T3 || লক্ষ্মী পুজো || সংখ্যায় অমৃতা ভট্টাচার্য

আমাদের ভাঁড়ারের দেশে..

শুক্ল চতুর্দশীর রাত। আকাশে চাঁদের নরম আলো কার্তিকের শিশির মাখছে। বাজারে, গঞ্জে আজ আলো জ্বেলে, হ্যাজাক জ্বেলে ফল, বাতাসা, কদমা থেকে তিলের নাড়ু, ধানের ছড়া মেলে দোকানিরা বসেছে সব। এমন দিনে বাজারে ঘুরে বেড়াতে কার না ভালো লাগে? এই যে এত সব মানুষের উত্তাপ, উচ্ছ্বাস আর হাঁকাহাকি এই নিয়েই তো বচ্ছরকার উৎসব! হলুদ বাল্বের নীচে কলার নরম সাদা খোল তাই মণীন্দ্র গুপ্তের গদ্যের মতো গা এলিয়ে দিয়েছে। ছেলেটির চোখ এদিক সেদিকে ঘুরছে। কে বলতে পারে, সহৃদয় খরিদ্দার কখন যে জুটে যায় সহসা! অবশ্যি এমন সাঁঝের বেলায় বেয়াক্কেলে মানুষেরও অভাব নেই। তারা দেখে বেড়ায়, আলোর নীচে, আলোর কিছু দূরে। লক্ষ্মীর পটে, মানুষের মুখে কোজাগরী ব্রতের গল্প খুঁজে নেওয়াই যেন তাদের কাজ। সেই যে এক আজব দেশে রাজা নিয়ম করে দিলেন, হাটে যে জিনিস বিক্কিরি হবে না রাজা সে জিনিস নায্য দামে কিনে নেবেন। আহা রে! সে দেশ যে কোথায়! যাক গে, গল্প শোনেন আপনেরা। এখন হল কী সে দেশের রাজা তো অলক্ষ্মীকে ঘরে নিয়ে এলেন। তখন আর হয় কী, একে একে বিদায় নিলেন রাজলক্ষ্মী, ভাগ্যলক্ষ্মী, যশলক্ষ্মী, কুললক্ষ্মী। কেবল টিকে রইলেন ধর্ম। গল্পের এইখানটায় এসে ওই বেয়াক্কলে মানুষটারও চোখে জল আসে। মা লক্ষ্মীর গল্পে তখন কেমন বুড়ো পেঁচার মতো ডানা মেলে বসেন ধর্ম। মানুষের তো ওইটুকুই সার, আর আছেই বা কী! ওই যে হজ ফেরতা মানুষটি মুখে হাসি ছড়িয়ে তালের ফোপড়া আর লাল-সবুজ আখ বিক্কিরি করছেন ওঁর হাসিতে মিশে আছে উৎসবের খুশি। ব্যাবসায়ী মানুষের কি কেবল মুনাফাই থাকে! কিছু মানব ধর্মও থাকে নিশ্চয়ই। মানুষটি তাই বার বার জিজ্ঞেস করছেন, এই বছর নারকেলের নাড়ু করবেন না? ভালো আখের গুড় এনেছি, দেবো? কেমন করে জানি কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর ব্রতকথায় ওরা ঢুকে পড়ে অনায়াসে। পাঠক তখন আর কী করে! পথ হারাতে চাইলেই বা তাকে দিচ্ছে কে? রাজার পিছু পিছু তাই অলক্ষ্মী বিদায়ের গল্প শুনতে শুনতে সেই গহন বনে নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছয় সে। সেই যেখানে ভাগ্যপীড়িত রাজা তাঁর রানীটিকে ত্যাগ করে এলেন। কত কত দিন রানীর দিন কাটল একলা। তারপরে, সেই কোন এক আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে রাণী দেখলেন কারা যেন নদীর ঘাটে বসে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা করছেন। রাণী তাদের কাছ থেকে রঙ মাখানো পিটুলি চেয়ে লক্ষ্মীর মূর্তি গড়লেন। এই পর্যন্ত এসে গল্প আবার খানিক জিরিয়ে নিতে চায়। গল্পের মধ্যে কেমন গল্প মিশে থাকে দেখো, রাণী কি কোনোদিন পিটুলি দিয়ে লক্ষ্মী মূর্তি গড়েছেন আগে? গড়েননি তো! তবু কেমন অবলীলায় তিনি গড়ে নিতে পারলেন লক্ষ্মীর চিরচেনা অবয়বটিকে। তাই তো বলি, মূর্তি কি কেবল কুমোর গড়ে! মূর্তি গড়ে মন। চিদানন্দে তখন পূর্ণিমার আলো এসে পড়ে। তাই নয় কি! তাই তো দেখো কেউ মাটি দিয়ে তার মূর্তি গড়ে, কেউ বা পূজে সরায়, কেউ বা আবার কলার খোলে, ধানের কুনকেতে। মনের আকাশে তখন কত শত শরৎশশী আলোর মাকুখানা গড়িয়ে দেয় তার হিসেব রাখে কে!
