অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৩৯)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
একটা দুটো কথার ছন্দে চৈত্র থমকে যায় ,
সদ্য মেয়েবেলার মুখে অবাক জিজ্ঞাসায়।
রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো গানে বিদায়ের নূপুর ,
এসো এবার নতুন পাতায় গ্রীষ্মের দুপুর।
চৈত্র মাসের সকাল দুপুর জুড়ে,বাড়ির সামনে রাঙামাটির রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করা গাজনের সন্ন্যাসীদল এখন বোধহয় নতুন বছরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। সারা মাসের কৃচ্ছ্বসাধনের পর , আবার নতুন করে সব কিছু শুরুর প্রতীক্ষা। চৈত্র শেষের বিকেল সন্ধ্যার যুগলবন্দির এই বিরল মুহূর্তে , বৈকালিক চায়ের আয়োজন করতে করতে মা মৃত্তিকা এই কথাগুলোই ভাবছিলো। বাঁকুড়া শহরে গিয়ে চৈত্র সেলে এবারে প্রয়োজনীয় তেমন কিছু কেনা গেলো না । মেয়ে মৃত্তিকা ইদানিং তেমন সময় দিতে পারছে না । দিন দশেক আগে নাতনির হাত ধরে বাজারে গিয়ে , বিছানার চাদর ,বালিশের ওয়াড় , নতুন পাপোশ , ভালো কোয়ালিটির জলের বোতল , এগুলোই শুধু কিনতে পেরেছে সে । আর নাতনির জন্যে কয়েকটা নতুন পোশাক। মৃত্তিকার পরিবারের অনুসঙ্গে কোনোদিন বিলাসিতার জাঁকজমক নেই ,ক্ষমতাও ছিলো না। দিনগত পাপক্ষয় নয় , হেসে খেলে জীবনটা নদীর স্রোতের মতো বইয়ে দেওয়াই উদ্দেশ্য।বাজারে একটা নতুন বইয়ের দোকান হয়েছে , মৃত্তিকা সেখান থেকে মনের সুখে কয়েকটা বই কিনলো। লীলা মজুমদারের কিশোর সাহিত্য সমগ্র ,আর অবন ঠাকুরের ক্ষীরের পুতুল ও বুড়ো আংলা। নিজের জন্য আর মেয়ের জন্য কিনলো , শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ ছোটো গল্প। ব্যস , হাত খরচার সবটুকুই শেষ হয়ে গেলো। মেয়ে বকুনি দিতে পারে ,এই ভেবে, মনটা একটু খচখচ করছিল সেদিন। কিন্তু পরের দিন সকালের আলোয় টেবিলের ওপর রাখা বইগুলো যখন হেসে উঠলো, তখন মৃত্তিকার মনে পড়লো ,উন্মনার বাবার কথা। সাংসারিক অভাবের মধ্যেও বারবার তিনি মনে করিয়ে দিতেন একটা কথা , যা আজও তার মনে আছে। সুকান্তের ছাড়পত্র , নজরুলের অগ্নিবীণা , রবিঠাকুরের পুণশ্চ ,আর ক্ষণিকা — তাদের বিবাহিত জীবনের পরতে পরতে যেন জড়িয়ে ছিলো । মৃত্তিকার জন্মদিনে, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা উপহার দিয়ে মানুষটা বলেছিলেন — ভুখা মানুষ ,ধরো বই ,ওটা হাতিয়ার। সেদিন ঘরে টাঙানো বিদ্যাসাগরের ছবির ওপর এসে পড়েছিল একটা অপরূপ আলো । শিক্ষা চেতনা,মুক্তি , বিপ্লব — শব্দগুলো একাকার হয়ে গিয়েছিলো স্বামী স্ত্রীর মিলিত হাসিতে।
পাকা বুড়ি তোয়া চায়ের কাপে ঠোঁট ভিজিয়ে মায়ের কাছে দুলে দুলে শিখছে– এসো হে বৈশাখ , এসো এসো।কচি গলায় নতুন বছরের আগমনী শুনে ,মৃদু হেসে হাত নেড়ে যাচ্ছে,পথ চলতি দু এক জন। মৃত্তিকার বাগানের দু চারটি আম গাছে সদ্য ফোটা আমের কুশির জয়ধ্বনি ! আমের সবুজে , গাছপালার সবুজে , দূরের বনভূমির সবুজে কত রকম বৈচিত্র্য। দূরে কোথায় যেন চৈত্র বিদায়ের অথবা বর্ষবরণের সানাই বাজছে। কান পাতলে স্পষ্ট শোনা যায়। কাল সকালে উন্মনার স্কুলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। তারই প্রস্তুতি চলছে মা ও মেয়ের । স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধানের ভাবগম্ভীর ভাষণের পরেই , তোয়া ও তার বন্ধুদের গান কবিতা। তোয়াকে তো শুধু গান গাইলেই হবে না ,কবিতাও বলতে হবে–রুদ্র তোমার দারুণ দীপ্তি এসেছে দুয়ার ভেদিয়া । নাচের তালেও সে পা মেলাবে — মম চিত্তে নীতি নৃত্যে কে যে নাচে …..
