অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪৯)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

ক্রমশ নীরবতার আঁচল বিছোয়-
আদিগন্ত বৈশাখ মাস,
যেন কোনো কবিজন্ম ডেকেছে নিভৃতে
নিশিকুটুম্বিতা দিলো ঘাস…

মেঘলার কলটা রিসিভ করে অমলেন্দু চলে গেল উন্মনার ঘরে । সারাদিনের মাইক্রোফোন স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পরে , কোথাও যেন গীতবিতানের পাতা থেকে কথাগুলো সুরে সুরে বাজছে– কোলাহল তো বারণ হল , এবার কথা কানে কানে ,
এখন হবে প্রাণের আলাপ কেবলমাত্র গানে গানে ।
অমলেন্দু ‘হ্যালো’ বলতেই কোন সুদূর সাগরপার থেকে ভেসে এলো মেঘলার ‌উদ্বেগভরা কন্ঠস্বর — শুনলাম অসুস্থ হয়ে পড়েছিস ? আমাকে কি একটু শন্তিতে থাকতে দিবি না ? চুটিয়ে কাজ করছি , গুছিয়ে সংসার করছি — সেটা পছন্দ হচ্ছে না ? ভেবেছিলাম রাতের দিকে ফোন করে আজকের সম্মেলনের সবটুকু শুনবো। ইদানিং তো সাতদিন অন্তর একবার উন্মনাকে ফোন করে তোর খবর নিতে হয়। আমি লন্ডনে চলে যেতেই আমাকে বেমালুম ভুলে গেছিস ! তুই কি চাস বলতো ? আমি উন্মনাকে ভালোবাসবো, না হিংসে করবো ? কোনটা ? তোর কথা যদি অন্যের মুখে শুনতে হয় ,তাহলে তো—
এতক্ষণে অমলেন্দুর হতভম্ব অবস্থাটা কাটলো । ধীরে ধীরে বললো–এখনও কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে । সত্যিই আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম রে । একজন ডাক্তার ছিলেন , ওষুধ পড়েছে।এখন ভালো আছি । কাল সকালে একবার চেক আপ করিয়ে বাড়ি ফিরবো । সঙ্গে বিন্দাস আর প্রলয় থাকবে। বাড়ি ফিরে কাজের জগতে ঢুকে ফিট হয়ে যাবো। তুই চিন্তা করিসনা প্লিজ। ওপ্রান্তে মেঘলার ম্লান হাসির শব্দ — চিন্তা করেই বা কী করবো ? আর , তোর ভাবনা ভাবার মানুষ তো এসেই গেছে । শোন , এই প্রথম মুখোমুখি অনেকক্ষণ কথা বলবার সুযোগ পেয়েছিস উন্মনার সঙ্গে । দুজনেই এবার একটা সিদ্ধান্তে আয়। তুই কবিতার সংসার চেয়েছিলি। দেখ ,ঈশ্বর তোকে কবিতার ঘরণী এনে দিয়েছে । কারোকে দুঃখ না দিয়ে তোরা ভালো থাক সেটাই চইবো। কিছু বলবি না ? অমলেন্দুর উত্তর — তোর কথা নিশ্চয়ই মনে রাখবো রে বন্ধু। দারুণ বেগে চলতে চলতে হঠাৎ থমকে গেলাম তো । এবার জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে। এইসময় তুইও চলে গেলি । আমি খুব অসহায় বোধ করছি। ও প্রান্তে মেঘলা কলকল করে উঠলো । তোকে একটা সুখবর দিই । বছর দু- তিনের মধ্যে আবার আমি দেশে ফিরে যাবো। ইতিমধ্যে তোদের কবিতার আশ্রয়ের জন্য বেশ কিছু টাকা জমিয়ে ফেলেছি‌। অমলেন্দুর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো — বাঃ। দারুণ খবর ! সত্যিই ?
হ্য্যাঁরে পাগলা , দুশো ভাগ সত্যি।শালা , তুমি একা স্যাক্রফাইস করে নাম কিনবে , তাই না?
টাকা নয় ,আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্যাক্রিফাইস কি জানিস পাগল ?
কি রে ?
তোর মতো একজন পরিপূর্ণ মানুষকে, একটা সুন্দর কবিতাকে উন্মনার মতো কবিতার নারীর হাতে তুলে দিলাম । এটা কম স্যাক্রিফাইস ?
অমলেন্দু এবার প্রাণখোলা হাসি হেসে উঠলো । সাগরপারে , ও প্রান্তে মেঘলাও হাসছে — দেখলি তো , তোকে কেমন সুস্থ করে দিলাম।শোন বুদ্ধু , সমালোচনাকে ফেস করতে শেখ। সবাই তোর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হবে , তোকে জপের মালা করে নাম জপ করবে — এটা অসম্ভব। তোর অসুস্থতার আসল কারণ কিন্তু —
