অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ২৯)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

কথায় কথায় দুটি প্রাণ একাকার
কথারা নদীর স্রোতে হলো পারাপার
আবার হবে তো দেখা ,একান্ত নির্জনে ?
ঋতুরাজ বসন্তের শান্ত বিসর্জনে…

না না ,উন্মনা নয় , নারীজন্ম উন্মনার অকুণ্ঠ উচ্ছ্বাস যেন শীলিত নিবেদনে বললো — কবিমন , তোমার অমন কাব্যোচ্চারণের পরে কী বলবো আমি ? কী শোনাবো ? কবিতার শব্দকে তো তুমি লালনের গানের মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাও গো। অনুভবের তেমন স্তরে আমরা কিভাবে পৌঁছোবো ? বরং তোমার কবিতার উচ্চারণে মুগ্ধ শ্রোতা হয়েই ,বাধ্য ছাত্রী হয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দেবো । বলেই কিছুটা দ্বিধায় গেয়ে উঠলো — তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে
দেবে কি গো বাসা আমায় দেবে কি একটি ধারে…
এবার অমলেন্দু বিড়ম্বনা বোধ করলো । উন্মনা , তুমি সত্যিই আমাকে লজ্জায় ফেলছো । জীবনের নানা ঘাটে আমার হাফগেরস্ত যাপন। কখনও নাট্যকর্মী , কখনও রুটি রুজির জন্য সাংবাদিক, কখনও কবিতার মায়াহরিণীর পেছনে ছোটা একজন ব্যর্থ মানুষ। প্রথম জীবনে আমাদের নাট্য পরিচালক বলতেন , জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রে সফলতার জন্য চাই প্রফেশনাল স্মার্টনেশ । সব দরজায় ধাক্কা মারলে, হয়তো কোনো দরজাই খুলবে না। কিন্তু ,নিজের পছন্দ মতো একটি দরজায় বারবার করাঘাত করলে , একদিন সেই দরজা খুলবেই। একাগ্র হয়ে , ধৈর্য ধরে লেগে পড়ে থাকাটার নামই সফলতা।মহাকাব্যের পাতায় যে জেদ আমরা দেখেছি অর্জুনের মধ্যে‌ , রত্নাকরের মধ্যে। তাই অর্জুন সব্যসাচী হয়েছে , রত্নাকর হয়েছে বাল্মীকি। উন্মনা, আমার ভয় হয় , তোমার শিক্ষক বা বন্ধু নির্বাচন সঠিক হল তো ? আমি কখনও সার্থক শব্দশিল্পী হয়ে উঠতে পারবো না বোধহয়। কারণ ,মানুষের বেদনার কথা বলতে গিয়ে আমার চোখে জল আসে।আমি ইনভল্ভড হয়ে যাই , নির্লিপ্ত থাকতে পারি না। তুমি তোমার স্মার্টফোনে ডাউনলোড করে চার্লি চ্যাপলিনের অভিনয় দেখবে। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে একজন শিল্পী কিভাবে অসাধারণ ও লার্জার দ্যান লাইফ হয়ে ওঠেন ,বুঝতে পারবে।
শুনতে শুনতে উন্মনার দুচোখের পাতায় বিকেল ক্রমশ গভীর ও ঘন হয়ে উঠছিল । দুজনের হাত কখন দুজনের স্পর্শের কাছে পৌঁছে গেছে, ওরা বুঝতে পারেনি। উন্মনা টের পেল , অমলেন্দু প্রাণপণে নিজের আবেগ সংযত করছে। অমলেন্দু বুঝতে পারলো , উন্মনার ওষ্ঠ ও ওষ্ঠান্তরে কবিতার কুঁড়ি ফুটে উঠছে। সাধারণ উচ্চারণ কখন যেন অঞ্জলির ফুল হয়ে ঝরে পড়ছে। এই বিকেল ,এই নদী , এই ম্লান গোধূলি , ঋতুরাজ বসন্তের শান্ত অন্তর শুনছে উন্মনার কবিতা–

তুমিই আমার সেই অবাক পাগল
ছেলেবেলা
ঘাসের গন্ধে ভেসে , সন্ধে পেরিয়ে
ঘরে ফেরা
অভাবের দুমুঠোতে , ফাগুন রাতের চোখে ঘুম
মনের গভীরে মন , তোমার আকাশ দিয়ে ঘেরা

তুমিই আবার ছিলে শিউলিবনের
মেয়েবেলায়
দূরের দুপুর জুড়ে শিমুল, পলাশে
একাকার
লাজুক মনের কাছে , রোগা ছেলেটার চিঠি হয়ে,
অভিমানে ঝরে যাওয়া আকুল
সুগন্ধ মেখে তার….

তুমিই আবার এক আশ্চর্য নিভৃত
ঘোর লাগা
প্রথম মাথা তোলার বেপরোয়া
পিচগলা পথে,
কবি সুকান্তের কবিতাতে,
জীবনের ডাকে–
কে যেন ভাসিয়ে নিলো ছকভাঙা মিছিলের
অনিবার্য রথে !

সেই থেকে মন চলে দোতারার
ছন্দে, পায়ে পায়ে,
তোমার কবিতা যেন আরশিনগর
হয়ে এ বুক কাঁপায় !