তার বাবা প্রাণতোষ মেয়ের তেমন খোঁজখবর নেয় না , তাই দিম্মা আর মা তার দিগন্তের রামধনু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন। তাকে চিত্রাঙ্গদার মতো সর্ব বিষয়ে ঝকঝকে উঠতে হবে। আঠারো বছর বয়সে , যেন তার প্রথম যৌবনে ফুটে ওঠে নারীত্বের স্বাধীন পতাকার উচ্ছ্বাস । স্কুলের চারজন দিদিমণি মিলে গোটা অনুষ্ঠানটা সাজিয়ে তুলবে ,তার সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের টিফিনের ব্যবস্থা , অনুষ্ঠান সঞ্চালনার গুরুদায়িত্ব পালন করার তুমুল ব্যস্ততা। সবশেষে, দিদিমণিরাও একসঙ্গে গেয়ে উঠবে– আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও । বাচ্চাদের মা বাবারাও সেই গানে গলা মেলাবেন ।
মা মৃত্তিকা , মুড়ি নারকেল কোরা মাখা ছোট্ট গামলাটা এগিয়ে দেয় উন্মনার দিকে — কি রে ,কী ভাবছিস? চা যে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তোদের উদ্বোধনী সঙ্গীত কোনটা হবে — আনমনা উন্মনা আপন মনে গেয়ে উঠলো — নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে….
সেই সুরের পরশ ছড়িয়ে গেলো দিম্মা ও নাতনীর গলাতেও — শুভ্র সুন্দর প্রীতি উজ্জ্বল নির্মল জীবনে , নব আনন্দে জাগো….
উন্মনা যেন তার কবিমনকেই শোনাচ্ছিলো গানটা । আজ রাতে মনে করে বছরের শেষ রাতের শুভরাত্রি , আর কাল ভোরে ঘুম ভাঙানিয়া শুভ নববর্ষ জানাতেই হবে । ইদানিং ফোনে , রাতের আলাপের শেষে , অমলেন্দুর ভেজা ঠোঁটের আলতো চুমুর শব্দ ও সুগন্ধ পায় সে । সমস্ত শরীর শিউরে ওঠে সে শব্দে যেন ! ফিরিয়ে দিতে ভীষণ ইচ্ছে করলেও , একরাশ লজ্জা যেন ছুটে এসে উন্মনাকে জড়িয়ে ধরে। সংযমের রক্ষাকবচ তাকে নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ থেকে আড়াল করে । চুম্বনের বদলে সে কবিতা উপহার দেয় তার কবিমনকে। এই মুহূর্তের শেষ চৈতালি সন্ধ্যা তার শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিলো যেন ! কবিমন তো আর কয়েকদিন পরেই তাদের বাড়িতে প্রথম আসবে। কী হবে তখন ? মা কিভাবে তার মেয়ের জীবনে দ্বিতীয় পুরুষকে মেনে নেবে ? আর তার আত্মজা,ছ’ বছরের কচি মেয়েবেলা তোয়া , সে কী বলবে ? ফোনের স্পিকার অন করে অমলেন্দুর কিশোর কবিতার আবৃত্তি সে মেয়েকে শুনিয়েছে । বীরপুরুষ,বাউল , নদী ….শুনতে শুনতে মেয়ের চোখমুখের উচ্ছ্বাসটুকুও লক্ষ্য করেছে সে । মেনে নেবে সে অমলেন্দুকে ? গানের তালিমের পরে , চা মুড়ির পর্ব শেষ করে তোয়া আচমকাই বলে বসলো– মা , আজ তো মঙ্গলবার , সামনের রবিবার আমাদের বাড়িতে তোমার সব বন্ধুরাই আসবে। আমার বাবা আসবে না ? তাকে আসতে বলবে না ? এক মুহূর্ত সবাই স্তব্ধ। বহুদূর থেকে ভেসে আসা সানাইয়ের আওয়াজ , চরাচরের স্তব্ধতাও কখনও কখনও যেন কোনো জিজ্ঞাসার কাছে উত্তরহীন চুপ করে যায়। দিম্মা মৃত্তিকা যেন সে কথা বুঝতে পেরে গেয়ে উঠলো — তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে …এসো গন্ধে বরণে ,এসো গানে…
তোয়া পুরো গানটা শুনলো । কী বুঝলো কে জানে , চুপ করে থাকলো । কোলের কাছে নাতনির ম্লান মুখটাকে টেনে নিয়ে , দিম্মা বললো– তোমার বাবা খুব গম্ভীর মানুষ তো , কলেজের প্রফেসর । হয়তো এত হইচই পছন্দ নাও করতে পারে। তাকে বরং পরে কখনও আসতে বলবো । বলবো — এসো , এসে দেখে যাও , তোমার কন্যা তোমাকে খুব মিস করছে। দিম্মার সুগন্ধি কোলে মুখ গুঁজে তোয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। ওকে কেউ বাধা দেয় না। নিঃশব্দে উঠে গিয়ে , ফ্রিজ থেকে অমলেন্দুর দেওয়া একটা ক্যাডবেরি মেয়ের হাতে গুঁজে দেয় উন্মনা । বলে – তোমার জন্য আমার এক বন্ধু পাঠিয়ে দিয়েছে। চোখের জল মুছে তোয়া বলে — তাহলে তো সে আমারও বন্ধু্। আমি কি তাকে বন্ধু বলে ডাকতে পারি ? শৈশবের নিষ্পাপ ঠোঁটে মুড়ির অবশিষ্ট এক কনা নিয়ে,বছরের শেষ চৈতালি সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়ে তোয়া।
ক্রমশ