T3 || কোজাগরী || বিশেষ সংখ্যায় অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়

অলক্ষ্মীর পাঁচালি
(১)
“তোর বাবার ঠিকুজিকুষ্ঠিতে লেখা ছিল জাতকের কন্যাসন্তানের যোগ নেই, আর যদি কখনও কন্যাসন্তান জন্মায় তাহলে তাকে নিয়ে সারাজীবন ভুগতে হবে।”, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে মায়ের মুখে এই বার বার শোনা কথাগুলো আরও একবার শুনে সাড়ে পাঁচ বছরের অঙ্গনার চোখ জলে ভরে গেল। আসলে গত কয়েকদিন ধরেই মা বেশ রেগে আছে ওর ওপর। অঙ্গনার বাবা চাকরিসূত্রে বাইরে থাকে, ন’মাসে ছ’মাসে আসে একবার। শ্বশুরবাড়ির যৌথ পরিবারে মানিয়ে-গুছিয়ে চলা অঙ্গনার মা ওর বাবার আসার অপেক্ষায় দিন গোনে, তাই ওর বাবা এলে মা বাবাকে আর কাছছাড়া করতে চায় না। বাধ সাধে অঙ্গনা। ও ও তো বাবার পথ চেয়ে থাকে, মনে মনে ভেবে রাখে বাবা এলে বাবার সাথে কি কি গল্প করবে। তাই বাবাকে একবার কাছে পেলে আর ছাড়তে চায় না। মা তাতে খুব বিরক্ত হয়, ঝেড়ে ফেলতে চায় ওকে, ছুতোয়-নাতায় সরিয়ে দিতে চায় অনেক দূরে।
এই যেমন দিন কয়েক আগে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ফাংশান দেখতে গিয়েছিল বাবা আর মা, কিশোরকুমার আর লতা মঙ্গেশকরের গানের প্রোগ্রাম। মা-বাবার একবারও মনে হয়নি অঙ্গনাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা। অঙ্গনাও জানতো বাবা-মা ওকে নিয়ে যাবে না, তাই আর অযথা বায়না করে বাবা-মাকে বিরক্ত করেনি। ভেবেছিল বাবা-মা ফিরলে ওদের কাছে ফাংশানের গল্প শুনবে। কিন্তু মা ফিরল মুখ ভার করে। অঙ্গনা কাছে যেতেই খেঁকিয়ে উঠে বলল, “এ কি! এখনও জেগে আছিস। তোর জন্য আজ আমার ফাংশান দেখা হল না। সবে কিশোরকুমার গান ধরেছিল ‘গাতা রহে মেরা দিল’ আর তোর বাবা তখনই বলল ‘বাড়ি চলো, মেয়ে একা রয়েছে’। আর পারি না আমি।” ওর দিকে বিরক্তিমাখা মুখে একবার তাকিয়েই মা চলে গেল শাড়ি বদলাতে। মা যা বলে গেল সেটা অবশ্য সত্যি নয়। বাবা ওর জন্য তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসেনি, বাবা ফিরেছে দাদুর ভয়ে। অঙ্গনার রক্ষণশীল ঠাকুরদা বেশি রাত অবধি বাড়ির বাইরে থাকাটা একেবারেই পছন্দ করে না তাই ঠিক রাত ন’টার সময় বাড়ির সদর দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেয়, তখনও যদি কেউ বাড়ির বাইরে থাকে তাহলে তাকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয় বাড়িতে ঢোকবার জন্য। মা সবই জানে তবুও সু্যোগ পেলেই ওর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়।
চুপচাপ বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল অঙ্গনা। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া নোনতা জলে ভিজে গেল বালিশের বেশ খানিকটা অংশ।
(২)
“তোকে কতবার বলেছি না যাকে তাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবি না। সবাই নমস্কার পাওয়ার উপযুক্ত হয় না।”, মায়ের ধমকানির চোটে অঙ্গনাকে বিজয়ার প্রণাম করতে গিয়েও থেমে গেল চামেলী। একটা বড় প্রোজেক্টের কাজ চলছিল তাই বিদেশী সফটওয়্যার কোম্পানির মুম্বাই অফিস ওর পুজোর ছুটির আবেদন নামঞ্জুর করে দিয়েছিল। ছুটি পেয়ে আজই এসেছে মুম্বাই থেকে চামেলী, এখন থাকবে কয়েকদিন। প্রথমদিনেই মায়ের সাথে অশান্তি করাটা ঠিক হবে না।
“যত দিন যাচ্ছে দিদির ঢং তত বাড়ছে।”, সুযোগ বুঝে একটুখানি মাইলেজ নিয়ে নিল ছোটবোন শেফালী। ও একেবারে মায়ের জেরক্স কপি।