ডুলুং নদী বয়ে যেতে লাগলো, একই সঙ্গে সময়ও ধীরে ধীরে বয়ে গেলো । সময়, তুমি কি থেমে যেতে পারো না , এই স্বপ্ন- বিকেলে ? উন্মনার কন্ঠে এমন গভীরতার কবিতা শোনার পর দুজনেই যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছিল প্রকৃতির আঁচলে আঁচলে। কেউ স্বাভাবিক অনুভূতি সংযত করতে পারলো না,করার চেষ্টাও করলো না,দুজনে দুজনের হাত শক্ত করে চেপে ধরলো। ম্লান বিকেল ধীরে ধীরে আবছা কনে দেখা আলো হয়ে ,নম্র ফাগুন সন্ধ্যার কাছাকাছি পৌঁছে গেলো।এই পৃথিবীর ঘনীভূত বাস্তবতা যেন , ওদের পিঠে হাত ছুঁইয়ে বললো– এবার তোমাদের বাড়ি ফিরতে হবে যে…
ডুলুং নদীর পাড়ে রূপসী বাংলার শান্ত নির্জনতা যেন ওদের স্থিরচিত্র তুলে রাখলো প্রকৃতির সাদা কালো অ্যালবামে।
‌‌ নদীর পাড় থেকে উঠে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে,
উন্মনার মায়ের বাড়ির কথা , দু’বিনুনি ঝোলানো স্কুলপথে মেয়েবেলার কথা শুনতে চাইলো অমলেন্দু । অমলেন্দু মনে মনে স্পস্ট দেখলো– এক্কা দোক্কা, রুমাল চোর খেলা শেষে উন্মনার ছোট্ট দুটো ধুলোমাখা পায়ের ছবি । ছেলেমানুষের মতো বললো– তোমার প্রথম সাইকেলে চড়ার উচ্ছ্বাস দেখতে খুব ইচ্ছে করে ,উন্মনা। বলো ,সব বলো আমায় ….
শুনে দুচোখ জলে ভেসে গেলো উন্মনার। ছায়াঘেরা জঙ্গলে আবছা আলো আঁধারি পথে হাঁটতে হাঁটতে অমলেন্দুর হাত জড়িয়ে আরও ঘনিষ্ঠ হলো সে। অমলেন্দুর পুরুষ স্পর্শে কেঁপে কেঁপে উঠলো। দুটি কমবয়সী ছেলে মেয়েকে পাশ দিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে হেঁটে যেতে দেখে উন্মনা বললো — আমাদের কি অনেকটা বয়স বেড়ে গেছে ,কবিমন ? আজ থেকে কুড়ি বছর আগে আমাদের দেখা হলে কি সবকিছু অন্যরকম হতে পারতো ? অমলেন্দু ম্লান হেসে জবাব দিলো– হয়তো হতো , হয়তো হতো না। পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক পরিস্থিতি,স্থান কাল পাত্র ভেদে বদলেও যেতে পারতো। হয়তো দুজনের এত আবেগ থেকে এমন অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বই গড়ে উঠতো না। তার চেয়ে এটাই বোধহয় ভালো হল। আমার ‌মনে হয়, জীবন ও সময়‌ আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক,উন্মনা।
সন্ধের মুখে জঙ্গলের পথ পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়লো ওরা। গভীর বেদনার মধ্যে দিয়ে দুজনের দুটো পথ আলাদা হয়ে যাবে একটু পরেই। ঝাড়গ্রাম যাওয়ার বাসে একটা সিটে পাশাপাশি বসলো দুজনে। নির্লিপ্ত গাম্ভীর্যে দুজন দুদিকে তাকিয়ে , ক্রমশ যেন বাস্তবে ফিরে আসছিল। ঝাড়গ্রাম আসতেই অমলেন্দু ওকে নির্দিষ্ট বাসে তুলে দিলো। নিজে দাঁড়িয়ে থাকলো বাসস্ট্যান্ডে । আজ রাতে এক বন্ধুর বাড়িতে এখানেই থেকে যাবে সে । আগামীকাল সারাদিন ঝাড়গ্রামে তার অনেক কাজ আছে ।
উন্মনাকে নিয়ে বাস ছেড়ে দেবার পর , বাসের জানলা দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সে , একসময় তার প্রিয় কবিমন অমলেন্দুর মুখটা আবছা হয়ে গেল ।বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে, উন্মনার চোখের সামনে ভেসে উঠলো,বাড়িতে তার জন্য মন খারাপ করা মেয়ের মুখ , আর চাপা টেনশনের ছায়া পড়া মায়ের অস্থিরতা । পরমুহূর্তেই অন্যমনস্ক হয়ে উন্মনা স্বামী প্রাণতোষের কথা ভাবলো। একবার কি প্রাণতোষকে ফোন করে সব কথা জানাবে সে ? এইরকম নিরুত্তাপ ও ভেঙে যাওয়া একটা সম্পর্ক তো শেষ করে দেওয়াই ভালো, ডিভোর্সের কাগজে সই করে। হঠাৎ ব্যাগের মধ্যে ফোনটা বাজার শব্দ শুনতে পেয়ে ,চেন খুলে দেখলো মায়ের নামটা ভেসে উঠছে । ইচ্ছে করেই ধরলো না উন্মনা। মনে হচ্ছে , বাড়ি পৌঁছতে রাত ন’টা- সাড়ে ন’টা বাজবে। একবার মনে মনে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলো — উন্মনা , তুমি যা করছো, ভেবে চিন্তে করছো তো ? চটকা ভাঙালো কনডাক্টারের ডাকে– দিদি, আপনার টিকিট কি এখন কাটবেন ?
একটু ঘুমিয়ে নিন বরং আপনি, সময় মতো ডেকে দেবো।
উন্মনা কিছুটা অবাক হলো।
কন্ডাক্টার তাকে চিনলো কি করে ?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।