অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪৭)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

জেগে ওঠো বজ্রদৃপ্ত জীবন বিন্যাস
বাহান্ন তাসের মতো ফুটে ওঠো তুমি
মাধবীলতার বৃন্তে উচ্ছ্বসিত হেসে
গ্রীষ্মদগ্ধ দিন শেষে আগামী মৌসুমী…

আবছা অন্ধকার ঘরে তোয়াকে এমন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে , ধীরে ধীরে অমলেন্দুর ঘুমন্ত মুখের ওপর থেকে নিজেকে সরিয়ে আনলো উন্মনা । মেয়েকে হাতছানি দিয়ে কাছে এনে বসালো । তোয়ার চুলের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে গভীরভাবে জিজ্ঞাসা করলো — খেয়েছো ? তোয়া বড় বড় চোখ মেলে পরিপূর্ণ ভাবে বললো — হ্যাঁ। তোমার বন্ধুরা খেয়েছে ? তোয়া মৃদু হেসে বললো — ওদেরও খাওয়া হয়ে গেছে। এখন বসে বসে কবিতা শুনছে । আমি তোমাকে আর বন্ধুকে খাবার জন্য ডাকতে এসেছি । তিথি মাসি আমাকে পাঠালো । আবার চুপ করে গেলো তোয়া।কোনো কৌতুহল দেখালো না দেখে ,উন্মনা ধীরে ধীরে বললো– তোমার বন্ধু তো ঘুমিয়ে পড়েছে , তাই ওর জাগবার জন্য অপেক্ষা করে আছি । তোয়া ঠিক যেন ডাকঘরের সুধার মতো বলে উঠলো — তোমার বন্ধু জাগলে তোমাদের দুজনকে একসাথে খাওয়াতে নিয়ে যাবো । উন্মনার হৃদয়ের সবটুকু ঢেউ যেন দুলে উঠলো । আত্মজাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে কপালে ছোট্ট একটা চুমু এঁকে দিলো । এই নতুন বন্ধুকে তোমার পছন্দ হয়েছে ? তোয়া নিঃশব্দে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো । উনি আমাদের সবাইকে খুব ভালোবাসেন । আমাদের এই গোটা বাড়িটারই বন্ধু তিনি । আমাদের চিরদিনের অতিথি। তাই তিনি ঘুম থেকে না উঠলে আমি একা খেতে পারবো না মা।ওনাকে সঙ্গে নিয়েই যাবো। আচ্ছা তোয়া , তোমার কি বাবার জন্য খুব মন খারাপ লাগছে ? তোয়া এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে মুখটা মায়ের কোলে গুঁজে দিলো।
বাইরের একটা গন্ডগোলের ঢেউ হঠাৎ যেন ভারী পর্দা টপকে এই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লো।‌ বাইরে থেকে বাদল মেঘের গলার আওয়াজ — দিদিভাই, একটু আসবো ? বাঁ হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে তোয়া মাকে একটু আদর করে বাইরে চলে গেলো । কবি বাদল মেঘ ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকেই অমলেন্দুকে ঘুমন্ত দেখে বললো — সরি, দিদিভাই একবার যেতে পারবে ? ব্যপারটা খুব সিরিয়াস । অমলেন্দুর দিকে তাকিয়ে উন্মনা বললো — চলো । বাইরে আসতেই দেখলো , স্টেজের ওপর এক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাকে ঘিরে একমুঠো জটলা , কথা কাটাকাটি। অর্ধেন্দু ভীষণ উত্তেজিত । তাকে থামানো মুশকিল হচ্ছে ‌ । উন্মনা শুনতে পেলো অর্ধেন্দু বলছে — শুনুন, আপনারা আমাদের অতিথি । কিন্তু তাই বলে আপনাদের এমন আচরণ আমরা কিছুতেই মেনে নেবো না। আপনারা দুজন মিলে কুড়ি বাইশ মিনিটের যে কবিতা সংকলন এখানে পাঠ করলেন, তার প্রথমে ও শেষে নিজেদের নামডাকের বিজ্ঞাপনটুকু ভালো করেই করেছেন। আবৃত্তিকার হিসেবে কতটা জনপ্রিয় সে কথাও বলেছেন । শুধু কবিদের নাম একবারও উল্লেখ করলেন না । আমরা সেই ভুলটা ধরিয়ে দিতেই উল্টে আমাদেরই ধমক দিচ্ছেন । আবৃত্তি শিল্পী ভদ্রলোক খুব শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো — আসলে কবিতাগুলো সবারই পরিচিত । তাই কবিদের নাম উল্লেখ করিনি সময় বাঁচাতে। পিছন থেকে একজন মন্তব্য ছুঁড়ে দিলো — তাহলে , নিজেদের নাম দুবার করে বললেন কেন ? আপনাদের নাম তো প্রথমেই ঘোষণা করা হয়েছিল। তাহলে ? মেয়েটি এবার রুক্ষ ভাবে জবাব দিলো — আমরা মঞ্চে অনেক সময় কবিদের নাম বলি না ।