অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪২)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

এশো বৈশাখী আলো ,হাওয়া, রোদ্দুর ,
এসো নতুনের ভালোবাসা, মাটি,ঘাস ;
এ আকাশ থেকে ও আকাশে প্রতিদিন ,
এসো বাংলার ছয় ঋতু , বারো মাস ।

পয়লা বৈশাখের তেতে ওঠা রোদ্দুর , বেচারী তোয়ার শাড়ি পরা পাকা বুড়ির মতো চেহারাটাকে কেমন যেন ম্লান করে দিয়েছে । তবু সে ইস্কুলের নাচে গানে কবিতায় এখনও ডুবে আছে । ডান হাতে এখনও জিলিপির রসের আঠা, ঠোঁটের একদিকে সিঙাড়ার গুঁড়ো। উন্মনা ব্যাগ থেকে রুমাল বার করে যত্নে মুছিয়ে দিলো । তারপরেই সাইলেন্ট মোডে রাখা মোবাইল দেখে চমকে উঠে বললো–তোয়া , তোর দিদু আমাকে তিন তিনবার ফোন করেছে রে । মাকে কল ব্যাক করতেই মার ফোনটাও বেজে গেলো। কোনো কথা না বলে , তোয়াকে রিক্সায় বসিয়ে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠলো যেন উন্মনা । দূর থেকে দেখলো , বাড়ির গেটের সামনে একটা সাদা অ্যাম্বাস্যাডার দাঁড়িয়ে আছে।গেটে রিক্সা থেকে নামতেই , নতুন বছরের প্রথম দিনটা গোটা উঠোন জুড়ে হৈ হৈ করে বললো– এসো এসো এসো। না না বৈশাখ নয় , চারজন মূর্তিমান যৌবন জলতরঙ্গ একসঙ্গে হেসে উঠে বললো — শুভ নববর্ষ ।প্রলয় ,শুভ ,বাদল মেঘ, আর তিথি প্রত্যেকেই আজ পাঞ্জাবি আর জিনসে সেজেছে। যেন নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে , উঠোনে চারটে ফুল ভরা গাছ দাঁড়িয়ে আছে ! নতুন বছরের প্রথম দিনেই গরমে কাহিল উন্মনা টের পেলো — শুধু পোশাক নয় , বছরের বিশেষ বিশেষ দিনের প্রভাব পড়ে মানুষের ব্যক্তিত্বে।দোষে গুণে মেশানো মানুষ বছরের প্রথম দিনটায় প্রাণপণে ঘুরে দাঁড়াতে চায় জীবনের দিকে । পেয়ারা আর সজনে গাছের ঝিরঝিরে ছায়ায় ওরা বাড়ির প্লাস্টিকের চেয়ারগুলো পেতে দিয়েছে পরম যত্নে। নিজের বাড়িতে অতিথির মতো ধপাস করে বসে পড়ে বিহ্বল উন্মনা। ভাবতে চেষ্টা করলো — ব্যাপারটা কী হল ? এই তো সারারাত হয়ে , প্রথম ভোরের আলো পর্যন্ত তার কবিমনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ঘুনাক্ষরেও তো এসব কথা জানতে পারেনি ! বারান্দায় দাঁড়িয়ে মা মিটিমিটি হাসছে , আর ওরা চারজন প্রিয় উন্মনাদিকে পুরোপুরি বেপাত্তা করে তোয়াকে নিয়ে পড়েছে । তোয়ার হাতে এখন আদরে মাখামাখি এক গুচ্ছ ফুল, রবীন্দ্র নাথের শিশু ও শিশু ভোলানাথ , আর এত্তো বড় একটা ক্যাডবেরি । মা ও মেয়ের ঘাবড়ে যাওয়াটা বেশ উপভোগ করছে মৃত্তিকা‌।বোঝা গেল , অনেকক্ষণ আগেই ওরা এসে পড়েছে। উন্মনার সংসারী মন চমকে উঠে ভাবলো — ওদের কি দিয়ে আপ্যায়ন করবে ? বেলা এগারোটার বাজারে গিয়ে তো তেমন কিছুই পাবে না।তাহলে ? ভাবতে ভাবতেই আবার চমক। ওরা চারজন স্বাভাবিক মুখে প্লেটে করে লুচি তরকারি আর নরম পাকের সন্দেশ এনে দিলো তোয়া আর উন্মনাকে। সঙ্গে আমপোড়ার ঠান্ডাই সরবত আর উন্মনার মায়ের হাতের তৈরি পায়েস । পায়েসের কথাটা গতকাল মা বলেছিলো বলে , উন্মনা আগেই জানতো। তিথি‌ ওর সুন্দর মুখের ওপর এসে পড়া, কেয়ারফুলি কেয়ারলেস চুলের গুছিটাকে আলতো সরিয়ে বললো — শোনো দিদি , নতুন বছরের প্রথম দিনটায় , আমাদের কবিজন্ম তোমাদের বাড়ির দখল নিয়েছে । পানের বোঁটায় চুন থেকে রান্নাঘরের নুন পর্যন্ত সবকিছুই এখন আমাদের আয়ত্তে । আচ্ছা , তোমার চোখের পাতা দুটো ভারী লাগছে কেন দিদি ? সারারাত ঘুমোওনি? নাকি কবিতা লিখছিলে ? শুনে ইউনিভার্সিটির দাপুটে মেয়ে উন্মনা আরও