আমি জানি , নিশ্চয়ই মনে রাখবো তোর কথা ।
থ্যাঙ্কস। আরেকটা কথা । উন্মনা যদি আমার বোন হত , তাহলে ওকে আমি প্রাণে ধরে বিয়ে দিতে পারতাম না । সারাজীবন নিজের কাছে রেখে দিতাম। মিষ্টি সুগন্ধি নারীকে তুই ভালোবাসতে পেরেছিস , এটাই তোর জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা জানবি। ওকে দুঃখ দিলে , মনে রাখিস, হাজার হাজার মাইল দূরে সেই দুঃখ আমার বুকেও বাজবে। আর কানে কানে একটা কথা বলছি শোন — তোর সামনে যে গ্রীষ্মের রাতটা পড়ে আছে , একটু সাবধানে থাকিস । তোর উপর আমার বিশ্বাস আছে । অমলেন্দু নিঃশব্দে হাসলো।
থ্যাঙ্কস বন্ধু । আমার ওপর বিশ্বাস হারাস না। মেঘলা খুশি হয়ে বললো — উন্মনা আমার যত প্রিয়ই হোক না , তোর গলাটা শুনতে ইচ্ছে করে । মাঝে মাঝে ফোন করিস। এখন তো হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে কোনো পয়সা লাগেনা। আজ তো তুই টায়ার্ড,নাহলে তোর গলায় একটা কবিতা শুনতে চাইতাম ।
কোন কবিতা?
অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ । উৎসর্গের মরণ মিলন ।
—আমি যাব যেথা তব তরী রয়
ওগো মরণ হে মোর মরণ
যেথা অকুল হ ইতে বায়ু বয় করিয়া আঁধারের অনুসরণ ,
যদি দেখি ঘনঘোর মেঘোদয় দূর ঈশানের কোণে আকাশে ,
যদি বিদ্যুৎ ফণী জ্বালাময় তার উদ্যত ফণা বিকাশে ,
আমি ফিরিবো না করি মিছা ভয় ,আমি করিব নীরবে তরন , সেই মহা বরষার রাঙাজল ,ওগো মরণ , হে মোর মরণ।
কবিতা বলতে বলতে মেঘলার গলা থরথর করে কাঁপছিলো।
— তোকে ভালো থাকতেই হবে বন্ধু। কবিতার জন্য , আমাদের সকলের জন্য বেঁচে থাকতে হবে।
ফোনটা কেটে যেতেই অমলেন্দুর মনে হল , চারদিকটা বড্ড বেশি নিস্তব্ধ । সন্ধে লেগে গেছে‌ । সবাই নিশ্চয়ই চলে গেছে । চায়ের কাপ হাতে মা মৃত্তিকা ঘরের ভিতরে ঢুকলো । উন্মনার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। অমলেন্দুর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিলো , এতক্ষণ পর্যন্ত তার কবিতার নারী উন্মনা তাকেই ঘিরে ছিল , ঘরে নয় , ঘরের বাইরে থেকে । মৃত্তিকা উন্মনাকে ডাকতেই একসাথে তোয়াও ঢুকে পড়লো ঘরে । উন্মনার হাতে চায়ের কাপ ।
— কথা হলো মেঘলাদির সঙ্গে ? ওনার বিশ্বাস হল তো , আমরা আপনকে সামলে রেখেছি । সকাল থেকে চার পাঁচ বার খবর নিয়েছে ফোন করে। মৃত্তিকা ঘর ছেড়ে চলে যেতে যেতে উন্মনাকে বললো — অমলেন্দুকে নিয়ে একটু বাইরে ঘুরে আয়‌। ঘরের মধ্যে তো ওর দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেশ গরম পড়ে গেছে। অমলেন্দুর একটু অস্বস্থি লাগছিল । রাতে অন্য কোথাও থেকে যাওয়াটা ও এখনও মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। বাইরে বেরোলে লোকের কৌতুহল বাড়তে পারে এই ভেবেই বললো — থাক না,ঘরেই তো বেশ আছি। আপনাদের সঙ্গে গল্প করছি । তোয়া খিলখিল করে হেসে উঠলো — চলো না বন্ধু ,আমিও যাবো। অপাপবিদ্ধ সদ্য কিশোরীর ঘোষণায় এই মুহূর্তের সন্ধ্যা যেন হৈ হৈ করে বলে উঠলো — বৈশাখের আদিগন্ত রাতের আকাশ দেখবে না কবিমন ? দূর থেকে শালজঙ্গল দেখবে না ? দেখবে না রাতের আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া আবছা কোনো টিলার অবয়ব। চলো বেরিয়ে পড়ি ।