‌ কবিরা আমাদের প্রণম্য । তাঁদের নাম বলার প্রয়োজন হয় না । আমরা এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি । তিথি এবার ক্ষোভে ফেটে পড়লো — অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন মানে ? আসলে , অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন নিজেদের সম্মানিত করতে আর কবিদের অবজ্ঞা করতে । আপনারা যেখানে শেখেন অথবা যেখানে শেখান , তাঁরা প্রায় সবাই এভাবেই তৈরি হয়েছেন বা হচ্ছেন ।আপনারা কি ভাবেন , সবাই কবিদের নাম মুখস্থ করে রেখেছেন ? শুনুন একটা কথা স্পষ্ট বলে দিই — সংকলনে কোনো কবির কবিতার একটা লাইন থাকলেও সেখানে কবির নাম উল্লেখ করতেই হবে। এটা আমাদের দাবি।আবৃত্তিকার ভদ্রমহিলা কিছু একটা বলতে যেতেই কবি প্রলয় সবাইকে ইশারায় চুপ করতে বললো । তারপর হাত জোড় করে বললো — আজ আমাদের অমলেন্দু স্যার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে সবার মন খুব খারাপ। তিনি সুস্থ থাকলে হয়তো সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারতেন ‌। আপনি রেগে যাবেন না । আবৃত্তি শিল্পীরা আমাদের সম্পদ । বাচিক শিল্পের মাধ্যমেই আমাদের কবিতার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় । কিন্তু এই শিল্পের জনপ্রিয়তা তো কবিতার হাত ধরে , কবির সৃষ্টি ঘিরে । আমরা কেন ভেবে নেবো সবাই সব কবির নাম জানেন ? কাজেই , নাম বলাটা তো খুব জরুরী। আর তাছাড়া, আপনারা তো অনেক মঞ্চেই অর্থের বিনিময়ে কবিতা পরিবেশন করে থাকেন । উদ্যোক্তারা সাধ্যমত আপনাদের দাবি মেটান । এখানে আমার ছোট্ট একটি জিজ্ঞাসা– আপনারা কি সেই প্রাপ্য অংশ থেকে কবিদের কাছে কিছুটা পাঠিয়ে দেন রয়্যালটি হিসেবে ?
এমনকি কবিদের নামও বলেন না ? আপনাদের নৈতিকতা কি বলে ? কবিরা কি কোনোদিনও সেই অর্থের প্রত্যাশী হয়ে বসে থাকেন ? কবিরা দিনের শেষে আপনাদের কাছে অর্থের জন্য হাত পাতেন না । তাঁরা কালি কলম মন দিয়ে আরেকটি অসামান্য কবিতা রচনা করেন । সমবেত বিপুল হাততালি নিমেষে থামিয়ে দিয়ে প্রলয় আবার বললো — বাড়ি ফিরে গিয়ে আপনাদের আবৃত্তি সংগঠনকে এই জরুরী কথাগুলো পৌঁছে দেবেন ! আবারও বলছি, আপনারা আসমান্য শিল্পী । কিন্তু কেউ আপনাদের কবিদের নাম না বলার স্বাধীনতা দেননি। আবৃত্তিকার ভদ্রলোক হাত জোড় করে বললো — আমরা ক্ষমাপ্রার্থী ।ভুল হয়েছে । বিষয়টা নতুন করে ভাববো । সংগঠনেও আলোচনা করবো। আপনারা প্লিজ ভুল বুঝবেন না । কবিদের অসম্মান করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই । প্রলয় ভদ্রলোককে জড়িয়ে ধরে বললো — অসামান্য আপনাদের নিবেদন। কী অনায়াস ভঙ্গিতে আপনারা বিষ্ণু দে থেকে আল মাহমুদ ছুঁয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত কবিতায় কবিতায় ভেসে বেড়াচ্ছিলেন ! সবশেষে বুদ্ধদেব বসু ,অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথের ঐকতান কবিতায় এসে শেষ করলেন । আহা , মন ভরে গেছে একেবারে । অনেক অনেক নামডাক হোক আপনাদের । অনেক দূরে যাবেন , সাবধানে ফিরবেন। আবার দেখা হবে । আমরা অপেক্ষায় থাকবো । নমস্কার।

