্পনহীন
জীবনকালে সকাল বেলা হঠাৎ গোয়ার রাস্তায় বাঘের ছবি পাঠিয়ে নীনা মনের জমা জলে ঢিল ছুঁড়ল। Doppler effect এ সেই ছবি মনের জমা জলে গোল আঁকে।পঞ্চাশ তখন পাঁচে ফিরে চায়। ভেকের ভূমিকম্পকে বাঘ ভাবার কথাটা মনে পড়াল অনি। হাসছিলাম সেদিনও খুব হেসেছিলাম। কিন্তু ভেকের জন্য কষ্ট হল। যেসব ভয়কে ছোটবেলা জয় করতে পারিনি এড়িয়ে গেছি চেপে গেছি সেসব ভয়েরা হয়ত আজও মনের কোণে বাসা বেঁধে আছে। ফেসবুকে লিখছিলাম সে কথা এমন সময় ভেক লিখল জানিস আমার বাঘে আজও খুব ভয়। আজও আমি টেনশন হলেই স্বপ্ন দেখি বাঘে তাড়া করেছে। নয় থেকে নব্বই আমরা আমাদের অজান্তে ভয় বয়ে বেড়াই। ভাল ভালবাসাই হয়ত ভয়কে ভুলিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ভাল ভালবাসা পাই কোথায়? তাই সেদিন রাতেও বাঘ বেড়িয়েছিল আজও বাঘ বেরোয়। জীবনের যেকোন ভূমিকম্পে তাই আজও বাঘ বেরোয়। একটা দুটো তিনটে ভাল ভালবাসার হাত ধরে থাকলে হয়ত এসব বাঘেদের সহজেই তাড়িয়ে দেওয়া যায় তাইনা ?