তোয়ার নরম হাতটা মুঠোয় ধরেছে অমলেন্দু । একটু আগে যেন পথ চিনিয়ে নিয়ে চলেছে উন্মনা। বাস রাস্তায় যাবার উল্টোদিকে যে রাস্তাটা , কিছুটা গিয়েই লোকালয় ছাড়িয়ে বাঁদিকে ঘুরেছে আবছা জঙ্গলের প্রান্তসীমায় মিলিয়ে যাবে বলে । মাঠে মাঠে ফুল ঝরিয়ে নিঃস্ব পলাশ গাছগুলো যেন আগামী ফাল্গুনের দিকে তাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে । ভর সন্ধেবেলায় এখনও মাটি থেকে একটু তাপ উঠছে । উন্মনা চুপ, অমলেন্দুও চুপ। শুধু তোয়ার গলা গুনগুন করছে রবিঠাকুরের গানে — ও জোনাকি , কী সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছো …
আপাত গম্ভীর অমলেন্দুর ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেল । মেয়েটা এই গানের মর্ম এখনও জানে না । তবুও ওর গলায় খুব সত্যি মনে হচ্ছে এই মুহূর্তের গানটা । আবছা জঙ্গলের কাছাকাছি তিন চারটে পলাশ গাছের কোলে , একটা চ্যাটালো পাথরের ওপর বসলো ওরা তিনজন। তোয়া হঠাৎ চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো — মা দেখো ,বন্ধু দেখো ,আকাশ ভরা কত তারা ! তোয়ার এক পাশে অমলেন্দু ,অন্য পাশে উন্মনা । অভিজ্ঞ অমলেন্দু চারপাশটা দেখে নিয়ে দু’একবার খুব গভীর শ্বাস টানলো । উন্মনা নিবিড় ভাবে বললো — তুমি জঙ্গলকে খুব সুন্দর করে চেনো ,তাই না ? অমলেন্দু মৃদু হেসে বললো — প্রকৃতি তার বিস্ময় এত সহজে মানুষের কাছে উপুড় করে দেয় না । তার জন্য বিভূতিভূষণ‌, জীবনানন্দ বা জিম করবেট হতে হয়। আমার সে যোগ্যতা নেই । এই সময় সাপের ভয় , তাই অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম। তুমি জানতে চাইলে না তো, মেঘলাদি আমার সঙ্গে কী কথা বললো ?
আমি অনুভব করতে পারি , মেঘলাদি তোমার জন্য খুব উদ্বিগ্ন। গত সপ্তাহে আমাকে বলেছে , যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এদেশে ফিরবে। তারপর আমাদের সঙ্গে কবিতার ঘর গেরস্থালি করবে ‌। ওর মতো দূর্দান্ত স্মার্ট একজনকে পেলে, পুরো নেতৃত্ব তার হাতে দিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবো । আচ্ছা কবিমন , তুমি ভেবে দেখেছো , আমাদের এই কবিতা আশ্রয়ের ভবিষ্যৎ কী ? অমলেন্দু চুপ করে থাকে । এই ব্যাপক স্তব্ধতার মধ্যে মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যায় ‌। বোঝা যায় , ভবিষ্যৎ নিয়ে অমলেন্দুও সন্দিহান । জানো কবিমন , আজ গোটা দিন এই সম্মেলনের সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থেকে একটা কথা মনে হলো — গোটা ব্যাপারটা পরীক্ষা নিরীক্ষা পর্যায়েই যদি থেকে যায় , তাহলে কি হবে ? আমাদের প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবে ক্রমশ প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে যাবে।ধীরে ধীরে আমরা বুড়িয়ে যাবো। ভাষাচর্চা,কবিতাচর্চা এই শব্দ গুলো সদ্য তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারবো তো আমরা ? অমলেন্দু কিছু একটা বলতে গিয়ে দেখলো — সারাদিনের ছোটাছুটিতে অবসন্ন তোয়া , মার কোলে মুখটা গুঁজে দিয়ে , ধীরে ক্রমশ ঘুমিয়ে পড়ছে । অমলেন্দু একটু অস্থির হয়ে বললো — বাড়ি থেকে অনেকটা পথ চলে এসেছি আমরা। ঘুমিয়ে পড়লে ওকে নিয়ে ফিরতে অসুবিধে হবে। চলো উঠে পড়ি ।স্তব্ধ উন্মনার একটা হাত তার আত্মজার ঘুমন্ত পিঠে । অন্য হাত যেন ঘাটে ফেরা খেয়া নৌকোর মতো আশ্রয় নিলো অমলেন্দুর হাতের মধ্যে । এখান থেকে বাড়ি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটেই ফিরতে হবে। ঘুমিয়ে পড়া মেয়েকে জাগিয়ে তুলতে হবে , সেকথা যেন মনেই পড়লোনা উন্মনার। বহু দুরে পড়ে থাকা জীবনের একটা অধ্যায় — শ্বশুরবাড়ি , সেখানকার লোকজন ,স্বামী প্রাণতোষ , সব কিছুই তার অনুভবে ধরা দিলো। কিন্তু তার থেকেও বেশি অনুরণন ছড়িয়ে পড়লো উন্মনার চোখের পাতা থেকে হাতের আঙুলের শীর্ষবিন্দুর কম্পন পর্যন্ত । তার হাত এখন অমলেন্দুর হাতের মধ্যে । বৈশাখী রাতে , এই নিবিড় মুহূর্তটুকু যেন আপাত সত্যি থেকে চির সত্যির দিকে বয়ে যায়। যেন প্রত্যেকটা ব্যর্থ জন্ম এমনই একটা হাতের মুঠোর আশ্রয় পায়–
ভালোবাসার আশ্রয় ।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

1 Response

  1. Ivy banerjee says:

    অপূর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।