অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪৩)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

আবার কিছু নতুন রকম করতে হবে ,
ডাকতে হবে গীতবিতানের পাতার মতো ;
আবার কোনো হাতছানিতে, ভালোবাসায় ,
যেন জুড়োয় বিষণ্ণতার গভীর ক্ষত।
কবিতাজন্মে বাঁচতে হবে — মনে থাকবে ?

অতি সাধারণ একটা আশমানী রঙ শামিয়ানার নীচে মুঠো মুঠো কবিজন্ম রবিবারের সাতসকালেই এসে জড়ো হয়েছে । মাথার ওপর প্রথম বৈশাখের আটটা নটার যুবক সূর্য উত্তাপ ছড়াচ্ছে। আমের পাতা ,জামের পাতা , জামরুলের পাতা ,কাঁঠাল গাছের নরম পাতা ছুঁয়ে , তার তাপ শামিয়ানা ভেদ করে, সমবেত কবিজন্মের কাছে লুটিয়ে পড়েছে কবিতার স্নিগ্ধতা ছুঁয়ে ধন্য হবার আকাঙ্ক্ষায়। তরুণ কবি ,প্রৌঢ় কবি, মাঝবয়সী কবি এসেছেন পূর্ব মেদিনীপুর ,পশ্চিম মেদিনীপুর ,বাঁকুড়া, পুরুলিয়া,এমনকি প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খন্ড থেকেও । কবি প্রলয় পিছনের দিকে একটা চেয়ার টেবিলে লম্বা খাতা বিছিয়ে বসেছে। কিন্তু সারা বছরের অন্যান্য কবি সম্মেলনের সঙ্গে এই বৈশাখী কবি সম্মেলনের পার্থক্য এখানেই যে, নাম ঠিকানা ফোন নং দেওয়ার পর পকেটে হাত ঢুকিয়ে কেউ টাকা দিচ্ছে না । বরং একটা সাধারণ মানের ফোল্ডারের মধ্যে , লেখার প্যাড , পেন ,আর টাটকা একটি গোলাপ হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।ফোল্ডারের মধ্যে চা টিফিন ও মধ্যাহ্ণভোজের কুপন ঠিকঠাক দেওয়া আছে । পঞ্চাশ ষাটজন কবি এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আমপোড়া সরবতের স্বাদ নিচ্ছে। চোখেমুখে বিস্ময় — অনেকদিন পরে এমন একটা নিমন্ত্রণ ,যেখানে ছলে বলে কৌশলে টাকা তোলার চারুকলা নেই । আছে হাসিমুখে আন্তরিক আতিথেয়তা। কোমর বেঁধে লড়ে যাচ্ছে উন্মনা ,শুভ , বাদল ,তিথি , আর গানের বিন্দাস । চার পাঁচ জন সমবয়সী বন্ধু নিয়ে রাজকন্যা তোয়ার ব্যস্ততার সীমা নেই । তারা সবার কপালে চন্দনের ফোঁটা এঁকে দিচ্ছে। বাড়ির পিছনের টুকরো জমিতে সেই কোন সকালে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেয়েরা রান্নাবান্নার আয়োজনে মেতেছে । সকালের জলখাবারে বাহুল্য না থাকলেও– চপ মুড়ি ,শসার টুকরো , পেঁয়াজ , কাঁচালঙ্কা আর স্থানীয় মন্ডার আদর মাখানো ঠোঙা হাতে হাতে পৌঁছে দিচ্ছে তারা। সঙ্গে সঙ্গে কাগজের কাপে চা-ও এসে গেল। বেলা দশটার মধ্যে প্রায় সবাই এসে উপস্থিত। বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে অমলেন্দু বক্তব্য রাখার কাগজপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল। আর সামনের ছোট্ট টুলে রাখা চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে দেখে ,শত ব্যস্ততার মধ্যেও উন্মনা তার মা আর তোয়াকে ডেকে আনলো । আসলে অমলেন্দু এত সুন্দর একটা জমায়েত দেখে তার প্রবাসী বন্ধু মেঘলার কথা ভাবছিলো‌।উন্মনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়তে সেই তরঙ্গ মুহূর্তেই ধরা পড়লো‌।বললো — আজকের সব ছবি আর রিপোর্টিং আজ রাতেই আমি মেঘলাদির কাছে পাঠিয়ে দেবো । মৃত্তিকা বললো — আমাদের বাড়িতে আপনি প্রথম এলেন ,অথচ ব্যস্ততায় আপনার দিকে নজরই দিতে পারছি না। অমলেন্দু এবার সত্যিই লজ্জা পেয়ে গেল । মৃদু হেসে জলখাবারের দিকে হাত বাড়াতেই , কৌতুহলী তোয়ার কি জানি কী মনে হল , মিষ্টি হেসে জিজ্ঞাসা করলো — তুমি আমার বাবাকে চেনো ? উত্তরে অমলেন্দুর পকেট থেকে একমুঠো লজেন্স আর সুন্দর একটা পেন বেরিয়ে এলো। কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বললো – তুমি তো আমার ছোট্ট বন্ধু। এই পেন দিয়ে চিঠি লিখে বাবাকে ডেকে আনবে — কেমন ?

