শনিবারের হরেকরকম – এ অরূপ চট্টোপাধ্যায়

শনিবারের হরেকরকম

যে ঘটনাটি এখানে বিবৃত করছি , সেটি আমার শৈশবে আমার সঙ্গীত গুরুর কাছে শোনা। প্রয়াত সঙ্গীতাচার্য আমার পরম পূজনীয় শ্রী পবিত্র দাশগুপ্ত মহাশয়ের নিজের জীবনের ঘটনা। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রয়াত হন ৯০ বছর বয়সে। তিনি যখন ছাত্রাবস্থায় , তখন তাঁর সৌভাগ্য হয়েছিল এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার। ভারতীয় ধ্রুপদী মার্গ-সঙ্গীত বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন ঘরানা আছে। আমরা জানি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা ছিল মূলত বিষ্ণুপুরী ঘরানার অনুসারী। পন্ডিত যদু ভট্ট তালিম দিয়েছিলেন কিশোর রবি ঠাকুরকে। তেমনি আরেকটি বিশেষ ঘরানা হল লক্ষ্নৌ ঘরানা। রবীন্দ্রনাথ এই ঘরানার ও বিশিষ্ট সমঝদার এবং অনুরাগী ছিলেন। স্বাস্থ্যের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রবীণ রবীন্দ্রনাথ একবার এসেছিলেন লখনৌ তে। ওয়াজিদ আলি শাহ এর এই প্রিয় শহরে বাঙ্গালীদের বসবাস তখন ছিল উল্লেখযোগ্য। তেমনি এক সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত বাঙালি ব্যক্তিত্ব ছিলেন লখনৌ এর শরৎ বাবু। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ তাঁরই অতিথি হলেন।
রবীন্দ্রনাথের অনুমতি নিয়ে শরৎ বাবু এক বিকেলে নিজের বাড়ির প্রকাণ্ড বৈঠকখানায় আয়োজন করলেন এক সংগীত সভার। বিশিষ্ট আমন্ত্রিত শিল্পী রূপে এলেন লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের প্রধান পন্ডিত রতন জৈনকর সাহেব। তাঁরই অন্যতম ছাত্র ছিলেন তদানীন্তন কিশোর পবিত্র দাশগুপ্ত। এল সেই বিকেল। বিশ্ববরেণ্য রবিবাবুকে সামনাসামনি দেখার আকর্ষণে শরৎবাবুর বাড়িতে জমায়েত হয়েছেন আরো অনেক কৃষ্টিপ্রেমী অভ্যাগতবৃন্দ। কিন্তু গৃহকর্তার মাথায় হাত। দুর্বল এবং ভগ্নস্বাস্থ্যের রবীন্দ্রনাথ সকাল থেকেই পড়েছেন প্রবল জ্বরে। মধ্যাহ্নভোজনের পর কিঞ্চিৎ ঔষধ সেবন করে আগের তুলনায় একটু সুস্থ বোধ করলেও শরীরের তাপমাত্রা তখনও আছে প্রবলভাবে। সেই সঙ্গে শ্বাসকষ্ট ও রয়েছে । কিন্তু তা সত্বেও অনবদ্য শিষ্টাচারের পরিচয় দিয়ে গুরুদেব রুগ্ন শরীরেই এসে উপস্থিত হলেন অভ্যাগতদের সামনে । সুবিবেচক বিশ্বকবি যথেষ্ট নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সকলের থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটি ইজিচেয়ারে নিজের ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলেন।
রতন জৈনকর সাহেব তানপুরা কোলে নিয়ে বসলেন ঘরের অপর এক প্রান্তে। তিনি সঙ্গে এনেছিলেন তার নির্বাচিত কয়েকজন প্রিয় ছাত্রকে, যাদের অন্যতম কিশোর পবিত্র দাশগুপ্ত। কবিগুরু জৈনকর সাহেবকে মধুর সুরে অনুরোধ জানালেন দীপক রাগের একটি বন্দিশ গেয়ে শোনানোর। জৈনকর সাহেব পড়লেন বিপাকে। গুরুদেবের অনুরোধ প্রায় আদেশের সমান। কিন্তু সঙ্গীতাচার্য জৈনকর সাহেব ভালোভাবেই জানেন বিভিন্ন রাগরাগিণীর বিবিধ প্রভাব হয় শরীরের উপর । দীপক রাগ স্নায়বিক উত্তাপ ও উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট।তিনি সবিনয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে দীপক রাগের পরিবর্তে ছায়ানট রাগ নিবেদন করার অনুমতি চাইলেন। রবীন্দ্রনাথ সম্মত হলেন। ছায়ানট রাগের আলাপে বিস্তারে শান্ত, সমাহিত হল সমগ্র পরিমণ্ডল । এক সময় শেষ হলো গান ।
আসরে সূচিভেদ্য নীরবতা। রবীন্দ্রনাথ ইজিচেয়ারে মাথা এলিয়ে রয়েছেন দুটি চোখ বুজে। বেশ কিছুক্ষণ পর, চোখ মেললেন রবীন্দ্রনাথ। এই গানের মূল্যায়ন রবীন্দ্রনাথ কিভাবে করেন, তা জানার কৌতুহল প্রত্যেকের ভেতরে। জৈনকর সাহেব ও উদ্বিগ্ন, তিনি ভাবছেন গুরুদেবকে প্রসন্নতা দিতে পেরেছেন তো ? রবীন্দ্রনাথ কিছুক্ষণ পর সভার মৌনতা ভঙ্গ করে বললেন “দেখো শরৎ, সুরের কি অপূর্ব মহিমা। এই গানের আগে, আমার টেম্পারেচার আমায় কষ্ট দিচ্ছিল। এখন কোন পীড়া অনুভব করছি না। আমার হাতটা দেখতো, বোধহয় টেম্পারেচার আর নেই”

শ্রদ্ধায় এবং গর্বে দুই চোখে জল এলো রতন জৈনকর সাহেবের।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।