হৈচৈ গল্পে অরূপ চট্টোপাধ্যায়

উপেক্ষিতা
[রবীন্দ্র-ভাবনার ছায়াবলম্বনে,এই অধম কবির কিছু নিজস্ব ও মৌলিক মননের ক্ষুদ্র প্রয়াস]
নিরবধি কালের অমোঘ নিয়মে শুধু বিজয়িনীরা হলো ইতিহাসবন্দিতা
কোথাও শোণিতার্দ্র কেশের উদ্যত ফণায় , কোথাও নীরব অশ্রুর প্রহরণে।
কখনো সে যাজ্ঞসেনী, কখনো বা সীতা।
কিন্তু কবির বীক্ষণে ভাস্বর হয় কি তারা , যারা উপেক্ষিতা ?
হবেই বা কেন ? নয় তো তারা মহিমান্বিতা ।
প্রণাম হে বাল্মিকী , নতশির হই কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস।
তোমাদের যে সৃষ্টি-সম্ভারের উপরে “মহাকাব্য”-র তকমা –
তার কাছে পরাজিত আধুনিক উপন্যাস।
তোমরা পূজিত মহর্ষিরূপে , কিন্তু হতে পারোনি ন্যায়াধীশ , তোমাদের সুমহান কীর্তিসমূহের মাঝে বড় মর্মান্তিক এ অবিচার ।
অনুল্লিখিত যে অন্তরালবর্তিনীদের ত্যাগ ও তিতিক্ষা, ছিল না কি তাদেরও মর্যাদা লাভের অধিকার ?
মহাকাব্যিক মূল্যায়ণে কৃষ্ণপ্রিয়া রাইকিশোরী চিরবিরহিনী ,
অথচ বিস্মৃতির অতলে কেমন করে যেন তলিয়ে যায় কৃষ্ণভার্যা রুক্মিণী।
বলাই বাহুল্য, এ অবধারিত।
মহাকবিকূলের প্রেরণায় চর্যাপদ-কর্তাগণের লেখনীতে শ্রীরাধার জীবন কৃষ্ণ-আধারিত।
তাই , কৃষ্ণ-আরাধিকা শ্রীরাধিকা হয়ে ওঠেন “প্রেম – প্রজ্ঞা – প্রৌড়হা পারাবতী”
যুগনায়ক পুরুষোত্তমের সাথে পরস্ত্রীর লীলায় তো নেই কোনো পাপ,
তাই নীরব দর্শক তার আয়ান ঘোষ পতি।
অলঙ্কার-শাস্ত্রের সুধারসে গরিমাদীপ্ত হয় রাধার বিরহ ।
ওদিকে দ্বারকাপুরীর নিভৃত আঁধারে অলক্ষিত থাকে রুক্মিণীর অশ্রুমোচন অহরহ।
তুলাদন্ডের ভারপরিমাপের পরীক্ষায় – তাঁর তুলসীপত্র রূপ তপশ্চর্যা গ্রহণ করে , একটি দিনের জন্য কৃষ্ণ তাঁকে করলেন কৃতার্থ।
কিন্তু , দ্বারকা রাজ্যের পাটরাণী হতেই হবে অভিজাত সত্যভামাকে , পুরুষোত্তম ভগবানের বিচার তো সততই যথার্থ ।
বলতে পারো হে বাল্মিকী
কেন অবহেলিতা বিরহিনী মান্ডবী, ঊর্মিলা ?
কতিপয় নির্বাচিতকে গৌরবান্বিত করতে , অপরাপর সকলকে উপেক্ষাই কি মহাকাব্যের লীলা ?
যে জন্মদাত্রী কোনো দিন দিল না স্নেহাঞ্চল ,
কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে নিহত সূর্যপূত্রের শবদেহে বর্ষিত হয়ে গৌরবান্বিত তাঁরই অশ্রুজল। !!
অথচ সূর্যপূত্রকে দানশীলতার দীক্ষা দিল যে পালিকা মাতার স্নেহচ্ছায়া ,
কত সহজেই অবজ্ঞার অবগুণ্ঠনে চলে যান সেই অধিরথ-জায়া।
হে শাশ্বতকালের মহাকবিগণ ,
যদি আজও স্বচ্ছ থাকে তোমাদের কালোত্তীর্ণ দিগদর্শন,
তবে তোমাদের কাছে বিনম্র যাচনা –
সম্ভবপর হলে কোরো দুই মহাকাব্যের পুনঃসম্পাদনা ।