মঞ্চে তখন তিথির নরম গলায় ঘোষনা — সমবেত কবিবন্ধুরা ,আপনাদের জলখাবার খাওয়া হয়ে গিয়ে থাকলে ,আসন গ্রহণ করুন। প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও উদ্বোধনী সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু হোক আমাদের সম্মেলন । ইতিমধ্যে স্থানীয় কেবল টিভি থেকে প্রতিনিধিরা তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে । বিভিন্ন জেলার কবিদের কাছে টুকরো টাকরা ইন্টারভিউ নিচ্ছে। অমলেন্দুকেও ক্যামেরার সামনে একটা ছোট্ট বাইট দিতে হল। না ,কোনো রাজনৈতিক তোয়াজের পথে হাঁটলো না এই অন্য ধারার কবি সম্মেলন। তোয়া ও তার বন্ধুরা তাদের ছোট্ট ছোট্ট হাতে পেডেস্ট্রালের দমকা হাওয়া আড়াল করে , কী সুন্দর করে প্রদীপ জ্বাললো , দেখে অবাক হয়ে হাততালি দিয়ে উঠলো সকলে। মা মৃত্তিকা নিঃশব্দে মঞ্চে উঠে হারমোনিয়াম ও মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন। অমলেন্দু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো —উন্মনার মা মৃত্তিকা এই বয়সেও কী উদাত্ত ও ওজস্বিতায় রবীন্দ্রনাথের অমোঘ বাণী তুলে আনলেন তাঁর কন্ঠে।এমন উদ্বোধনী সঙ্গীত শেষ কবে শুনেছে মানুষ‌ ?
ক্ষত যত ক্ষতি যত মিছে হতে মিছে ,
নিমেষের কুশাঙ্কুর পড়ে রবে নীচে …

রবীন্দ্রনাথ। আঃ,
সারা পৃথিবীর রবীন্দ্রনাথ! যেন প্রতিদিনের , প্রতি মুহূর্তের আপাত আশ্রয়ের অন্দরে, নিশ্চিত আশ্রয়ের আনন্দ নিকেতন ! বোধহয় সেই কারণেই কবিতার নারী উন্মনা, মঞ্চের মাঝখানে তাঁর ছবি রেখেছে । দুপাশে বাংলা ভাষার ভরা সংসার জুড়ে, কাব্যসাহিত্যের নক্ষত্ররা। মঞ্চ আলো করে রয়েছেন নজরুল, জীবনানন্দ , বিষ্ণু দে ,কুমুদরঞ্জন , জসীমউদ্দীন, সুধীন্দ্রনাথ,বুদ্ধদেব বসু, শামসুর রাহমান,আল মাহামুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং সুকান্ত ।‌ সারা উঠোনময় ছোট্ট ছোট্ট স্ট্যান্ডে কবিতার উদ্ধৃতি।এটাও উন্মনার মেধাবী আইডিয়া। মৃত্তিকার গানের পর তোয়া তার বন্ধুদের নিয়ে শোনালো রবীন্দ্রনাথের ভারততীর্থ কবিতা। আজ ক্ষ্যাপা বিন্দাসও নববর্ষের তরুণ দ্যুতি নিয়ে , যেন গানের ভুবন হয়ে সকলের সামনে এসে দাঁড়ালো । তার গলায় আজ নজরুলের গান —
তোরা সব জয়ধ্বনি কর,
ওই নূতনের কেতন ওড়ে, কালবৈশাখী ঝড়,
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।
না ,কোনো মাইক্রোফোনের দাপাদাপি নেই ।কয়েকটি ছোট ছোট সাউন্ড বক্স থেকে যেটুকু আওয়াজ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে , তার আকর্ষণেই পথ চলতি মানুষেরা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। তিথির অনুরোধে অমলেন্দু মঞ্চের মাঝখানে আসন গ্রহণ করলেন । তারুণ্যের শঙ্খধ্বনিতে অভিষিক্ত হলেন অভিজ্ঞ অমলেন্দু। প্রারম্ভিক আয়োজনে খানিকটা সময় চলে যাচ্ছে দেখে তিনি উদ্বিগ্ন। ঠিক তখনই ,প্রায় জোর করে স্টেজে উঠে পড়লো একজন তরুণ। তিথির হাতের কর্ডলেস মাইক্রোফোনটা চেয়ে নিয়ে কিছু বলতে যেতেই ,খাতাপত্র ছড়ানো টেবিল থেকে তাড়াতাড়ি উঠে এলো প্রলয়।পিছন থেকে বেশ চেঁচিয়ে বলে উঠলো — শোনো অর্ধেন্দু , তোমাকে আমি ফোনে গতকালও রিকোয়েস্ট করেছিলাম , সম্মেলনের শুরুতে কিছু না বলতে । তুমি কথা দিয়েছিলে , যা বলার শেষে বলবে । ধৈর্য হারা অর্ধেন্দু তাতে বিন্দুমাত্র থমকে না গিয়ে , চিৎকার করে বলতে লাগলো — আমি এই সংগঠনের কর্ণধার অমলেন্দুবাবুকে সরাসরি কিছু প্রশ্ন করতে চাই । প্রলয়দার কাছে ফোন করে আমি সে পারমিশনও নিয়েছিলাম ‌। প্রলয়দা প্রাথমিকভাবে রাজিও হয়েছিল । আমি স্টেজে যখন উঠেছি , তখন কিছু বলতেই হবে। আমি আপনাদের শত্রু নই। আমি আপনাদের মতো একজন কবিতাকে ভালোবাসা মানুষ। সাহিত্য আমার কাছে অবসর কাটানো বিনোদন নয়‌। আমি পাঁচ মিনিটের বেশি সময় নেবোনা । আমাকে বলতেই হবে । স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা গোলমাল শুরু হতেই , অমলেন্দুকে হাল ধরতে হল ।তিনি অর্ধেন্দুকে হাসিমুখে কাছে টেনে নিয়ে , বলবার অনুমতি দিলেন।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।