সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অর্পিতা বোস (পর্ব – ৯)

বৃত্ত
“হাতটা ছাড়ুন! ছেড়ে দিন! ছেড়ে দিন আমায়…”
আবারও রূপসার গলা কানে আসে। সাত্যকী দেখে রূপসার চোখেমুখে কেমন এক আতঙ্কের ছাপ। রাহুল নিষ্পাপ শিশুর মতো রূপসাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। সাত্যকী জানে একটা সময় এই ধরনের পেশেন্ট একজনকে অবলম্বন করে বাঁচতে চায়। এটাই স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে যদি স্মৃতি ফিরে আসে তখন সবটাই ভুলে যাবে। কিন্তু রূপসার কী হলো!
সাত্যকী এগিয়ে ওদের কাছে যেতেই অদ্ভুত ব্যবহার করে রূপসা। কোনওমতে রাহুলের হাত ছাড়িয়ে সাত্যকীর কাছে এসে জড়িয়ে ধরে। বিড়বিড় করে কিসব বলতে থাকে কান্না ভেজা গলায়। ঘটনার আকস্মিকতায় সাত্যকী কিছুই বুঝতে পারে না। শুধু দেখে রাহুলের মুখটা বদলে গেছে। চোখে আগুন আর লালা ঝরতে থাকে মুখ থেকে।
সাত্যকী অন্য সিস্টারকে ডেকে রাহুলকে ঘরে নিয়ে যেতে বলে। এখনই রাহুলকে শান্ত করা খুব দরকার। কিন্তু বুক ভিজে যাচ্ছে রূপসার চোখের জলে। সাত্যকী হাত ধরে রূপসাকে দাঁড় করায়। একজন চিকিৎসকের কাছে রূপসা এবং রাহুল দুজনেই এখন পেশেন্ট। কিন্তু গুরুত্বের বিচারে প্রাধান্য পায় রাহুল। রূপসাকে রিহ্যাবের বারান্দায় বসে শান্ত হতে বলে। সিস্টার তানিয়াকে চোখের ইশারায় রূপসাকে দেখতে বলে। নিজে রাহুলের ঘরের দিকে ছোটে। বুকটা খচখচ করে। ঠিক এখনই রূপসার কাছে থাকা দরকার ছিল। কিন্তু সাত্যকী এখন সবার আগে একজন চিকিৎসক। রোগীর গুরুত্বের তালিকায় প্রথম স্থানে রাহুল। আপনজন তারপর।
১৮
সাত্যকীর রুমে বসে আছে রূপসা। হাতে জলের গ্লাস। জল খেয়ে ধাতস্থ হলেও যেন আতঙ্কটা কাটেনি। অহেতুক আতঙ্ক জেনেও কেন যেন নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি! রাহুল হয়তো হাতটা ধরেছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টায় অথবা নিজের অসহায় অবস্থায় রূপসাকে আঁকড়ে ভালো থাকার ইচ্ছেয়। সাধারণত এমনই করে থাকে এইধরনের রোগীরা। কিন্তু রূপসার অতীত আজ এই প্রথম নিজেরই দায়িত্ব কর্তব্যের বাধা হয়ে দাঁড়ালো। নিজেকে অপরাধী লাগছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে রূপসার দশবছর পেছনের রাহুলের কথা মনে পড়ছিল। সাত্যকী স্যারকে আজ প্রথম আঁকড়ে কাঁদতে কাঁদতে কি বলেছিল নিজের মনে নেই। এতদিনের লুকিয়ে রাখা অতীত আজ সবটাই বোধহয় স্যার জেনে গেলেন। এসব ভাবনার মাঝেই কানে এলো
– রূপসা!
এই প্রথম সাত্যকী নাম ধরে ডাকল! এতবছর মিস চক্রবর্তী বলেই সম্বোধন ছিল। রূপসার বুকটা কেমন করে উঠল।
সাত্যকীর মুখ থেকে আজ প্রথম কিভাবে রূপসা নামটা বেরিয়ে এলো নিজেও তা জানে না। অমন অসহায় অবস্থায় রূপসাকে ফেলে রাহুলের কাছে চলে গিয়েছিল তারজন্য মনে একটা খারাপলাগা ছিল সাত্যকীর।
সেই মুহূর্তে আবেগকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। চেয়ারটা ঠেলে রূপসার মুখোমুখি বসল চিকিৎসক সাত্যকী। এখন জানে রূপসার মানসিক নিরাময় দরকার। আজ রূপসা সাত্যকীকে জড়িয়ে ধরে কিছু বলেছিল ঠিকই, কিন্তু কিছুই স্পষ্ট নয়। তবে রাহুলকে নিয়ে অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ রূপসার মনের বহু গভীরে সেটা স্পষ্ট। উদভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক তাকাচ্ছে রূপসা। মনের ভেতরের ঝড় লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। পরবর্তী চিকিৎসার পরিকল্পনা মনে মনে স্থির করে সাত্যকী। শান্ত গলায় ডাকে,
– রূপসা
রূপসা তাকাতেই চোখে চোখ রেখে সাত্যকী বলে ওঠে,
— রাহুলকে নিয়ে তোমার সমস্যাটা আমি আজ বুঝতে পারলাম। তবে আমার মনে হয় যতটা আমাকে বলেছ বাকিটা বললে তোমার মন হালকা হবে। আর সেটা আমাদের সকলের ভালো থাকার জন্য অত্যন্ত দরকার ।
আজ প্রথম রূপসার ইচ্ছে হলো সবটুকু সত্যি সাত্যকীকে জানানোর। বোধহয় এতদিনের লুকিয়ে রাখা ক্ষতর উপশম সাত্যকী স্যারের কাছেই আছে। তখনই মনে পড়ল সেই ঘটনার পর কতটা অপদস্ত হতে হয়েছে অতীতে। চেনাশোনা কাছের মানুষগুলো কেমন দূরের হয়ে গেছে। সাত্যকীও যদি সব জেনে দূরে চলে যায়। বাবা! ঐ ঘটনার পর বাবা দাঁড়িয়ে ছিল মাথায় ছাতা হয়ে। বাবাকে খুব মনে পড়ছে। বাবা কোথায় হারিয়ে গেল! আর কখনও কী বাবাকে খুঁজে পাবে না?
একটা রোগ, কিছু মানুষের নারকীয় কাজ সব মিলিয়ে রূপসার জীবনটা তছনছ করে দিল।
কানে এলো আবার সাত্যকীর ডাক,
— রূপসা
মনের ভেতরে চলতে থাকা কালবৈশাখীর মেঘেরা এবার রূপসার চোখ বেয়ে বৃষ্টিধারায় ঝরে পড়ল।
ক্রমশ