অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৫৭)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয় ঋতু

তুমি দিয়েছিলে সেই আশ্চর্য আকাশ
আমি তাই বর্ষণের মেঘ-প্রতিশ্রুতি,
তুমি দিয়েছিলে এক মুঠো জলোচ্ছ্বাস
আমার আঁচলে তাই ধান- জোছনার অনুভূতি !

ফোনের এ প্রান্তে ও প্রান্ত চুপ । বেশ কিছুক্ষণ পরে কবিতার নারী উন্মনার অস্ফুট উচ্চারণ–কী হলো কবিমন , চুপ কেন ? কি করে শুরু করবো বুঝতে পারছিনা । একটা ঘটনা কিভাবেই যেন দুজনের জীবনটাকেই পাল্টে দিলো, তাই না ? মাঝ বয়স পর্যন্ত পেরিয়ে এসে দেখছি–আমার শুরু শেষ আদি অন্ত কিচ্ছু নেই । শিকড়হীন নিরালম্ব একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছে নিজেকে। কবিতার নারী , তোমার তবু একটা বিবাহিত জীবন ছিল, আছে , হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। দুমড়ে মুচড়ে গেলেও ভাঙা বেড়া মেরামত করে, আবার নতুন করে গৃহ প্রবেশ করা যাবে । আমার কী পড়ে থাকল বলতো উন্মনা ? আমি তোমাকে ছাড়া এই কবিতাজন্ম আঁকড়ে থাকবো কি করে ? চারপাশে যারা আছে, তারা আমার বন্ধু , সহচর , সহকর্মী ; কিন্তু তুমি তো আমার সার্থক অনুপ্রেরণা,আমার স্বপ্ন আমার উন্মনা মন ! তোমার জায়গা পূরণ করবে কে বলতো ? তোমার মত কবিতা আমি কোনদিন লিখতে পারবো না। তাই তোমাকে কবিতা ভেবেই আঁকড়ে রয়েছি । সেই তুমি যদি সরে যাও, তাহলে আমার কাছে এই কবিতাজীবনে থাকা না থাকা সমান । আমি জানি না, কথাগুলো বলে তোমাকে আঘাত দিলাম কিনা। কিন্তু একদিন তো বলতেই হতো। একদিকে কবিতাকে নিয়ে আমাদের একটা সামাজিক জীবন গড়ে উঠতে চলেছে , বর্ষা পেরিয়ে শরৎ ,শরৎ পেরিয়ে হেমন্ত এলেই , সবাই মিলে সেই কাঠামোটাকে তুলে ধরবো‌ নীল আকাশের নিচে। কিন্তু সেখানে তুমি থাকবে না ! তুমি তোমার ভাঙা সংসারটা আবার গড়ে পিটে নেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তোমার মেয়ে আবার তার বাবাকে ফিরে পাবে। জন্মদাতা পিতাকে ফিরে পাবে । রক্তের টান প্রতিদিন অনুভব করবে । আর তুমি তোমার মালা বদল , সাত পাকে বাঁধা জীবনের অতীত সৌরভে ভেসে যাবে , মিশে যাবে ধীরে ধীরে । তোমার কবিতা লেখার হাত হয়তো আরো শানিত হবে। বড় বড় পত্রপত্রিকা তোমাকে কবি বলে স্বীকৃতি দেবে । পুরস্কার পাবে । কিন্তু সেই পুরস্কারের জয়ধ্বনিতে আমি কোথাও থাকব না । থাকবেন তোমার স্বামী প্রাণতোষ। তুমি কি একবারও ভেবে দেখেছো, সেই মুহূর্তগুলোর কথা?
