T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী

মঞ্চ জুড়ে আলোর রঙ্গোলী। ঠিক তারই মাঝখানে সিংহাসনের মতো তিনটি সুন্দর সাজানো চেয়ারে বসে তিন প্রবীণ, শ্রীযুক্ত অর্জুন সাহা, শ্রী দীনবন্ধু রায় এবং মিষ্টার রতন যাদব। তাঁদের ঘিরে চারিদিক লোকে লোকারণ্য।
আর হবে নাই বা কেন? আজ যে এই ছোট্টো শহরের বড়ো সুখের দিন। একটি সাধারণ মফস্বলী কাপড় দোকান তার সততা ও পরিশ্রমে আজ এলাকা ছাড়িয়ে রাজ্যের অন্যতম নামী একটি টেক্সটাইল ব্র্যান্ডে পরিনত হয়েছে, উদীয়মান শ্রেষ্ঠ শিল্পোদ্যোগীর শিরোপা পেয়েছে সরকারি ভাবে। বার্ষিক লেনদেন তার কোটি ছাড়িয়েছে। আজ জন্ম-শহরে বর্ণাঢ্য উদ্বোধন হচ্ছে সেই যাদব টেক্সটাইলের মেগা শোরুমের।
হাজার করতালির মধ্যেই নির্দিষ্ট সময়ে নৈমিত্তিক উদ্বোধন করলেন শহরের খানদানী কাপড় ব্যবসায়ী অর্জুন সাহা, তাঁকে সাহায্য করলেন তাঁর অনেক দিনের কর্মচারী দীনবন্ধু রায়। তারপরেই উঠে দাঁড়ালেন যাদব টেক্সটাইলের পূর্বতন কর্ণধার রতন যাদব; সবার জন্য সাততলা কমপ্লেক্সটির দ্বার খুলে ঘোষনা করলেন,
-‘সাধারণ একটি কাপড় দোকান থেকে এই কমপ্লেক্সে উত্তরণে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, যাদব টেক্সটাইলের বর্তমান মালকিনের ইচ্ছে অনুসারে, সেই সব কর্মচারীরা সবাই আজ থেকে পাবে কোম্পানির লাভের অংশ; এবং তাদের অসুস্থতাজনিত চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব সম্পুর্ন আমাদের।’
এতক্ষণ যা ছিলো আনন্দ গুঞ্জরণ, ক্রমে তা বিস্ফোরিত হয়ে উঠলো প্রবল উচ্ছাসে। কারণ, এই ছোট্ট শহরের অধিকাংশ মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন ঠিকানা হতে চলেছে এই কমপ্লেক্স, এবং মালিকপক্ষের এই উদারতা এলাকায় হতে চলেছে এক রূপকথা…
যদিও এই আলো থেকে খানিক দূরের আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, বরের কাঁধে মাথা রেখে আজ অনেকদিন পরে বড়ো নির্ভার লাগছে মেহুলীর, যিনি নাকি আজকের এই আনন্দের প্রকৃত ঋত্বিক। চারিদিকে এতো আলো;তবু কেন যেন তাঁর মনে পড়ছে আজ ফেলে আসা অতীত দিনের কথা।
সময়টা আশির দশকের মাঝামাঝি, গ্লোবালাইজেশনের ঢেউ তখনও পর্যন্ত্য আমাদের দেশে-গাঁয়ে সেভাবে আছড়ে পড়েনি। মা-মাসীরা কল্কাপাড়ের তাঁতের শাড়ি, বাবা-কাকারা পাড়ার দর্জির বানানো সার্ট-প্যান্ট কিংবা ধুতি-পাঞ্জাবীতেই স্বচ্ছন্দ্য ছিলেন। ছেলেমেয়েদেরও সাজের ঘটাপটা তেমন ছিলো না,ঐ ফ্রীল দেওয়া ফ্রক আর ট্যুইলের হাফসার্ট, এই। বরং পড়াশোনায় ভালো,বা খেলাধুলোয় ভালো এমন গুণী ছেলেমেয়েদের কদর ছিলো বেশ।
