T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী

“ঘুড়ি”… ফেলে আসা কৈশোরস্মৃতির এক আনন্দময় অনুরণনের নাম। এমন সব দিনে, বৃষ্টি ঝরিয়ে আকাশ যখন তার নীলধ্বজ পাখা মেলে সুদূরকে ডাকে, মধ্যবয়সের ব্যস্তযাপনের অবসরে হঠাৎ চোখ চলে যায় খন্ডখন্ড জলভারহীন মেঘদলের দিকে… মনে পড়ে, এই নীল, এই সাদায় কবে যেন আঁকা হ’তো রঙ-বেরঙের গল্প। কতো হারা, কতো জেতা, কতো প্রস্তুতি, কতো লড়াই, আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনার সেই সব কথকতা।
সেসব ছিলো এক রূপকথার দিন। আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেও কৈশোর এতো জটিল ছিলো না, গ্লোবালাইজেশনের অথৈ সর্বগ্রাসী ঢেউ মফস্বলের নৈমিত্তিক যাপনকে সদাব্যস্ত করে তোলেনি, বর্ষা শেষের এই সময়টায় পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেলের বাঁশ পড়ে যেত, বিকেলের খেলার ছলে সেই বাঁশের কাঠামো ধরে ঝোলা, পুজোয় কার কিভাবে কাটাবার ইচ্ছে,সেসবেই সময় কেটে যেত। দেখতে দেখতে চলে আসতো বিশ্বকর্মা পুজো। শিল্পাঞ্চল এলাকায় সমারোহে পালিত হলেও সাধারণ এলাকায় তার ঘটাপটা ছিলো কম। তবে, সব জায়গায় কিশোর-নব্যতরুণদের মধ্যে বিশ্বকর্মা নিয়ে মাতামাতির আসল কারণ ছিলো ঘুড়ি। সেকেন্ড টার্মিনাল পরীক্ষার শেষে পড়ার চাপ তখন কম। ছুটির দুপুরে পাড়ার গলিরাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলি ভরে থাকতো মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় সুতোয়।
আমাদের ছোটবেলায় ছিলো চীনে সুতো। মায়ের বানিয়ে দেওয়া আটা বা ভাতের আঠায় হামানদিস্তায় মিহি করে গুঁড়োনো কাঁচের গুঁড়ো মিশিয়ে একহাতে প্লাষ্টিক প্যাকেটে সেই আঠা মাখানো হতো সুতোয়। অন্যহাতে ধরা থাকতো পাতলা সুতীর কাপড়;বাড়তি আঠাটুকু মুছে নেওয়ার জন্য। এটি ছিলো একাধিক জনের কাজ। একজন সুতো ছাড়তো নির্দিষ্ট ছন্দে, অন্যজন দুই হাতে মাঞ্জা মাখাতো, তারপরে একজন টানটান করে ল্যাম্পপোস্টে তা শুকোবার ব্যবস্থা করতো, শুকোলে, যত্ন করে আরেকজন লাটাইতে তা গুটিয়ে রাখতো নির্দিষ্ট দিনের জন্য। তার সঙ্গে অহোরহো প্রার্থনা চলতো বিশ্বকর্মা ঠাকুরের কাছে, যেন ঐ দিন বৃষ্টি না হয়।
সুতো তৈরির সঙ্গে সঙ্গে চলতো ঘুড়ি কেনা বা বাড়িতেই হুল্লোড়ে কাকা বা মামার প্রশিক্ষনে ঘুড়ি তৈরী… দুটি বাঁশের কাঠির একটি সোজা, একটি বাঁকিয়ে ঘুড়ির কাগজের সঙ্গে সেলাই করে ঘুড়ি বানানো হতো, বাঁকানো কাঠিটির দুই প্রান্তের সঙ্গে মাঝের সোজা কাঠির দুটি প্রান্তে বিশেষ পদ্ধতিতে বাঁধা হতো সুতো, সেই সুতো আটকানো হতো লাটাইয়ে। আজ আর মনে নেই, কিন্তু এই সবগুলোরই আলাদা আলাদা নাম ছিলো, যেমন ঘুড়ির নামেও ছিলো অপরূপ সব বৈশিষ্ট্য!
পেটকাটি, চাঁদিয়াল, শতরঞ্জি, মুখপোড়া, ঘয়লা, লাটুয়াল, ময়ুরপঙ্খী, বামুনটেক্কা, চৌরঙ্গী, গ্লাস, জিবিয়াল, হিন্দুস্তান, চাপরাজ, সতেরো ইঞ্চি, পাকিস্তান, কানকাটা, হ্যারিকেন, বাক্সঘুড়ি, চিঠিঘুড়ি … এমন সব সুন্দর সুন্দর নামে ভরে ছিলো আমাদের ঘুড়ির জগৎ।
মনে পড়ে, বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে ছাদে ছাদে, মাঠে মাঠে শুরু হোত প্রতিযোগিতা। কখনও সুতো ছেড়ে, কখনো সুতো ধরে, এর ওর ঘুড়ি কাটা হতো, কখনও কখনও কাটা পড়তো নিজেদেরগুলিও। সঙ্গে চলতো পরিত্রাণ চিৎকার… ভোকাট্টা! ভোকাট্টা… ওঃ দিনময় সে কী উত্তেজনা!