গ্যাস-ওভেনের দুটো বার্নারের একটাতে খিচুড়ি আর একটাতে পাঁচমিশালি তরকারি রান্না করছিল অঙ্গনা। লুচি,পায়েস আর ফুলকপির ডালনা হতে এখনও বাকি। সময়মত সব জোগাড়যন্ত্র করে লক্ষ্মী ঠাকুরের সামনে নৈবেদ্য সাজিয়ে না দিলে আরও কথা শুনতে হবে শাশুড়ির কাছে, তাই এই কথাগুলো আর গায়ে মাখলো না অঙ্গনা। বাবা পণ দেয়নি বলে বিয়ের পর থেকেই তো শুনে যাচ্ছে এ সব গালমন্দ। বাবাকেও বেশি দোষ দেওয়া যায় না। অঙ্গনার স্বামী নিজের মুখে বলেছিল সে বিয়েতে কোনো পণ নেবে না আর বাবাও লুফে নিয়েছিল হবু জামাইয়ের সেই প্রস্তাব। আসলে বাবার ছিল টাকা জমানোর নেশা। যা উপায় করতো তার বেশিরভাগটাই জমিয়ে রাখতো ব্যাঙ্কে। তবে অঙ্গনার শ্বশুর শাশুড়ি কিন্তু ছেলের এই প্রস্তাবকে একেবারেই সমর্থন করেনি। শাশুড়ি বার বার বলেছিল ওদের পরিচিতরা কে কত জিনিস নিয়ে বিয়ে করেছে। আর শ্বশুর তো লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই দিয়েছিল ছেলেকে ম্যানেজমেন্ট পড়াতে কত খরচা হয়েছে। সব শুনেও না শোনার ভান করেছিল অঙ্গনার বাবা মা। বাবা চাইছিলো না জমানো টাকাগুলো মেয়ের বিয়েতে খরচা হয়ে যাক। আর মায়ের চিন্তা ছিল ভাইয়ের ভবিষ্যত নিয়ে। মায়ের কাছে অঙ্গনা তো চিরকালই বেওয়ারিশ বেড়াল ছানার মতো অপাংক্তেয়। তাই শাশুড়ির গঞ্জনার কথাগুলো মাকে জানালেও মায়ের কোনো হেলদোল ছিল না। পাছে মেয়ে আবার ঘাড়ে এসে পড়ে সেই ভয়ে বলেই দিয়েছিল,”তুই এতো অভিযোগ করিস কেন? তোর ভাইও বলে দিদির বিয়ে হয়ে গেছে, এবার আর আমাদের না জ্বালিয়ে নিজেরটা নিজেই বুঝে নিক না।”
এখন আর বাবা-মায়ের ওপর কোনো রাগ নেই অঙ্গনার, ওর রাগটা এখন গিয়ে পড়েছে ইন্দিরা গান্ধীর ওপর। সেই যখন গর্ভপাতকে আইনত স্বীকৃতি দিল তখন একটু আগে দিল না কেন? তাহলে অঙ্গনার মতো মেয়েদের আর ভূমিষ্ঠ হয়ে এতো জীবনযন্ত্রনা সহ্য করতে হত না।
(৩)
“এ কি দিদি! তুমি এখনও রেডি হওনি? টিভির লোকেরা সব এসে পড়েছে তো”, মিঠুর কথায় সম্বিত ফিরল অঙ্গনার। ভাগ্যিস মিঠু সময়মত এসে ডাকল। না হলে আরও কতক্ষণ যে আয়নার সামনে বসে পুরোনো কথা ভেবে দুঃখ পেতো তার ঠিক নেই।
সাজগোজ প্রায় শেষ হয়েই এসেছিল। মেকআপ ব্রাশ দিয়ে একটু টাচ-আপ করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল অঙ্গনা। ওর নিজের উপার্জনের টাকায় কেনা এই তিন কামরার ফ্ল্যাটের লম্বা ড্রয়িং-কাম-ডাইনিংরুমের একপ্রান্তে রাখা লেদার-সোফাগুলোতে বসে আছে ওর খুব কাছের মানুষেরা; বাবা, মা, ভাই, ভাইয়ের বউ, ননদ, শাশুড়ি…
সেই কত বছর আগে ‘লক্ষ্মী এসেছে ঘরে’ নামের একটা গেম-শো-তে অংশগ্রহন করার জন্য টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় এসেছিল অঙ্গনা। ভালো খেলেছিল বলে নজর পড়েছিল অ্যাসিন্টেন্ট ডিরেক্টরের। চেয়ে নিয়েছিল ওর ফোন নম্বর। তারপর হঠাৎ একদিন ফোন করে বলল ‘নতুন সিরিয়াল ডিরেক্ট করছি, নতুন মুখ চাই। রাজি থাকলে চলে আসুন’। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি অঙ্গনাকে। নায়িকার চরিত্র না পেলেও নায়িকার দিদি, নায়কের বৌদি, মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় বউ, জমিদার বাড়ির ছোট শাশুড়ি, স্নেহময়ী নার্স, দয়াবতী ডাক্তার, গ্রাম-প্রধানের পরোপকারী স্ত্রী; নানা রকম চরিত্রের মধ্যে দিয়ে অঙ্গনা জায়গা করে নিয়েছে মেগা-সিরিয়াল দেখে অবসর কাটানো মানুষজনের মনের মণিকোঠায়।
লাল-সাদা জমকালো কড়িয়াল বেনারসী আর গা-ভর্তি খাঁটি সোনার গয়নায় সুসজ্জিতা বৌদিকে দেখেই সোফা ছেড়ে উঠে পড়েছে শেফালী, একগাল হেসে মোবাইল ফোন হাতে এগিয়ে আসছে অঙ্গনার দিকে, ওর সাথে একটা সেলফি তুলবে বলে। অঙ্গনা বুঝলো কাছের মানুষেরা এবার ওর কাছে ঘেঁষবার চেষ্টা করবে, গালভরা কথা বলে নিজেদের সাথে ফ্রেমবন্দি করতে চাইবে ওকে, সেই ফটো চেনা-পরিচিতদের দেখিয়ে বাহবা কুড়োবে। তাই সে দিকে আর না তাকিয়ে ঠাকুরঘরের দিকে এগিয়ে চলল অঙ্গনা। ছোট বড় বিভিন্ন নিউজ-চ্যানেলের রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যানেরা ওখানেই অপেক্ষা করছে, অঙ্গনার বাড়ির কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো কেমন হয় তা দেখবার এবং দেখাবার জন্য।