ছিঃ কবিমন। উন্মনার কণ্ঠস্বর যতটা গভীরতায় , যতটা অতল স্পর্শ করতে পারে , ঠিক ততটাই গভীরে গিয়ে ধিক্কার জানালো–কবিমন , একজন নারীর জন্য তোমার এই স্বপ্নসৌধ ভেঙে ফেলবে ? এটা কি তবে মেঘ প্রাসাদ ছিল ? ঝড় হলেই যা দিগন্তে মিলিয়ে যায় ? বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে মাটিতে ? আর ,আমি থাকলাম না এটাই বা তোমাকে কে বললো‌ ? আমি জানতে চাই তুমি কোন দিগন্ত থেকে এই অলীক কথাগুলো কুড়িয়ে আনছো ? একটা বড় কাজে গতি বিরতি সবই আসবে। আমরা তো কেউ সংসারে একজন সন্ন্যাসী নই কবিমন । মেয়েরা সংসার কখনো ভাঙে না ,গড়ে । আমিও তাই আমার স্বামীকে সংসার জীবনে ফিরে আসার জন্য সহযোগিতা করছি। তার একাকীত্ব , তার অসুস্থতা , জীবন ছেড়ে পালিয়ে যাবার অনুভব– সবই আমাকে বিদ্ধ করছে কবিমন। মাঝখানে কয়েক বছর তিনি নড়ে গিয়েছিলেন বলে, আমাদের সম্পর্কটা তো মিথ্যে হয়ে যেতে পারে না। আমি সেই সম্পর্কের শিকড়ে আবার জল ঢালছি। তিনিও যদি জল ঢালেন, তবেই সেই সংসার আবার টিকে বেঁচে থাকবে। তা নয়তো থাকবে না। আমার স্বামী প্রাণতোষ অসুস্থ হওয়ায় পর জীবনে কতগুলো চরম সত্যের মুখোমুখি হয়েছি এক রাতের মধ্যে। আমি অনুভব করেছি , সবকিছু একজনের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। তিনি আমাকে অনেক কিছুই দিতে পারেননি , তবু একটা ঘর বারান্দা আর ব্যালকনিতে দিয়েছেন । এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে , বর্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়া যে মাধবীলতার গুচ্ছ আমাকে স্পর্শ করেছিল, আমাকে জাগিয়ে দিয়েছিল, সে হলো আমার কবিমন। সে আমাকে ব্যালকনি পেরিয়ে ছাদে দাঁড় করিয়েছিল। উন্মুক্ত উদার ছাদে। সে আমাকে কবিতার জীবন চিনিয়েছিল। তার কাছে আমি ধীরে ধীরে ঋণী হয়ে পড়েছিলাম। আমার অতীত জীবনটাকে শৃঙ্খল বলে মনে হচ্ছিল। আমি ভেবেছিলাম তিন চার বছরের অদেখায় , সম্পর্কের শিকড় বোধহয় শুকিয়ে যায়। তুমি বিশ্বাস করো কবিমন, উনি অসুস্থ থাকার সময় নয় , বাড়িতে ফিরে আসার পরেই শিক্ষক প্রাণতোষের গভীর জীবনবোধ আমাকে মুগ্ধ করেছে । আমি অনুভব করেছি , এই মানুষটাকে জানা বোঝার কিছুটা বাকি আছে আজও। এই মানুষটা আমাকে ছেড়ে দিলেও , মুক্ত করে দিলেও , ভিতরে ভিতরে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। আমি যদি এই মুহূর্তে তাকে ছেড়ে চলে আসি , যৌথ সংসার জীবনে ফিরে আসার একটা সুযোগ না দিই , তাহলে তো তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে কবিমন। তোয়া আরেকটু বড় হলেই , তার প্রশ্নের মুখোমুখি আমি হব কী করে ? সন্তানের কাছে সব মা-ই আদর্শ হয়ে থাকতে চায়। স্বার্থপরতা বললেও এটাই চরম সত্য । সেখানে আমাকে তোয়ার কাছে একজন আদর্শ মা-ই হতে হবে প্রথমে।
কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলবো। প্রাণতোষের উদারতা নিশ্চয়ই আমার কবিতার জীবন কেড়ে নেবে না। সে যা বোঝেনা , তাকে সে নিশ্চয়ই আক্রমণ করে ছিন্ন ভিন্ন করে দেবে না। একটা অসুস্থতা যদি কোন মানুষকে নতুন দিগন্ত দেখিয়ে দেয় , সে যদি বন্ধ জানলা খুলে বাইরেটা দেখতে শেখে , তাহলে আমি তাকে জানলাটা খুলে দিতে সহযোগিতা করবো না ? কবিমন, আমার স্বামী প্রাণতোষের হাতগুলো থরথর করে কাঁপে। সে ভালো করে দাঁড়াতে পারে না, জানলা খোলা দূরের কথা। অথচ তার এক বুক ইচ্ছে আকাশ দেখার ! সেই দিগন্তে প্রিয়জনদের হাতে হাত রেখে দাঁড়াবার ইচ্ছে তাঁর রয়েছে। অসুখ তাঁর সবকিছুকে কেড়ে নিতে পারেনি। এই অসুখ ও আরোগ্য যদি তাঁকে জীবনের অঙ্গনে আবার ফিরিয়ে দিতে পারে , স্ত্রী হিসেবে সেটা দেখাই তো আমার কর্তব্য ,তাই না কবিমন ? কিছু বলবে না ? বিষণ্ণতার অতল থেকে যেন অমলেন্দুর উচ্চারণ ভেসে এলো–বেশ তো ছিলাম, বনজঙ্গল , জনপদ আঁকড়ে থাকা একজন মাঝারি মাপের সাংবাদিক হয়ে। মাঝে মাঝে নাটকের মঞ্চ , মাঝে মাঝে কবিতার উচ্চারণ, একার সংসারে দুমুঠো রোজগারের পর রাতের নিরালা নিঝুম অন্ধকার– বেশ তো ছিলাম আমি। প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকা গানের পাগল বিন্দাস,অনেক দূরের প্রিয় বন্ধু মেঘলা আমার খোঁজ খবর রাখতো , বিশেষ করে বিন্দাস আর আমি ছিলাম একে অন্য্যের মন খারাপের পরিপূরক। এই এক বছরে কত কী বদলে গেল — ‌তাই না ? তুমি এলে এক আকাশ কবিতাজন্মের প্রতিশ্রুতি নিয়ে।প্রলয় , শুভ , তারপর আরও কয়েকজন। সবাই মিলে একটা কিছু গড়ার নেশায় বুঁদ হয়ে গেলাম ক্রমশ । বিন্দাসের অভিমান আমি বুঝতে পারি। আমার জীবনে তোমার আগমনে, ও তোমার ছায়াটাকেই মর্যাদা দিলো । তাই ধীরে ধীরে নিজের শিকড় খুঁজতে , সুখের একতারা আর দুঃখের দোতারা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো । আমার ঘরদুয়ার সাজাতে গিয়ে দেখছি ,আমার কবিতার নারীর ছায়াটা চৌকাঠ পর্যন্ত এসে থেমে গেছে । বহু বছর ধরে আমার নিজের ঘরে একটা শূন্যতা তৈরি হয়ে রয়েছে । সেই ঘরের বাইরে অন‌্য ঘরে ,করিডোরে, রান্নাঘরে , বাদল মেঘ আর তিথির ঘরকন্নার কত রুনঠুন শব্দ। স্বীকার করছি আমার ভালোই লাগছে। কিন্তু ওরাও তো চিরস্থায়ী নয়। সংসার বাড়লে ওরাও চলে যাবে। যদি আমার মাঝবয়সী সামর্থ আর প্রাণশক্তি দিয়ে এই কবিতার আশ্রয় গড়ে তুলতে না পারি ,যদি সবাই এখানে অতিথির মতোই থাকে ,আসে আবার চলে যায় , তাহলে আমার স্বার্থপর একাকীত্ব কাকে আঁকড়ে ধরবে উন্মনা ? জানি , দ্বিচারিতার জীবন তুমি কখনোই বেছে নেবেনা। স্বামী ও আমাকে একসাথে তুষ্ট করা তোমার মতো শীলিত মনের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় । তাই তোমাকে বিরক্ত করার প্রশ্নই ওঠে না ‌। এই একবছরে তোমার অসম্ভব সুন্দর লেখার হাত আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে । তোমার সেই কবি অস্তিত্বের মধ্যেই আমি থেকে যেতে চাই উন্মনা । বেশ কয়েকবার আমার এই ভয়ঙ্কর একাকীত্বের জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছি । পারিনি। ফিরে এসেছি জীবনের পথে । ফেলে আসা গত প্রায় একবছরে আমি ভয়ঙ্কর স্বার্থপরের মতো তোমার অতীতটাকে সম্পূর্ণ ভাবে