অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪১)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

যাবার বেলায় শেষ বসন্ত গোলাপী লজ্জা ভাঙায়,
কে যে কার মন দোলায়, ভালোবাসা, কেন যে আবিরে রাঙায় !
আজকের এই শেষ রাতটুকু দুজোড়া ঠোঁটের কাছে ,
নতুন জোয়ায়ে ভাসবে বলেই উন্মুখ হয়ে আছে ।

রাত বাড়ে । মায়ের ঘরে আলতো বেজে চলেছে–
রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে ,
তোমায় আমায় দেখা হল সেই মোহানার ধারে…
উন্মনার শরীর বলে — ঘুমোও, বিশ্রাম নাও । কাল ভোরে উঠতে হবে । উন্মনার হৃদয় বলে — জাগো, অভিসারে জাগো । কুঁড়ি হয়ে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠো, ফুলের মতো তাকাও, জাগো, জেগে থাকো।
কতদিন পরে মায়ের কোলের গন্ধে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত নিশ্চিন্ত নিরাপরাধ ঘুমে লগ্ন হয়ে ছিল সে , আর তার কন্যাভ্রূণ তোয়া । তারপর ,মুঠো মুঠো খিদে নিয়ে মায়ের হাতের গোবিন্দ ভোগ খুদের আশ্চর্য গন্ধের ফ্যানাভাত পেটে পড়লেই তো ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়ার কথা । কিন্তু , ঘুম আসছে কই ? ও কবিমন ,আজ সারাদিন তোমার ফোন আসেনি । রাতে না হয় দুবার কল করেও আমাকে ফোনে পাওনি। তাই বলে এত অভিমান ?
ও ঘরে মায়ের নড়াচড়া আর তোয়ার উসখুস। মা উঠে নিঃশব্দে বাথরুমে নিয়ে গেল তোয়াকে । ফিরে এসে লাইট নেভাতেই আবার চরাচরের স্তব্ধতা। উন্মনা চুপ। রাতের সে নীরবতার মতো চুপ । পুরোনো দিঘির কালো জলের মতো চুপ। মায়ের সজাগ অনুভূতিকে ফাঁকি দেবার মতো চুপ । স্কুলের নাটকে মরা সৈনিকের অভিনয় করার মতো আগাপাশতলা চুপ । একসময় ওঘরে বর্ষশেষের অতলান্ত রাত নেমে আসে । আর সেই মুহূর্তেই তার স্মার্টফোনের আলো চলকে চলকে বলে — কবিমন,কবিমন, কবিমন। কল রিসিভ না করে উন্মনা অবাক হয়ে ভাবে — সে কবে অমন পিন ড্রপ কন্ঠস্বরে কথা বলতে শিখলো ! মনে মনে হেসে নিজেই উত্তর দিলো– ওরে পাগলা, শেখে, শেখে, সবাই শিখে যায় প্রয়োজনের তাগিদ এমন জিনিস যে সবাইকেই শিখতে হয়। মেয়েরা যেভাবে ক্রমশ নারী হয়ে ওঠা শিখে যায়, দামাল স্বামীর দাপুটেপনায় অভ্যস্ত হয়ে যায়; ঠিক সেভাবেই, প্রেমিকের সঙ্গে স্তব্ধ কন্ঠে আদান প্রদানের ভাষাও শিখে নেয়। স্বামী প্রাণতোষের সঙ্গে তার কোনো ফোনালাপ ছিল না, এমনকি কলেজের অফ পিরিয়ডেও ফোন করলে প্রাণতোষ হুঁ হাঁ ছাড়া কোনো উত্তর দিতো না। আর কলেজ জীবন, ইউনিভার্সিটিবেলাতে তো শুধু চিল চিৎকারেরই তপস্যা। অলওয়েজ এক্স ,ওয়াই , জেড শার্পে কথা বলার সাধনা যেন। অমলেন্দুর একটু হালকা – গভীর কন্ঠস্বর উন্মনাকে অবশ গভীরতার দিকে নিয়ে যায় ! ফোনটা নিঃশব্দে আলো বিচ্ছুরণ করতে করতে একসময় থেমে যায় । খুব মজা পায় উন্মনা ।এবার প্রায় মিনিট দু একের স্তব্ধতা । পা টিপে টিপে গিয়ে দুটো ঘরের মাঝের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে , বিছানায় শুয়ে ফোনে আর মনে একাকার হয়ে যায় উন্মনা । আজ তার প্রেম পেয়েছে । মানুষের যেমন গান পায়, খিদে পায়, কবিতা পায়, তারও তেমন করেই প্রেম পেয়েছে । শেষ বসন্তের গভীর রাত তার দুগালে লাজুক আবিররঙা চুমু দিতেই , সে কবিমনের গভীরে ডুব দিয়ে কল ব্যাক করলো। ও প্রান্তে সেই জাদু কন্ঠস্বর — হ্যালো ? তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলে উন্মনা ? উন্মনা ইচ্ছে করেই চুপ করে থাকে । তারপর ফিসফিসিয়ে বলে — মা হয়তো জেগে আছে। তুমি কথা বলো , আমি শুনছি। তারপর, কবিমনের কথা শুনতে শুনতে সেও একসময় কথার লতাপাতায় ডুবে যায় । বর্ষশেষের রাত ধীরে ধীরে গড়িয়ে যায় বর্ষশুরুর ভোরের দিকে । ওদের কথা ফুরোয় না । মুখে স্বীকার না করলেও, দুজনেই দুজনকে ছুঁয়ে দেখতে চায় ,স্পর্শের গভীরে ডুবে যেতে চায় । তেমন করে চাইতে পারলে দূরত্বটা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। উন্মনা কবিমনের বুকের গন্ধ পায় ।কবিমন তার প্রিয় নারীর অন্তহীন সঙ্গোপন খুঁজে পায় যেন। বর্ষশেষের শেষ রাত তাদের শেষ পলাশ ও রাধাচূড়ার পাপড়ি দিয়ে বরণ করে। দুজনেই কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ডুবে যায় । উন্মনা একসময় ভয় পায় ,অন্যমনস্ক হয়, সেই কবেকার আরতি মুখার্জির গানে — এক বৈশাখে দেখা হল দুজনায়, জৈষ্ঠিতে হল পরিচয়,আসছে আষাঢ় মাস, মন তাই ভাবছে কি হয় কি হয়, কী জানি কি হয় ..
প্রথমে চমক ছিল, তারপরে ভালোলাগা এসেছে
ডুবে গেছে সেই মন, যে মন খুশির স্রোতে ভেসেছে,
জানি না তো কি যে হবে, সব কিছু হয়ে গেলে তন্ময়, আসছে আষাঢ় মাস…..
তার কবিমনের রিখটার স্কেলে ধরা পড়ে, উন্মনার লজ্জায় ভরা হৃদয়ের কম্পনাঙ্ক‌। রাতের একবারে শেষ বৃন্তে এসে কবিমন তার কাছে নতুন কবিতা শুনতে চায় । স্খলিত উন্মনা, এলোমেলো উন্মনা , বেড ল্যাম্পের আবছা আলোতে তার খাতা থেকে ফিসফিস করে পড়ে নতুন কবিতা —