লজ্জায় কুঁকড়ে গেলো । সারারাত না ঘুমোনো চোখদুটো কি আরও কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে ? এবার ওকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলো প্রলয়। শোনো দিদিভাই — অমলেন্দুদার নির্দেশে আমরা চারজন আজ তোমার বাড়িটা দেখে যেতে এসেছি। আগামী রবিবার এখানেই তো অনুষ্ঠানটা হবে , তাই। বেলপাহাড়ির মোড় থেকে সব বাজার হাট করে — ব্যস , আমরা চলে এলাম । আপাতত তোমার রান্না ঘরের দখল নিয়েছে তিথি আর শুভ। এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো জলখাবারটা খেয়ে নাও , দুপুরে খেতে অনেক দেরি হবে । এতক্ষণে উন্মনার মুখে কথা ফুটলো । বাজার করে এনেছো ? বাব্বা ! বাঁচলাম। থালাভর্তি চায়ের কাপ নিয়ে রান্নাঘর থেকে উঠোনে নেমে এলো শুভ‌। উন্মনা ঠিক বুঝতে পারছেনা , সরবত , না , চা , কোনটা আগে খাবে ! এতক্ষণ চুপচাপ থাকা বাদল মেঘ কলকল করে বলে উঠলো — দুপুরের মেনু কি জানো ? মাসিমার হাতের নিম বেগুন আর শুক্তো ,আর আমাদের হাতে মাছের মাথা দিয়ে ডাল ,নরম নরম আলু ভাজা , দই কাতলা আর কচি পাঁঠার কালিয়া । সঙ্গে সঙ্গে তিথির টিপ্পনি — আমের চাটনিটা আমি বাড়ি থেকেই রেঁধে এনেছি। সঙ্গে বেলপাহাড়ির লাল দই আর রসগোল্লা ।প্রলয় আরেক লাইন জুড়ে দিলো — পয়লা বৈশাখের ভোজে , খাওয়ার শেষে মিঠা পাতি মিষ্টি পান না হলে চলে ? আমি টুকুস করে বাজার থেকে নিয়ে আসবো।উন্মনার হতভম্ব ভাবটা কিছুতেই কাটছে না।পয়লা বৈশাখের দিন ঐভাবে নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকা তার পোষায় না । অথচ তিথি আর শুভ ওকে রান্নাঘরের দিকে ঘেঁসতেই দিচ্ছে না । মেয়েকে স্নানে পাঠিয়ে চুপি চুপি বাদল মেঘকে বাড়ির পেছন দিকে ডেকে নিয়ে গেল উন্মনা। আচ্ছা , স্যার এলেন না কেন ? বাদল মেঘ গম্ভীর হতে গিয়েও ফিক করে হেসে ফেললো– আসলে স্যার আজকে সারাদিন ব্যস্ত থাকবে , জেলার এই দিকটায় নববর্ষ উৎসব কভার করতে । দুদিন আগে আমাদের ক’জনকে কনফারেন্স কলে ডেকে উনি অনুরোধ করেছিলেন যে , পয়লা বৈশাখ আমাদের কবিসম্মেলনের জায়গাটা ভালো করে দেখে আসতে । বাজারে ডেকোরেটরদের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অর্ডার দিতে বলেছিলেন , মানে তোমাদের ওপর যেন কোনোরকম চাপ সৃষ্টি না হয়। উন্মনা মনে মনে একটু বিস্মিত ও বিরক্ত হল । মানুষটা সারারাত তার সাথে গল্প করলো ,অথচ তাকে কিছু জানালো না ? এটা কি ঠিক করলে কবিমন ? সারারাত না ঘুমিয়ে বৈশাখী রোদ মাথায় নিয়ে , আর ভাবতে পারে না উন্মনা…
চটকা ভাঙায় বাদল মেঘ । চলো দিদি ,ওরা আরেক রাউন্ড চা খাবার জন্য ডাকছে । চৈত্রের স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকা কিছু শুকনো পাতার ওপর দিয়ে লঘু পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ,বাদল মেঘ জানালো — জানো দিদিভাই , গত পরশু সকালেই আমাদের স্যার প্রলয়দাকে ফোন পে করে একগাদা টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে । বাজার হাট থেকে শুরু করে গাড়ি বুক করা পর্যন্ত। আচ্ছা , এমন নিঃস্বার্থ মানুষ আছে এখনও ? উন্মনা ঠোঁট কামড়ে নিজেকে প্রাণপণে সংযত করার চেষ্টা করছে , আর মনে মনে ভাবছে ,দুচাকা চালাতে চালাতে ক্লান্ত মানুষটাকে এই মুহূর্তে কোনো গ্রামের রাস্তায় মুখোমুখি যদি পেয়ে যেত , তাহলে পাগলের মতো তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে , সাদা পাঞ্জাবি বা হাফ সার্ট ছিঁড়ে ফালা ফালা করে দিত।

