গল্পে অভিষেক বসু

কাঁটাতার

আমার নাম মকবুল। অবিভক্ত বাংলায় আমার জন্ম। সালটা বোধহয় ১৯২৬, খুলনা শহরের কাছে খুলনা জেলার কলাপতা গ্রামে । আমাদের গ্রামের বুকচিরে বইত কপোতাক্ষ নদ। আমাদের বাড়ির ভিতরে একটা আমগাছ ছিলো। ফাল্গুন মাস এলে সেই গাছ ভরে যেতো আম এর মুকুলে। সেই আমের গন্ধ ভেসে যেতো বহুদূরে।
শরতের আকাশে পেজা মেঘের আনাগোনা শুরু হলে কপোতাক্ষের দুই পাড় জুড়ে শুধু দেখা যেতো কাশ ফুলের সমারোহ। আগমনীর বার্তা বহন করে নিয়ে আসত সেই শ্বেত শুভ্র কাশফুল।
অগ্রহায়ণ মাস পড়লে পাকা ধানের শীষে হলুদ হয়ে যেতো আমাদের গ্রামের মাঠ।
বাবা বলতেন আমি নাকি পড়াশুনায় ভালো ছিলাম। মাস্টার মশাইরাও তাই বলতেন।বলতেন আমার নাকি অঙ্কে মাথা খুব পরিষ্কার।
এরপর উথাল পাথাল রাজনীতি।বাংলা ভাগ হয়ে গেলো।নিজের দেশেই হয়ে গেলাম পরাধীন।
আমাদের গ্রামেরই মেয়ে কুসুম।ভালো নাম কুসুমলতা।কুসুমের গভীর চোখে দেখেছিলাম এক অপরূপ মায়া।সেই মায়ার আবেশে হারিয়ে গিয়েছিল মন।
ও পড়ত গ্রামের ইস্কুল ননী বালা বিদ্যালয়ে।আমার থেকে বছর চারেকের ছোটো হবে।ওদের বাড়ী ছিল স্বচ্ছল পরিবার।বাবা ছিলেন গ্রামের ছেলেদের ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। দাদু ছিলেন ঢাকা শহরের উকিল। গ্রামের বাড়ীতে মাঝে মধ্যে আসতেন।দেশ যখন ভাগ হলো তখন বহু মানুষ বহু অজানা আশঙ্কায় ওপার বাংলার চলে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন উদ্বাস্তু হিসেবে।তারা মনে করেছিলেন ওপার বাংলা তাদের জন্যে নিরাপদ। কিন্তু কুসুমের দাদু নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে যেতে চাননি।থেকে গিয়েছিলেন পূর্ব বাংলায়।
কুসুমের মা আটপৌরে শাড়ি পরে সন্ধ্যে বেলা স্নান সেরে তুলসী মঞ্চে প্রদীপ জ্বালাতে আসতেন ।আমার ভারী ভালো লাগতো দেখতে যদিও সামাজিক অার ধর্মীয় কারণে ওদের বাড়ীর দিকে তাকানো আমার নিষেধ ছিল।
ওদের বাড়িতে দুর্গাপূজা হতো।বাড়ীর দালানে কাঠামো তৈরী হয়ে তার উপর মাটি পড়তো। প্রতিমার রূপ গড়ে উঠতো। ভারী ভালো লাগতো প্রতিমার চোখ আঁকা দেখতে।যদিও সবই দেখতে হতো গোপনে যাতে কেউ দেখে না ফেলে।দেখে ফেললেই কেলেঙ্কারি।
কুসুম ও আমাকে ভালোবাসতো। বাড়ীর তৈরি নারকেলের নাড়ু, কুঁচো নিমকি, ছাঁচের সন্দেশ আরো কত কি কোচরে লুকিয়ে আমার জন্যে নিয়ে আসতো। ইস্কুল যাওয়ার পথে আমার কলেজ যাওয়ার অপেক্ষা করতো।
আমার প্রিয় কবিতা ছিল কবি জসীমউদ্দীনের ‘ নকশী কাঁথার মাঠ ‘। রূপাই অার সাজুর সেই অমর ভালোবাসার আখ্যান।
কপোতাক্ষের জলে আমি নৌকা ভাসাতাম।ফুটে থাকা পদ্ম পাতায় জলের বিন্দু দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগতো।
কুসুম আমার কাছে অঙ্ক বোঝার অছিলায় মাঝে মধ্যে বাড়ীতে ডাকতো। যদিও সেটা খুব লোকলজ্জার বস্তু ছিল। কিন্তু কুসুম ছিল অন্য স্বভাবের। দূর্গা প্রতিমার মুখের সাথে আমি ওর মুখের মিল খুঁজে পেয়েছিলাম।
