T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় অমৃতা ভট্টাচার্য

আজ পয়লা আশ্বিন
রান্নাঘরে যারা প্রতিদিন ফিরে আসে ইচ্ছেয় অথবা অনিচ্ছেয়, তাদের ছবি টাঙিয়ে দিয়ে নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা জারি করে লাভ কী! তারা তো নিরুদ্দেশ হতে চেয়েও পারে না! তাদের ঘর আর গেরস্তালি সামালাবে কে বলো? যারা ভাত উপুড় দিতে শেখেনি, যারা শসার আঁঠা বের করে নিতে শেখেনি, তাদের মুখে দুটি গরম রুটি তুলে দেবার দায় যার ঘাড়ে চেপেছে তার কি পালিয়ে যাবার জো আছে! নিরুদ্দেশ অভিলাষী মন তাই মনখানা বাক্সে তরঙ্গে তুলে রেখে চালকুমড়ো কাটে, পোস্ত বাটে, ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে গ্যাসের চারিপাশ মুছে নেয়। এইসব হয়ে গেলে একেকবার আকাশ দেখে, একেকবার পোকা লাগা ডালখানা মেলে দিয়ে আসে চিলতে বারান্দায়। ডালখানা থাকুক এখন, মন তুলে রাখা হাত এখন মন ডুবিয়ে আলমারি খুলে বসেছে। কপ্পূরের পুটলি দেওয়া আলমারির ভাজে ভাজে পুজোর গন্ধ ভরে আছে আঁধারকে ভালোবেসে। এমন আঁধারে ঘিরেছে যে বিশ্ব সংসার, তার থেকে আর নিস্তার নেই বুঝি! আশ্বিনের পয়লা তারিখে মেঘ রোদ্দুরে পা ডুবিয়ে ন্যাতা ঘোরানো হাত তাই দরজার চাবি ঘোরায় এতদিনের অভ্যাসে। হারিয়ে যাওয়ায় অভ্যাস যাদের আছে তারা জানে কেমন করে ভিড়ের মধ্যে পঙ্ক্ষীরাজ নাও ভাসিয়ে ভেসে যেতে হয় এদিক সেদিকে। ভিড় ঠেলে ঠেলে এগোবার প্রয়োজন হয়না অবশ্য, আশ্বিনের রোদ কেবলই পিছলে যেতে চায় মেঘের আড়ালে। অনেকদিন পর হারিয়ে যাওয়া মন পয়লা শরতের রোদ্দুরে হাঁটছে আর হাঁটছে। এতকাল সে কোথায় যে নিরুদ্দেশ হয়েছিল, কে জানে! সেই বেরঙিণ জীবনে টিকে থাকার কী আশ্চর্য কৌশল ছিল। সেই কি হল বেঁচে থাকা! ওই দেখ না, ঝুড়ি ভরে কুমড়ো ফুল আর গন্ধলেবু সাজিয়ে বসে আছে যে ছোকরা, ওর গালে বিষাদের রঙ লেগেছে কেমন। আর ওই যে ছুকরি উঁচু করে চুল বেঁধে হাঁসের ডিম বেচতেছে, ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াও না! দেখবে ও তখন কেমন সুরে ডাকে। এই ডাক উপেক্ষা করে চলে যেতে চাও যাও। নিরুদ্দেশ থেকে ফেরা মানুষের কি আশ্বিনের রোদ গায়ে মাখতে নেই! ন্যাতা ঘোরানো হাত তাই বেছে বেছে টুকটুকে প্লাম কেনে, হাঁসের ডিম কেনে, এক গোছা টেবিল গোলাপের চারা কেনে। আহা! ব্যাগ উপচানো পুজোর বাজারে রোদ্দুর তখন পিছলে যেতে চায় কী অবলীলায়। তোরঙ্গে তুলে রাখা মন এবার ডানা মেলে দিয়ে ভাসছে। ঘরের ক্লান্তিখানা নামিয়ে রেখে দু’কাপ চা খেয়ে নেওয়া যাক বরং। নিরুদ্দেশের জীবনে আর যাই থাক বেঁচে থাকার ওম নেই। খুন্তি ঘোরানো হাত তাই বেছে বেছে শারদীয়া কিনছে, ধুনোর প্যাকেট কিনছে। এসব মিটে গেলে আবার হারিয়ে যাবার তাড়া, সেই আবার চাবি ঘোরানো পুরনো বার্নিশ করা দরজায়। ইশ্ সে দরজাখানা যদি নাই খোলে তবে বেশ হয়। কিন্তু তেমন তো হয় না, হাঁসের ঘরের মতো চৌখুপিতে নিরুদ্দেশ হতেই হবে। অন্তরীণ জীবনে তলিয়ে যেতে যেতে তাই আশ্বিনের রোদ্দুরখানিকে ভারি ভালোবেসে ফেলতে ইচ্ছে করে তখন। আকাশে রোদ্দুরখানা থাকতে থাকতে টুকটুকে প্লাম আর ফুটফুটে কুমড়ো ফুলে মন ডুবিয়েই দেওয়া যাক না। ও মা, কী আশ্চর্য! ফুলে, ফলে ভরে উঠতে উঠতে ন্যাতা ঘোরানো হাত টের পায়, এই তার পুজোর সাজ। নিরুদ্দেশ থেকে ফেরা মানুষ যেমন করে আশ্বিনের মাঠের প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়, যেমন করে পৃথিবীর শেষ রঙটুকু চুরি করে নিতে যায়, এ তো তারচেয়ে অন্য কিছু নয়! জীবনের উৎসবে ফিরতে তখন তার বেশ লাগে। তখন সে বসে বসে লালটুকটুকে প্লামের জেলি বানায় আর রেড রাইডিং হুডের গল্প পড়ে। পড়তে পড়তে সে টের পায় তার হারিয়ে যাওয়া আশ্বিন ওই তো দাঁড়িয়ে আছে! ওই যে, লাল টুকটুকে খুকি! নাহ্ বাক্সে তুলে রাখা মনখানা খানিক নামিয়ে নেওয়াই ভালো। মানুষ কি কেবল পোকা লাগা ডাল রোদ্দুরে দেয়! নিরুদ্দেশ হওয়া মনখানা দেয় না বুঝি!