অস্বীকার করেছি । ভেবেই নিয়েছি আমার অস্তিত্বের গন্ডি ছেড়ে তুমি আর কোথাও যেতে পারবে না। অথচ কী আশ্চর্য দেখো ! তোমার স্বামী প্রাণতোষবাবু তাঁর গভীর অনুভব ও সহজ সারল্য দিয়ে তোমাদের ফুলশয্যার মালার গন্ধ ফিরিয়ে দিলেন । জীবনে হেরে যেতেও যে এত সুখ , এই প্রথম অনুভব করলাম উন্মনা। আসলে আমরা কেউ হারিনি। সবাই জিতেছি । প্রত্যেকে তার মতো করে ভালো থাকুক । আমার কবিতার নারীকে যেন প্রাণতোষবাবু হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেন ।
কান্নার শব্দ নয়, ও প্রান্তের গভীর নীরবতা ক্রমশ আচ্ছন্ন করছে অমলেন্দুকে ।কেউ কোনো কথা বলছে না ।অথচ দুজনেই যেন দুজনকে স্পর্শ করে আছে ।
শেষ পর্যন্ত উন্মনাই নীরবতা ভাঙলো– কবিমন , এই এক টুকরো কবিতাজন্মের আশ্রয়কে আমি কিছুতেই ছেড়ে যাবো না । বরং আমার স্বামীকেও এই কবিতাজন্মের একজন শরিক করে নেবো । এই আমার শপথ। আমার মা যতদিন বাঁচবে , আমার মেয়ে যতদিন না ওর নিজস্ব পৃথিবীকে খুঁজে পাবে , ততদিন এই কবিতাজন্মই আমাদের আশ্রয় হয়ে থাকবে ।আমার ও আমার স্বামীর প্রৌঢ়ত্ব আসবে ধীরে ধীরে। তবুও কথা দিলাম , অথর্ব হয়ে না পড়া পর্যন্ত , তোমার সঙ্গে আমার নাড়ীর বন্ধন ,কবিতার বন্ধন, শব্দব্রহ্মের বন্ধন‌ ছিন্ন হবে না।এক টুকরো কবিতাজন্মের জন্য আমাদের এই সম্মিলিত লড়াই হয়তো ইতিহাসে জায়গা পাবে না , কিন্তু তোমার মতো এই আশ্চর্য মানুষটাকে অনেকদিন সাধারণ মানুষ মনে রাখবে । কবিমন জীবন যেদিন কবিতার মতো সুন্দর হবে , সেদিন তুমি আমি কেউ থাকবো না । তবু আমাদের উপকথা থেকেই যাবে । লোকগাথা হয়ে , গান হয়ে থেকে যাবে । মানুষ যেদিন রক্তপাতের উর্ধে উঠে জীবনময় একটা শান্ত জীবনকে আঁকড়ে ধরবে , তখন রবীন্দ্রনাথ নজরুল লালনের গানে গানে ভরে থাকবে আমাদের এই কবিতা ও কবিতার অঙ্গন । নতুন প্রজন্ম কবিতাকে আশ্রয় করে বাঁচবে । তুমি শুনবে, আজ সন্ধ্যায় আমি কি লিখেছি ? আমি আবার লিখতে শুরু করেছি কবিমন। তুমি আমাকে কবিতার তীর্থে ফিরিয়ে দিয়েছো। শুনবে আমি কী লিখেছি ? অমলেন্দু শুধু ধরা গলায় বলতে পারলো — বলো ,শুনছি ।
তার কবিতার নারী উন্মনা শঙ্খধ্বনির মতো উচ্চারণ করলো —

জীবনের সাথে ভালোবাসাবাসি যার
দুকূল ছাপানো কবিতা গানের ভাষা
শিশুর দুচোখে রেখে যায় ভরা স্বপ্ন
শিউলি শিমুলে ফুটে ওঠা ভালোবাসা

এভাবেই চলে উপকথা ভেসে ভেসে
সাগরের জল এখনো নদীতে মেশে
এখনও নদীতে ভাটিয়ালি গায় মাঝি
ছলাৎ জলকে চুপি চুপি ডাকে পাড়
এ কূল ভাঙলে ও কূলের হাত ধরে
জীবনের সাথে ভালোবাসাবাসি যার

স্রোতস্বিনীতে ছিন্ন পাতার ডিঙি
কোথাকার জল কোথায় মিশেছে এসে
গভীর গোপন নীল তরঙ্গ জানে
সাগর কেন যে এখনও নদীতে মেশে

এভাবেই চলে নদী, গানে- কবিতায়
ভালোবাসা আজও মগ্নতা খুঁজে পায়

(ক্রমশ)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।