অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

বনরেখায় নীল হেমন্ত দিন,
স্তব্ধ গভীর দূর পাহাড়ের কাছে ;
এবার তবে কোন অজানার বৃন্তে ,
উন্মনা , তোর রূপকথাটি আছে ?

আচ্ছা , মায়ের নাম যদি মৃত্তিকা হয় , মেয়ের নাম যদি উন্মনা , তাহলে আদরের নাতনির নাম তো করোতোয়া হতেই পারে , তাই না ? এই মুহূর্তে মা মৃত্তিকা গলার একটু উঁচু পর্দায় ডাকছে — তোয়া , এই তোয়াই , বেলা যে গড়িয়ে গেলো , উঠতে হবে না ? স্কুলে যেতে হবে না ? সকালের এই সময়টা প্রত্যেকটা গৃহস্থ বাড়ির কাজের দিগন্তে , ঘরকন্নার অণু-পরমাণুতে যেন একটা হুড়োহুড়ি লেগে যায় । ঘর পরিষ্কার করো রে , তুলসী তলায় জল দাও রে , গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে সুপ্রভাত বলো রে , এফএম’টা আলতো করে চালিয়ে দাও রে, তারপর গ্যাস জ্বেলে একটা ওভেনে চা-টিফিন , অন্য ওভেনে ভাত ডাল ব্যঞ্জন…সবকিছুই যেন বলে দিচ্ছে–এখন দূর পাহাড়ের দিকে তাকানোর সময় নয় ।সময় নয় কাছের জঙ্গলের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া টিয়ার ঝাঁক দেখার। তবে , কানের ভিতর দিয়ে মনের গভীরে সেঁধিয়ে দেওয়ার জন্য গান তো থাকলোই । সেটা শুনতে আপত্তি কি ? মা মৃত্তিকা , মেয়ে উন্মনার মতো অতো গম্ভীর-টম্ভীর নয় , বরং মেয়ের গভীরতা আর নাতনির উচ্ছ্বাসের মধ্যিখানে যেন একটা ছোওওট্টো বাঁশের সাঁকো ; শুধুই দুলছে আর দুলছে , আর রেডিওতে শুনছে সেই কবেকার মহম্মদ রফির বাংলা গান — ওই দূর দিগন্ত পারে , যেথা আকাশ মাটিতে কানাকানি ,
তোমার আমার শুধু এমনি করেই জানাজানি…
চায়ের কাপ হাতে মা-মেয়ে বসে পড়েছে দাওয়ায় , পা দুলিয়ে আর উঠোনে বুড়ো আঙুলের ছোঁয়াটুকু দিয়ে। এই মুহূর্তে দূরের জঙ্গল থেকে বনদেবতার কোন অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যামেরাম্যান যদি জুম করে মা মেয়েকে ধরে , তাহলে ঘরপোষা ডালিম পেয়ারা গাছের মধ্যে দিয়ে , শিউলি-চাঁপার প্রান্তসীমা ছুঁয়ে , আটান্ন বছরের মা আর আটত্রিশ বছরের মেয়েকে অনেকটা একইরকম দেখাবে সেলুলয়েডের পর্দায়। না না, ওদের নিয়ে কোন সিনেমা হবে না , এটা শুধুই কল্পনা। ডিজাইন করা চায়ের কাপের মাঝখানে একবাটি বাঁকুড়া জেলার মুড়ি আর লক্ষ্মীপুজো পেরোনো দু-একটা নাড়ু । তোয়া উঠে পড়ে হইচই বাধানোর আগেই , মা-মেয়ের এই নিঃশব্দে পাতা চায়ের গন্ধটুকু নিয়ে নেওয়া যেন শিরশিরে হেমন্তর সকাল যাপন। গ্রামের নাম বনশিউলি। কাছের স্টেশন ছাতনা । তাও বাড়ি থেকে চার -পাঁচ কিলোমিটার হবে । দৃষ্টিসীমার কাছাকাছি অরণ্যরেখা। প্রাণভরা একটা ছোট্ট জঙ্গল। বেড়ে ওঠা শালগাছের শীর্ষবিন্দুগুলো যেন দুহাত বাড়িয়ে আকাশসীমায় পৌঁছতে চায় , ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত । তারপর রাত পাখিদের কোলে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই গাছপালাদের হাজার হাত সারা আকাশে ছড়িয়ে দেয় টিয়া বুলবুলি তিতির ময়না। কেউ উড়ে যায় দূর পাহাড়ের দিকে , কেউ লোকালয়ে এসে উন্মনা- করোতোয়া-মৃত্তিকার বাঁশের বেড়াতে বসে ন’-দশ কাঠার গাছগাছালি ভরা আধপুরোনো দেড়তলা বাড়িটার দিকে অবাক চোখে চেয়ে থাকে । করোতোয়া , মানে আমাদের তোয়া , বাটিভর্তি মুড়ি ছড়িয়ে দেয় শালিখ চড়ুই কাক আরো কত জানা-অজানা পাখির দিকে , তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই ।শেষ শিউলির গন্ধ মেখে ডালে বসা মাছরাঙা যেন তপস্বীর মতো সেসব দেখে , নিঃশব্দে উড়ে যায় কাঁসাই নদীর দিকে , একটু আমিষ গন্ধের আশায় । গ্রামের বটগাছ থেকে কুবো পাখির ডাক আসে একটানা— কুব কুব কুব…. প্রাজ্ঞ কাঠঠোকরা বটের গুঁড়িতে ধীরে ধীরে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় নিখুঁত শিল্পচর্চায়। তালগাছ সরসর করে , আর দুলে ওঠে সারি সারি বাবুইবাসা ; যা দেখে মা ও মেয়ের একইসঙ্গে মনে পড়ে যায় , মাত্র তিন বছর আগে ফেলে আসা , পশ্চিম মেদিনীপুরের সেই তালবাগিচার কথা। শ্বশুর শাশুড়ি দেবর ননদদের সংসারে হঠাৎ যে অশান্তির দাবানল তৈরি করেছিল উন্মনার কলেজ শিক্ষক স্বামী প্রাণতোষ মাইতি , সেই অশান্তি নিতে পারেনি রোমান্টিক কবিতা পাগল , গান পাগল , গীতবিতান-সঞ্চয়িতা- সঞ্চিতা-জীবনানন্দ আর সুকান্ত সমগ্র পাগল উন্মনা। শ্বশুরবাড়ির নাম শান্তনীড়, ততদিনই ছিল প্রশান্তিতে যতদিন না গ্রাম বনশিউলির অন্তরঙ্গ থেকে অসুস্থ বিধবা মাকে এনে নিজের কাছে রাখলো উন্মনা,যাঁর সম্বল বলতে ছিল শুধু প্রয়াত স্বামীর পেনশনটুকু। মা আসার পরেই স্বামী প্রাণতোষ কেমন যেন বদলে গেলো । কী আশ্চর্য , তাই না ? যৌথ পরিবারে বড় হয়ে ওঠা কঠোর পরিশ্রমী মেধাবী প্রাণতোষ কেন যে তার সহজ স্বাভাবিক মাকে মেনে নিতে পারলোনা ,তা আজও মৃত্তিকার কাছে চরম বিস্ময় ! ছুতোয় নাতায় অহেতুক অশান্তি করতে লাগলো , প্রতিদিন , প্রতিমুহূর্তে। খুব সুন্দর একটা ফুলবাগিচার ওপর দিয়ে যখন ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায় , তখন ফুলেদের দশদিগন্ত জীবন যেমন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হাহাকার করে , মরে যায় , নিঃস্ব হয়ে যায় — ঠিক তেমনই , বিজ্ঞানের অধ‍্যাপক প্রাণতোষ মাইতি উনকোটি কুসংস্কার আঁকড়ে জেদী ও একরোখা জীবনটাকেই বেছে নিলো । কৃষ্ণকলি বউ তার উন্মনা– তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠলো ক্রমশ । পল্লীর ছেলেমেয়েদের নিয়ে নারী উন্মনার পঁচিশে বৈশাখ ,বাইশে শ্রাবণ , মহালয়া ,স্বাধীনতা দিবস , নজরুল জয়ন্তী , সুকান্ত সন্ধ্যা , প্রতিবাদী মিছিলে হাঁটা– সব তালগোল পাকিয়ে গেলো । স্বামীহারা শাশুড়িকে বিন্দুমাত্র মর্যাদা দিলো না প্রাণতোষ । অসুস্থ হয়ে মেয়ের বাড়িতে আসা মৃত্তিকা লজ্জায় দুঃখে ক্রমশ মাটির কাছাকাছি মিশে যেতে থাকলো। বছর তিনেকের শিশু তোয়াও বাবার এই হঠাৎ পরিবর্তন কিছুতেই মেনে নিতে পারলোনা। বাবার কাছে যাওয়াও বন্ধ করে দিলো । কাগজে কলমে বিচ্ছেদ না হলেও, মতান্তর-মনান্তর ঘটে গেলো একই সঙ্গে । তাই যৌথজীবনে জড়িয়ে থাকার আর কোনো প্রশ্নই থাকলোনা। এই বিচ্ছেদ তখন সুনিশ্চিত হয়ে গেল , শিশু তোয়াও যখন করোতোয়া স্রোতস্বিনী থেকে বদ্ধ জলাশয় হয়ে যেতে থাকলো । উন্মনার আর কোন উপায় ছিল না , মা-মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসা ছাড়া । মধ‍্যবিত্ত মা-বাবার একমাত্র সন্তান বাঁকুড়া জেলার ছাতনার গভীরে শালজঙ্গলঘেরা ছয়ঋতু বারোমাসের মায়ের বাড়িটাকেই বুকের গভীরে জড়িয়ে নিলো। এই ছায়াঘেরা আশ্রয় হয়ে উঠলো তিনটি নারীজন্মের ভালোবাসার স্বর্গ। গ্রামের ছেলে-মেয়েদের জুটিয়ে এনে , একটা পাঠশালা গড়ে তুলল উন্মনা।দু-একমুঠো রোজগারও হতে লাগলো। পড়ানোর সঙ্গে কবিতা বলা, ছবি আঁকা , বনভোজন সবই চলতে থাকলো। কোথাও লেখা নেই , কারোকে জানানোরও নেই ; তবুও উন্মনার এই এক টুকরো স্বপ্নের নাম লোকের মুখে মুখে রটে গিয়ে হয়ে গেল — উন্মনার পাঠশালা । স্বামী প্রাণতোষ যেন কোন সুদূরে , তালবাগিচায় তার কাচের স্বর্গে , সুখে-শান্তিতে ভাই বোন মা বাবার সঙ্গে বসবাস করছে। না একটা চিঠি , না একটা ফোন , না মেয়ের খোঁজখবর। ভালোই হয়েছে । উন্মনা ভাবে, সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করা গেলো , সম্পূর্ণ নতুন করে । আসলে যে যাই বলুক, নারীর নিজস্ব একটা ভুবন আছে , সম্পূর্ণ আকাশ আছে, রাতের ছায়াপথ আছে , সুজন প্রতিবেশীদের নিয়ে দুবেলা-দুমুঠো অন্ন জুটিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা আছে‌ । হ্যাঁ, এখনও আছে । সেই ভালোবাসার দিগন্তেই আপাতত থিতু হয়েছে আমাদের মৃত্তিকা , ছোট্ট করোতোয়া নদী , আর নারী উন্মনা । ওই দেখো , বলতে বলতেই এফএম-এ বেজে উঠলো নির্মলা মিশ্রের আরেকটা মন কেমন করা গান—
ওই গেরুয়া মাটির পথ ছাড়িয়ে ,
যেখানে বাতাস এসে কথা বলে চুপিচুপি,
দেবদারু পাইনের পাতা নাড়িয়ে ,
ওই গেরুয়া মাটির পথ ছাড়িয়ে…

মা ! আমার ফোনটা বাজছে… তোয়াকে ডেকে তোলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে তো ! ফোনটা একটু আমার হাতে দেবে ? আমি গাছে জল দিচ্ছি….
উন্মনা মৃত্তিকার উন্মুখ প্রাণ এখনও রেডিওর গানে গানে।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।