অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৩)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

বন্ধু , তোকে উঠোন জুড়ে ডাকি
ফোনের দিকে পাগল চেয়ে থাকি
অরুন্ধতী উঠেছে তোর ছাতে ?
কেমন আছিস নগর কলকাতাতে ?

রাতে বাড়ির উঠোনে হালকা হিমের মধ্যে বসে , বেগুন ভাজা ,আর আলু কুমড়োর মলম দিয়ে , চামড়া হয়ে যাওয়া তিনটে রুটি গলাদ্ধকরণ করতে করতে , অমলেন্দু মেঘলার সুন্দর মুখটা শূন্যে এঁটো আঙুল চালিয়ে বারবার আঁকার চেষ্টা করলো , পারলো না । আবার চেষ্টা করলো, কিছুতেই পারলো না। নাকের পাটার কাছটায় এসে , সব গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে । বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় ওদের পাঁচজনের একটা দারুণ গ্রুপ ছিলো। এই মেঘলা তার একটা সুন্দর নাম দিয়েছিলো। মেঘলা , অমলেন্দু , বিতস্তা , নান্দনিক আর দিগন্ত । ওদের মুখে মুখে খইফোটা বন্ধু গ্রুপটাকে সবাই হিংসে করতো । নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে একটা অদ্ভুত নাম ….হোক না অর্থহীন , তবুও একটা অন‍্যরকম নাম — অমেদিবিনা। দলের মধ‍্যে সব থেকে বিচ্ছু আর বেপরোয়া ছিল এই মেঘলা। ক্লাসে কোনো দুষ্টুমি না করলেও , বাইরেই দুনিয়ার আকাশে বাতাসে ওর মধ‍্যে ছিল একটা দুর্নিবার ও উড়ুক্কু মন।ওদের দলটায় ওর স্বাভাবিক নেতৃত্ব নিয়ে কারোর মনে তাই কোনো প্রশ্ন ছিলনা। মনে আর মুখে সবসময় এক ছিল ,যা বলবার চোখে চোখ রেখে সামনাসামনি বলে দিতে পারতো। অমলেন্দুরা মাঝে মধ্যে সংকোচ করতো , কিন্তু ও চেনা অচেনা কোনো কিছুর পরোয়া করতো না । লেখাপড়াতে দারুণ ভালো ছিল , এমন নয় ; বাংলাসাহিত্য নিয়ে মাস্টার্স করার পর , কলকাতার একটা পরিচিত দৈনিকে ট্রেনি- সাংবাদিক হিসেবে ঢুকে পড়লো।এখন সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে , নিজের ইচ্ছেমত কলকাতায় বা জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়ায়। নাঃ , কিছুতেই মুখটা আঁকতে পারছে না অমলেন্দু। আঃ ! অমলিন তোর দুটো ভাসা ভাসা চোখ….. যেন শুধু বলে কাছে আসতে ….
আঃ , কী দারুণ দেখতে !
আরে , এটা তো কিশোর কুমারের গান। নাঃ , শুয়ে পড়ি । রোববার তো দেখা হবেই । উঠোনের খাটিয়া থেকে উঠতে যাবে , এমন সময় ফোন। মেঘলা ? এত রাতে ? তোর স্বামী কিছু বলে না ? উত্তরটা যেন রেডি ছিলো। আমি কী এমন করেছি বলতো , যে আমার নামে আমার স্বামী হুলিয়া জারি করবে ? শোন , তোর সঙ্গে আমার একটা সিরিয়াস কথা আছে।রোববার একটু তাড়াতাড়ি চলে আসবি । আমি শনিবার যাচ্ছি। তুই যদি থাকার জায়গা যোগাড় করতে না পারিস , তাহলে আমার বন্ধু আনন্দীর বাড়িতেই তোর জন্যে একটা বিছানা আর বালিশ ঠিক জোগাড় হয়ে যাবে।কোনোরকম অজুহাত দেখাবি না। রোববার বিন্দাসকেও নিয়ে আসবি । আমি আর তুই সুযোগ বুঝে , পুটুর পুটুর গল্পও করবো। তোর আর কি ? হ’লে নেই হাসতে, ম’লে নেই কাঁদতে, হারালে নেই খুঁজতে…
টাচ উড , তোর সঙ্গে আমার সিরিয়াস কথা আছে কিন্তু । আড়াল নিশ্চয়ই একটু পাবো। অনুষ্ঠান শেষে আনন্দীর বাড়ির ছাদে গিয়ে কিছু কথা বলবো তোকে। তুই কিন্তু অবশ্যই আসবি। তরুণ কবিরা তোর জন্য পথ চেয়ে বসে থাকবে ।আমার বন্ধুকে নিয়ে অনেক গল্প করেছি ওদের সঙ্গে । কিরে আসবি তো ? আসলে তোর গায়ে হেমন্তের ঝরা পাতার গন্ধ পাওয়া যায়। আমি ক্ষ‍্যাপা বিন্দাসের গানে বিন্দাস হবো ? না , তোর কবিতাপাঠে পাগল হবো ? জানিনা , জানিনা , আমি কিচ্ছু জানিনা । রাখছি , কেমন ? শুভরাত্রি।
কোথাও যেন হেমন্ত রাতের অনুভবে অনুভবে বেজে যাচ্ছিলো—
বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে , মোর বন্ধুর মায়া তেমন রে..
বন্ধু কাজল ভ্রমরারে..
কোন দিন আসিবেন বন্ধু,
কইয়া যাও,কইয়া যাও রে….

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।