পথ চলা মানে আঙুলে আঙুল ছোঁয়া ,
একসাথে মানে চোখের গভীরে চোখ,
পাশে থাকা মানে জ্বরের কপালে হাত,
চুম্বন শেষে গাঢ় ভালোবাসা হোক।

যতবার তুমি অনুভবে দেবে সাড়া ,
ততবার আমি উন্মনা সারাদিন,
যতবার তুমি বুকের স্পর্শ দেবে,
জীবনের কাছে জমা হয়ে যাবে ঋণ ।

আকাশ যেমন বৈশাখী ঝড়ে ডাকে,
ময়ূরী যেমন শ্রাবণে ঝরায় পালক ,
টিয়াবন জুড়ে শালফুলে মাতামাতি,
জাতিস্মরের স্মৃতি নিয়ে তুমি বালক ।

বৃষ্টি তো জানে দিনযাপনের মানে,
ব্যালকনি জুড়ে কাঁদে প্রতিমার গান ;
কখন যে ছোঁও হৃদয় নিভৃতে তুমি ,
পাগল এ বুকে প্রাণ পেতে ডাকে প্রাণ !

পথ চলা মানে মেঘ দিগন্তে হাঁটা ,
না লেখা কবিতা ভিড় করে আসা মনে ;
পাশে থাকা মানে দেহযাপনের শেষে ,
নগ্ন হৃদয় স্বপ্নের গান শোনে ।

রাত্রিযাপনের কবিতায় নিজেদের অজান্তেই ওরা কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে। বৈশাখের প্রথম আলো ওদের আবার ঘুম ভাঙিয়ে দেয় । ওরা দুজনেই ভোরের জানলা খুলে দেখতে পায় — দিগন্তের গভীরে একটা নিঃসঙ্গ পলাশ গাছের নিচে বসে আছে বর্ষশেষ , আর কিছুটা দূরে , কচি কচি আমে ছয়লাপ আমগাছের শীর্ষডালে , উতলা উত্তরীয় দুলিয়ে দুলিয়ে প্রথম বৈশাখকে, নতুন বছরকে দুহাত বাড়িয়ে বরণ করে নিচ্ছে , সদ্য ঘুম ভাঙা প্রথম আলো।

উন্মনা ও তার কবিমন দুজন দুজনকে আলোলাগা ভালোলাগার প্রশ্বাসে নিঃশ্বাসে ডুবে গিয়ে, ভেসে উঠে, আবার ডুবে গিয়ে শুভ নববর্ষ জানালো‌।

ক্রমশ 

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।