যাই হোক মূর্তি গড়া হলো। চিড়ে, নারকেল আর তালের ফোপড়ায় নৈবেদ্য হলো। রাণীর পুজো শেষ হলে অলক্ষ্মী বিদেয় নিলেন। এই তো হল ব্রতের গল্প। এই গল্পে আসলেই কি কেবল মিথ-পুরাণের জোয়ার ভাঁটা মিলেমিশে আছে? নাকি মানুষের গল্পই আবার পুরাণের জোব্বাখানি গায়ে চাপিয়ে আশ্বিনের মাঠ আলো করে গল্পের ঝুলিখানি মেলে ধরেছে! ধরা যাক সে যেন কত শত বছর আগে, সেদিনও এমনই চাঁদের আলোয় ভরেছে দেশ-গাঁ- মানুষের ঘর গেরস্থালি। সেই কোন পুরনো সভ্যতার গল্প এসব। ঋগবেদের ঋষিরা সূর্যের উত্তরায়ন থেকে বছর গননা শুরু করতেন। হিম, অর্থাৎ শীত থেকে সেই বছরের শুরু হতো বলে, তাঁরা হিম শব্দে বছর বুঝতেন। এর অনেক দিন পর তাঁরা শরৎ কাল থেকেও আরেক বছরের পরিমাপ শুরু করেছিলেন। সেই বছরের নাম অবশ্যই শরৎ। সুর্যের উত্তরায়ণ দেখে হিম ঋতুর আরম্ভ বোঝা যায় কিন্তু শরৎ? তাঁরা হিম ঋতু থেকেই মাস গুণে শরৎকে বুঝতে চাইতেন। বেদাঙ্গ-জ্যোতিষে এসবের উল্লেখ আছে। পূর্ণিমা-অমাবস্যা দিয়ে নানা হিসেব বুঝতে চাইতেন তাঁরা। সেই হিসেবে পৌষ অমাবস্যায় উত্তরায়ণ। আর সেই সূত্র মেনেই আট মাস আট তিথি গতে আশ্বিন শুক্লাষ্টমী গতে নবমীতে শরতে প্রবেশ। দুর্গাপূজার সন্ধিক্ষণের গুরুত্বও সম্ভবত সেখানেই। দশমীতে শরতের আরম্ভ বলেই হয়তো বিজয়ার প্রচলন। মতেরও শেষ, পথের তো নেইই। তবে,এখানেই শেষ নয়, বৈদিক ঋষিরা বসন্ত থেকেও আরেকটি বছর গুনতে শুরু করেছিলেন। সে হিসেবে আবার সব এদিক সেদিক হলো খানিক। মার্গশীর্ষ কোন বছরের প্রথম মাস ছিল? সেই খোঁজ নিতে নিতে পৌঁছনো গেল অগ্রহায়ণে। সেই মার্গশীর্ষা পূর্ণিমার হিসেবে তাঁরা ধরতেন শরৎ ঋতুর আরম্ভকে। সেক্ষেত্রে আশ্বিন পূর্ণিমায় বর্ষার আরম্ভ। সেই পুরনো হিসেব মানলে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে অম্বুবাচী হতো । কী আশ্চর্য না? মেলাবেন তিনি মেলাবেন। ফার্টিলিটি কাল্টের গল্প কেমন মুনিঋষিদের ক্যালেন্ডারের পাতায় পাতায় বীজধান ছড়িয়ে দিয়েছে দেখো। এই যে, মহামারী পীড়িত মানুষ হলুদ আলোর নীচে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর বাজার করবে বলে ভিড় করেছে এরা জ্যোতিষ জানে না, অঙ্ক জানে না। না জানলেই বা ক্ষতি কী! এরা জানে মা কেমন সুন্দর কপ্পুরের গন্ধ ছিটিয়ে নারকেলের জল খেতে দেন, কেমন করে পদ্মের কুড়ি ফোটায় সদ্য কিশোরী মেয়ে। জনস্রোত কলস্রোত ঠেলে বেয়াক্কেলে মানুষ এবার তাই বাজারে আলো পিছনে ফেলে হাঁটা লাগায়। শিশিরে ভিজেছে সোনালী ধানের গুচ্ছ।কোথাও বা ধানের ফুল ফুটছে সবে এখন। জোছনা মাখা ক্ষেতে জ্যোতিষের ছায়াটুকু নেই, আমের পল্লবের দর কষাকষি নেই, কেবলই পৃথিবীর গন্ধকে আগলে রেখেছে বুকের ওমে – এই মাটি। সে কেমন করে ঘুমায় বলো! বুকের নিধিকে কবোষ্ণ দোলা দিতে দিতে সে কেবল জোছনা মাখে তাই। তুমি শুনবে তার গল্প? শুনবে কোজাগরী লক্ষ্মীর ব্রতকথা?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।