প্রতিবেশীদের মধ্যে ভাবসাব ছিলো, একের ভালোমন্দে অন্যরাও জড়িয়ে থাকতে ভালোবাসতেন। মোটামুটি এইরকম ঘনিষ্ঠ,একান্ত এক আটপৌরে আন্তরিকতায় ভরা ছিলো তখনকার মধ্যবিত্ত যাপন।
এমনই কোন এক পুজোর আগের একটি দিনে, মেহুলী তখন সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক ডিঙিয়ে কলেজ যেতে শুরু করেছে। ওরা ছিলো নিম্নমধ্যবিত্ত, বাবা কাজ করতেন ঐ এলাকার সবচেয়ে বড়ো কাপড়ের দোকানে। তবু দুরন্ত মেধা ও শান্ত ব্যবহারের জন্য পাড়ার সবার কাছেই মেহুলী ছিলো খুব আদরের। বাবা-মা কখনও ওকে অভাব বুঝতে দেননি,স্বল্প চাহিদার সামান্য সবকিছুই ও পেয়ে যেত চাওয়ার আগেই। স্বাভাবিকভাবেই আত্মসম্মান নিয়ে আনন্দময় জীবনযাপন ছিলো তাদের, অন্ততপক্ষে, তারা তিনজন তাই ভাবতো।
ছন্দ কাটলো হঠাৎ সেই বছর, কয়েকদিন ধরেই বাবার শরীরটা গিয়েছিলো খারাপ হয়ে, মাঝেমধ্যে জ্বর আসছে, ভীষণ দুর্বল, সঠিক চিকিৎসার রসদ,এমনকি দিনযাপনের সামান্য খরচাটুকুও বাড়িতে নেই। কাজে যেতে পারছেন না বাবা,প্রথম প্রথম কয়েকদিন প্রতিবেশীরা পাশে ছিলেন। কিন্তু সেভাবে তো চলে না; অগত্যা যে কাপড়ের দোকানে বাবা খাতা লেখার কাজ করতেন, নিরুপায় হয়ে মায়ের কথামতো কলেজ ফেরৎ একদিন মেহুলী গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলো সেখানে …
যাওয়ার আগে মেহুলী জানতো না,ওর সহপাঠিনী নীলমের বাবার দোকান সেটা।
দোকানে ঢুকে দোকানের মালিক অর্জুন সাহার কাছে গিয়ে ও পরিচয় দিয়ে বলেছিল,
-‘বাবা কয়েকদিন ধরে ভীষণ অসুস্থ,তাই কাজে আসতে পারছেন না’।
পুজোর ঠিক আগে,স্বাভাবিকভাবেই দোকানে অসম্ভব ভীড় ছিল সেদিন। ওর কথা ভালোভাবে না শুনেই নীলমের বাবা খুব রুক্ষভাবে ওকে অপমান করে বললেন,
– ‘দানছত্র খুলিনি আমি,করছি ব্যবসা। এসময় কামাই করলে আমি ছাঁটাই করতে বাধ্য হবো। কাল থেকেই…’
বাবা দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মচারী ছিলেন ওঁদের, তাঁর এই দুঃসময়ে যে মালিকপক্ষ পাশে থাকবেন না,উপরন্তু এমন অমানবিক আচরণ করবেন; আজন্ম রুচিশীলতায় অভ্যস্ত মেহুলী তা ভাবতেই পারছিলো না। আরও খারাপ লাগছিলো, অন্য অনেক ক্রেতা এবং কর্মচারীর সঙ্গে নীলমও ওখানে ছিলো….কয়েকদিন আগেই কলেজে একটা বিশ্রী ব্যপারে ওর সঙ্গে নীলমের অশান্তি হয়েছে, যদিও ঘটনাটিতে মেহুলীর কোন দায় ছিলোনা।
ওর বাবা ওকে বহুমুল্য একটি লেহেঙ্গা নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করছিলেন বারবার, তাচ্ছিল্যভরে শুধু সে মেহুলীর দিকে তাকিয়েছিলো….