সঠিক সময়ে প্রলয়ের এই নেতৃত্ব মুগ্ধ করলো উন্মনাকে। মঞ্চ ফাঁকা হয়ে গেলে ভবিষ্যৎ পরিচালন মন্ডলীর একটি খসড়া প্রস্তাব আনার কথা ছিল কবি বাদল মেঘের । অমলেন্দুকে মাথার ওপর রেখে সেই খসড়া পরিচালন মন্ডলী তৈরি করা হয়েছে‌।অর্ধেন্দুর উৎসাহ ও উদ্দীপনার কারণে তাকেও কমিটিতে স্থান দেওয়া হলো। কথা উঠলেও অমলেন্দুর প্রতি আস্থা কেউ হারালো না । মঞ্চে অমলেন্দুর অনুপস্থিতিতে খসড়া কমিটির কথা ঘোষণা করতে গিয়ে উন্মনার গলা বারবার কেঁপে যাচ্ছিল। তবু যখন ভোটাভুটিতে না গিয়ে সবাই হাত তুলে সমর্থন জানালো , তখন বিকেল ঘনিয়ে এসেছে। তিথি ও পাগলা বিন্দাস দুজনেই আজ খুব মনমরা । তবু তাদের গলায় একটি একটি করে গান এবং সবশেষে “আকাশ ভরা সূর্য তারা” সবাই মিলে গেয়ে , আজকের অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটালেন পুরুলিয়ার প্রবীণ কবি কার্তিক দাস। স্থির হল , মাসখানেক বাদে আবার সবাই মিলিত হবে । ইতিমধ্যেই মূল দায়িত্ব দেওয়া হল কবি প্রলয় ও উন্মনাকে । সহযোগিতায় থাকবে অরুণিমা, তিথি ,বাদল মেঘ এবং অর্ধেন্দু। এই নতুন কমিটি যাদের মনে করবে , প্রয়োজন মনে করলে তাদের ডেকে নেবে , এটাও সিদ্ধান্ত হলো।
মঞ্চ থেকে নামতেই উন্মনার মন ছুটে যেতে চাইলো ঘুমন্ত অমলেন্দুর কাছে , কেননা স্কুটিতে করে অমলেন্দুর এতটা রাস্তা ফেরার ব্যপারে সবাই ভয় পাচ্ছিল। সমস্যা সমাধান করতে এগিয়ে এলো মা মৃত্তিকা। বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে জানালো — অমলেন্দু স্যারকে আজ কোনোমতেই একলা ছাড়া যাবে না । আজ তিনি এখানেই বিশ্রামে থাকবেন । কাল সকালে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরবেন । উন্মনা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো । তার মা এতটা মনের জোর কোথায় পেল ? গ্রামের সামাজিক অবস্থানের কথা মাথায় রেখেই মা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে হলো তার। ইতিমধ্যে ,স্থানীয় দু একটি কাগজ ও মিডিয়া সাংবাদিক ছেঁকে ধরলো তাদের । নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে উন্মনা মুখোমুখি হলো প্রশ্নের । তাড়াতাড়ি কয়েকটি চেয়ার টেনে নিয়ে সবাইকে বসালো উন্মনা । প্রলয়, বাদল মেঘ আর তিথিকে ডেকে নিলো নিজের কাছে । হঠাৎ মনে হলো — অন্তত আধঘন্টা এই সাংবাদিক সম্মেলনে চলবে। তার আগে একবার ওই মানুষটাকে দেখে আসা প্রয়োজন । একবার ভাবলো , মাকে ডেকে জিজ্ঞেস করে নেবে। কিন্তু দেখতে না পেয়ে মিডিয়া সাংবাদিকদের বিনীতভাবে বললো — আপনারা চা খান । প্লিজ , আমি একটু আসছি।
পর্দা সরিয়ে অমলেন্দুর ঘরে ঢুকতেই অবাক হয়ে গেল উন্মনা। সদ্য ঘুম ভাঙা তার কবিমনের কাছে বসে আছে মা। খুব ধীরে ধীরে বলছে — আমাদের পরিবারের অতিথি আজ তুমি । শরীরের এই অবস্থায় তোমাকে আমরা একলা ছাড়তে পারবো না । অনুষ্ঠান খুব ভালোভাবে মিটেছে। তুমি আজকের দিনটা এখানেই থেকে যাবে । ওই দেখো , তোমাকে আমি তুমি করে বলে ফেললাম । তা হোক, যেহেতু আমি উন্মনার মা , তোমার কাছে আমি মায়ের মতনই । শরীরে অনেক ধকল গেছে । এবার তোমাকে কিছু খেতে হবে । আমার মেয়েটাও না খেয়েই আছে । অমলেন্দু ক্লান্ত গলায় ,’উন্মনা কোথায়’ বলতে গিয়েই, দরজার ফ্রেমে উন্মনাকে দেখতে পেয়ে , একটু স্নিগ্ধ হেসে বললেন — ভালো আছি। খিদে পেয়েছে। কিছু খাওয়াবে ?

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।