তিথির বাড়িয়ে দেওয়া চায়ের কাপ হাতে নিয়ে একটু আড়াল খোঁজে উন্মনা । তার রাত- বিছানার ওপরে একটা নতুন বেড কভার আলস্যে শুয়ে আছে । সেটাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে , সে তার কবিমনের অস্তিত্ব খোঁজবার ব্যর্থ চেষ্টা করে । মনে মনে বারবার বলে — আমি তোমাকে মিস করছি । ভীষণভাবে মিস করছি । তুমি একবার ফোন করে আমার সব অভিমান ভুলিয়ে দাও ।আমি তো নিজের ভাঙা সংসারটার টুকরো টাকরাগুলো জড়ো করে , বেঁচে থাকার নিঁখুত অভিনয় করে যাচ্ছিলাম। তুমি কেন শ্রাবণের ধারা ,শরতের কাশ , হেমন্তের শিশির ,শীতের সোনা রোদ হয়ে সবটুকু নাড়িয়ে দিলে কবিমন ? আমি তো আর কিছুতেই আমার পূর্বাশ্রমের অন্ধ গলিতে ফিরে যেতে পারবো না । আমার আঘাটায় বেঁধে রাখা ভাঙা নৌকোটাকে তুমি এমন করে ভাসিয়ে দিলে কেন কবিমন ?
রান্নাঘর থেকে একই সঙ্গে নিম বেগুন ভাজা , আর ফুটন্ত দেরাদুন রাইসের খিদে খিদে গন্ধ ওদের ছোট্ট বাড়িটার আনাচে কানাচে ম ম করে ঘুরে বেড়াচ্ছে । গত আধঘন্টা ওরা কেউ উন্মনার ঘরে ঢোকেনি । জীবনের এ এক নিঁখুত চিত্রনাট্য যেন । চিত্রনাট্য , নাকি অসমাপ্ত কবিতা ? ও জীবন , তুমি কার মতো সুন্দর গো ?
তোয়া আজ কিছুতেই আগে খেতে চায়নি। ও আজ সবার সঙ্গে নেমন্তন্ন খাবে।একটা নতুন ফ্রক পরে সকলের সঙ্গে সে কত কি কথা বলে যাচ্ছে । কিছুক্ষণ আগে সবাইকে সে গান শুনিয়েছে। ও ঘর থেকে উন্মনার কানেও এসেছিল সেই সুর — সোনা রোদের গান আমার সবুজ পাতার গান , তোকে ছাড়া যে ভালো লাগেনা ,কাটে না দিনমান….
হঠাৎ মাকে এই তুমুল আড্ডার মধ্যে আবিষ্কার করে তার কচি গলায় দুলে উঠলো উন্মনার‌ লেখা একটি কবিতা —

থাকুক নৌকো ,থাকুক ঢেউয়ের দোলা ,
মাথার ওপর আকাশ আপন ভোলা ।
থাকুক বৃষ্টি ,দৌড়ে আসা মেঘ ,
শুকনো মাঠে আসুক ঝড়ের বেগ।
থাকো অরণ্য,থাকো জলে ভাসা দ্বীপ ,
মায়ের কপালে গোল সিঁদুরের টিপ।
এখানে ওখানে ডানা ঝাপটাবে পাখি ,
সবুজে অবুঝে সারা বেলা ডাকাডাকি….

হাততালি, হাততালি, হাততালি….
নববর্ষের সমবেত হাততালিতে যেন হাজার হাজার শ্বেত পারাবত শান্তির দূত হয়ে সারা পৃথিবীর আকাশে আকাশে উড়ে চলে গেল।

তারপর অনেক কবিতা, অনেক গান,নিখাদ বাঙালি আড্ডার ঘরানা ও পরম্পরা পেরিয়ে , সামনের রবিবার আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি ও সম্ভাবনাকে উস্কে দিয়ে , ওদের সাদা অ্যাম্বাস্যাডার যখন পশ্চিম দিগন্তের পথরেখা ধরে বেলপাহাড়ি, শিলদা, দহিজুড়ি হয়ে , ঝাড়গ্রামের আলো ঝলমল ফ্লাই ওভারকে খুঁজতে ক্রমশ উধাও হয়ে গেল —
গাঢ় সন্ধ্যার সেই অনিবার্য নিথর মুহূর্তে , গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা উন্মনা অনুভব করলো , ঠিক এই মুহূর্তে সে একা নয় , পাশে যেন দাঁড়িয়ে আছে তার কবিমন । দুপুরে বিছানার বেড কভার সরিয়ে যে গন্ধটা সে পায়নি , সেই আশ্চর্য পুরুষালি সুগন্ধে কবি উন্মনা ক্রমশ বুঁদ হয়ে গেল…

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

1 Response

  1. NikeArink says:

    the dark internet deep dark web dark market url

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।