ভীষন, ভীষণ অবাঞ্ছিত আর ভাগ্যবিড়ম্বিত মনে হয়েছিল নিজেকে, আর একটিও কথা না বাড়িয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছিলো সেদিনের সতের বছরের তরুণী। একদিকে প্রবল অর্থচিন্তা,বাবার অসুস্থতা,অন্যদিকে আত্মসত্তার এমন অপমান; ভীষণ বিভ্রান্ত অবস্থায়, বাইরের অসংখ্য মানুষের ভীড়ে আসন্ন দুর্গোৎসবের আনন্দলহরীতেও খুব একা লাগছিলো, বাড়ি ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, অর্থই হয়তো জীবনের সমস্ত স্বাচ্ছন্দ্যের চাবিকাঠি, মেধা,রুপ….এগুলো সবই মুল্যহীন।
বড়ো অসহায় লাগছিলো, কিন্তু ওর ভেতরের কেউ যেন সেই দুর্যোগের মুহুর্তেও তবু কানেকানে বলছিলো, এই অবস্থার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াতে হবে, ঘুরে ওকে দাঁড়াতেই হবে…
বাড়ির সামনের পার্কে খানিক বসে একা একা কেঁদে নিজেকে হালকা করেছিলো মেহুলী; এতদিনকার কান্নার চাইতে সে কান্নার ধরন খানিক আলাদা;সেই প্রথম সে নিজেই শিখেছিলো, বড়ো হলে সব কথা সবসময় প্রকাশ করতে নেই, দেখনহাসির আড়ালে কান্না লুকোতে জানলে তবেই মানুষ বড়ো হয়!
এবং তাই, বাড়ি ফিরে মায়ের করুন মুখখানির দিকে তাকিয়ে এসব কোন কথাই সেদিন সে বলেনি,বরং অভয় দিয়েছিলো মাকে। ঐ একটি অসম্মান তাকে কেন কে জানে, কন্যা থেকে নারী হওয়ার দিকে এগিয়ে দিয়েছিলো বেশ কয়েকটি কদম।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পরে,ঐ পরিস্থিতিতে কি করা উচিত অথবা কি করা উচিত নয় ভাবতে ভাবতেই উঠোনময় ছড়িয়ে পড়া শারদ জোস্নায় মেশা শিউলীগন্ধী হাওয়া ওকে আনমনে যেন কার কথা মনে করাল…কি মনে করে,হঠাৎ অখিলেশকে ফোন করেছিলো… ছেলেটি বেশ কয়েকদিন ধরেই ওর পেছনে ঘুরছে,এবং যাকে কেন্দ্র করেই নীলমের সঙ্গে ওর মনোমালিন্য!
একে এসব প্রেম জাতীয় বিলাসিতা ওর ঘোর অপছন্দ তায় শুনেছিলো, অখিলেশ বড়োলোকের বয়ে যাওয়া ছেলে,ও একেবারেই এসব প্রশ্রয় দেয়নি এতোদিন,নীলম ওকে মিথ্যে মিথ্যে ভুল বুঝলেও না। কিন্তু সেদিনকার সন্ধ্যা মেহুলীকে অন্য কিছু ভাবতে বাধ্য করেছিলো।
যাহোক,এখনও মনে পড়ে, ফোনে অখিলেশের গলা পেয়েই প্রথম প্রশ্ন ছিলো মেহুলীর,
-‘ভালোবাস আমায়? বিয়ে করবে?’