এই ভাবে স্বপ্নে বিভোর হয়ে দিন কাটছিল।কুসুম ক্রমশ আমার কাছে আরো কাছে আসতে শুরু করেছিল। আমরা ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।
আমাদের দুজনের পরিবারই সম্পূর্ণ বিপরীত মুখে চলে আমাদের মধ্যে পাঁচিল তুলে দেবার চেষ্টা করলো। মুসলমান ছেলে অার হিন্দু মেয়ের আবার ভালোবাসা হয় নাকি ? সেটা তো ঘোরতর পাপ। এই পাপ তো হতে দেওয়া যায় না।
কুসুমকে বন্ধ করা হলো ঘরে। আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ঢাকা শহরে পড়াশুনো করবার জন্যে নাকি। উদ্দেশ্য ছিলো কুসুমের থেকে আমাকে আলাদা করা।
কুসুম আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠি লিখতো। ওর খুব কাছের এক বন্ধুকে দিয়ে পোস্ট করতো।আমি অধীর আগ্রহে সেই চিঠির অপেক্ষাতে থাকতাম।চিঠির মধ্যে থাকতো গ্রামের কথা,কপোতাক্ষের কথা,পূজোর কথা,অার অনেক অনুভুতির কথা। আমার চিঠি লেখা ছিল সম্পূর্ণ বারণ।
এর মধ্যে প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেছে।
সারা দেশে তখন আমার প্রিয় বাংলা ভাষা কে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবীতে আন্দোলন শুরু হয়েছে।পাকিস্তান ফৌজের কাছে হারবো না। মুক্ত বাংলা ভাষা চাই। উর্দূ না , প্রানের প্রিয় বাংলা ভাষা চাই।
নিজের অশান্ত মনে তখন ঝড়।একদিকে গ্রামে আমার জন্যে অপেক্ষারত কুসুম অার অন্য দিকে উত্তাল আন্দোলন।
শহরের রাজপথে পাকিস্তানি ফৌজের দাপাদাপি। বিপ্লবের কণ্ঠকে রুদ্ধ করতে হবে।
আমি তখন ঢাকা শহরে একটা বেসরকারি সংস্থা তে কর্মরত।কিন্তু ভাষার টান কে উপেক্ষা করতে পারলাম না। চাকরী ছেড়ে ঝাপিয়ে পড়লাম ভাষা যুদ্ধে সামিল হতে।
সেই প্রথমবার চিঠি লিখলাম কুসুমকে। কাঁপা কাঁপা হাতে লিখলাম ‘ দেশের আমাকে প্রয়োজন।সুখে থেকো , ভালো থেকো।’
এরপর একদিন একটা চিঠি পেলাম কুসুমের বন্ধুর থেকে ‘ কপোতাক্ষের জল থেকে ঘুমিয়ে থাকা কুসুম কে তুলতে আধ ঘন্টা সময় লেগেছিল ‘।
নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি। কুসুম কে বোঝাতে পারিনি যে ও যদি আপনার সঙ্গে নিজেকে জড়ায়ে তাহলে শুধু কষ্টই পাবে,সুখ কখনোই আসবে না ওর জীবনে।
মনে পড়ে গেলো নকশী কাঁথার মাঠ।
ভাষার জন্যে লড়াই তখন তীব্র আরো তীব্র হয়েছে। যে কোনো মূল্যে বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। আমাদের অভিযান ছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে।রাস্তায় অসংখ্য মানুষ।সবাই সামিল ভাষা যুদ্ধে।
নির্বিচারে গুলি চললো।আমার মাথা ফুঁড়ে দিল পুলিশের গুলি। রাস্তায় লুটিয়ে পরলাম।
মাথাটা হালকা হয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। দেখতে পাচ্ছি কলাপোতা গ্রাম ,কুসুমের মুখ, কপোতাক্ষের জল,দূর্গা প্রতিমার চোখ,শুনতে পাচ্ছি আযানের সুর।
শেষ হয়ে আসছে হৃদয়ের স্পন্দন। নিভে আসছে জীবন প্রদীপ।
কুসুম…. আমি আসছি তোমার কাছে। ধর্মহীন ভালোবাসার কাছে। রাজনীতি হীন মনুষত্যের কাছে।
দেখা হবে খুব তাড়াতাড়ি কাঁটাতার বিহীন অন্য এক দেশে।।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।