তখনও ইতিহাস পড়া হয়নি; জানা হয়নি ৪০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে গ্রীসের ট্যারাস্টাস শহরের আর্কিটাস নামে এক ভদ্রলোক প্রথম ঘুড়ি তৈরী করেছিলেন। তবে প্রামান্য সুত্র অনুযায়ী,খ্রীষ্ট জন্মের প্রায় ২৮০০বছর আগে চীনের হুন সাম্রাজ্যের সেনাপতি হানসিন ২০০০ টি লন্ঠন লাগানো কাঠের ঘুড়ি দিয়ে শত্রু সেনাদের দখলে থাকা অঞ্চল উড়িয়ে যুদ্ধ জয় করেছিলেন। তখনকার দিনে শিল্পের কাপড় ছিলো ঘুড়ি তৈরির মাধ্যম,ঘুড়ির আকারে পাখি, ড্রাগন ফুল, পরী, প্রজাপতি ইত্যাদি নকসা করা হতো। কাগজ আবিস্কারের পরে, ঘুড়িতে কাগজের ব্যবহার শুরু হয়।
হিউয়েন সাং ও ফা হিয়েনের বর্ণনায়ও আমরা ঘুড়ির কথা পড়েছি।
জাপানে দুর্গের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বার্তা পাঠাতে সাংকেতিক লিপি লিখে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্লাস্টিকের তৈরি ঘুড়ির সঙ্গে এরিয়াল জুড়ে দিয়ে সেটিকে শূন্যে ভাসিয়ে রেডিয়ো-সংকেত পাঠাতে ঘুড়ির ব্যবহার ছিলো। তারও আগে, ১৭৪৯ সালে স্কটল্যান্ডের দুই বিজ্ঞানী টমাস মেলভিন ও আলেকজান্ডার উইলসন ঘুড়ির গায়ে থার্মোমিটার লাগিয়ে তাকে আকাশে উড়িয়ে পৃথিবীর উপর স্তরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করেছিলেন।
১৮৯৩ সাল থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস’ ঘুড়ির সাহায্যেই বিভিন্ন জরুরি তথ্য সংগ্রহ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানাত।
আমাদের বাংলায় ঘুড়ির প্রচলন হয় ওয়াজেদ আলী শাহর সৌজন্যে। সিপাহি বিদ্রোহের কারণে গৃহত্যাগী হয়েও কলকাতায় এসে আনন্দপাগল মানুষটি তাঁর সখ- আহ্লাদ বিসর্জন দিতে পারেননি, এখানেও প্রচলন করেছিলেন ঘুড়ি উৎসবের, সঙ্গী হয়েছিলেন তৎকালীন বাবু গোষ্ঠী।
এইভাবে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও বিভিন্ন সময়ে, কখনো মকর সংক্রান্তি, (রাজস্থান ও আমেদাবাদ), কখনো দশেরার দিন(,মধ্যভারত),কখনও রাখীবন্ধনের দিন(উত্তর ভারত),পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে ঘুড়ি উড়িয়ে যৌথ সুখযাপনের প্রচলন ছিলো,আজ যা ক্রমশঃ হ্রাসমান।
সবশেষে বলার কথা এই যে, প্রয়োজনকে আনন্দের উপচারে সাজিয়ে মামুলি জীবনকে বর্ণময় করার এই যে অসাধারণ প্রকাশ,যুগে যুগে তা মানুষকে সমস্ত ব্যর্থতা,অসহায়তা থেকে মুক্তির যে উপাদান সংগ্রহে সাহায্য করেছে, তার সংস্কৃতিও বহন করেছে ঘুড়ি। আমাদের যাবতীয় বন্ধনের আগল খুলে উন্মুক্ত আকাশে পাখির মতো উড়ে বেড়িয়ে প্রেরণা দিয়েছে নব প্রাণদ্যোতনার।
শেষ করি ঘুড়ি নিয়ে শামসুর রাহমানের সেই বিখ্যাত কবিতাটি মনে রেখে,
“নিজেকে পীড়িত করে প্রায়শ উপোসে,
দিনরাত কী-যে ভাবে মানুষটি, বোঝা দায়।
কোনও এক অমাবস্যা-রাতে, কী আশ্চর্য,
নিরালোক ঘর তার হয়ে ওঠে জ্যোৎস্নাময়,
শিরায় শিরায় ছন্দ নেচে ওঠে,
হাত সৃষ্টির দোলায় মশগুল
এবং অনিন্দ ঘুড়ি জন্ম নিতে থাকে। “… জয় হোক যৌথ আনন্দময় যাপনের, জয় হোক আমাদের ফেলে আসা কৈশোরগন্ধী ঘুড়িপ্রেমের।