এতদিন পরেও হাসি পায়, তুখোড় স্মার্ট ছেলেটি তোতলানো গলায় বলেছিলো…’হুম’।
-‘কাল তাহলে একবার পার্কে এসো’
-বলে ফোন রেখে দিয়েছিলো সে রাত্রে।
তারপরের দিন দেখা করেছিলো ওরা। কি কথা দুজনে হয়েছিল আজ আর মনে নেই, কিন্তু তারপর থেকেই শুরু হয়েছিল এক নতুন গল্প, এক দুষ্টু ছেলে আর এক শান্ত মেয়ের দুর্দান্ত এক প্রেমোপাখ্যান….
অনেকেই বলেছিলো, টাকার জন্য সম্পর্ক; এবং তা মিথ্যেও নয়, সম্পর্ক শুরু থেকেই ওর পরিবারকে সসম্মানে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছে অখিলেশ ওর নিজের পরিবারের বিরোধিতা সত্ত্বেও। এও শুনতে হয়েছে, বড়োলোকের ছেলের খেয়াল, দুদিন খেলা করে ছেড়ে দেবে,তখন কি হবে? তাছাড়া জাতিগত সমস্যা তো ছিলোই।
কিন্তু ওরা দুজনে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গীতেই সব উড়িয়ে দিয়েছে,কারো কথায় কোন গুরুত্ব দেয়নি। শুধু তারা পরস্পর জানতো,একটি মাতৃহারা ছেলের অনন্ত অসহায়তা এবং একটি প্রতিভাময়ী কন্যের অরুন্তুদ লড়াই। এবং তাই হয়তো দুটি সমান্তরাল আলো, সম্পর্কসুত্রকে বেঁধে রেখেছিলো, বরং বলা ভালো বেঁধে রেখেছে এক সহমর্মী ভালোবাসার বন্ধনে।
হয়তো প্রত্যাশামতো খুব ভালো রেজাল্ট করতে পারেনি মেহুলী,উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েও নিতে পারেনি। কিন্তু অখিলেশকেও সে সঙ্গে থেকে গ্র্যাজুয়েশন করিয়েছে, পড়া শেষে দুজনের বিয়ে হয়েছে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পারিবারিক ব্যবসা সামলেছে, সঙ্গে সংসারের দায়িত্বও। প্রতিকূল শ্বশুরবাড়ি আজ তো তাদের ‘বহুরানী’র জন্য গর্বিত।
এতদিনের যুগল যাত্রাপথে এসেছে কতো সংঘাত,কতো আনন্দ…
আর আজ তো তাদের স্বপ্নপূরণের দিন, ভালোবাসার সাফল্য প্রাপ্তিরও দিন। সবচেয়ে বড়ো কথা, যে মানুষ একদিন দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর অসুস্থ কর্মচারীর মেয়েকে, আজ তাঁকে দিয়েই বাবার সঙ্গে উদ্বোধন হলো সার্থক স্বপ্নের, এবং সেই স্বপ্ন সম্ভব সার্থকতায় যেন আর কোন মেহুলীর ক্যারিয়ার বলি দিতে না হয়, আর কোন দীনবন্ধু রায়ের পরিবারকে অসহায় অসম্মানের শিকার না হতে হয়, তার জবানী দিলেন স্বয়ং অখিলেশের বাবা।
কয়জন কন্যার এমন সৌভাগ্য হয় পিতৃঋণের মূল্য দেওয়ার…
আকাশের নৈঋতকোনের কোন অজানা নক্ষত্রের আলো যেন আশীর্বাদ পাঠালে তাকে, চোখের কোলে এতক্ষণের জমে থাকা জলটি ঝরে পড়লো নীরবে, পাশে দাঁড়ানো সফল পুরুষ গভীর আশ্লেষে জড়িয়ে ধরলেন তাঁর নব যৌবনের প্রেম, সারা জীবনের সাথী,সেই শাকম্ভরী অনন্যাকে… সামনেই আসন্ন শারদীয়া; শিউলী-সম্ভব আয়োজনে তৃপ্ত হোক মধ্যবিত্তের কোকনদ-আকাঙ্ক্ষা, এই শুভকামনায়।