অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৫৬)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

সাক্ষী থেকো ঋতু বর্ষণের দিনলিপি
সাক্ষী থেকো কী ভীষণ নিঃসঙ্গ সময়
সাক্ষী থেকো মধ্যবয়সের মরীচিকা
নিজেকে রক্তাক্ত করি ক্ষমাহীন আমি…

সকালে অমলেন্দুর ঘুম ভাঙলো, তিথির ডাকে — দাদাভাই ,আমরা একটু বাড়িতে যাচ্ছি । মায়ের শরীর খারাপ। আজ ফিরতে পারবো না। কাল বা পরশু ফিরবো তোমাকে, ফোনে জানিয়ে দেবো দাদাভাই। এখান থেকে প্রথম বাস কখন ? অমলেন্দু জানালো– সাড়ে ছটায়। তিথি আর বাদল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছুটল বাস ধরতে ।
‌‌ হঠাৎ বাড়িটা ফাঁকা হয়ে যাওয়াতে অমলেন্দু কি করবে ঠিক ভেবে উঠতে পারছিল না।রান্নার মাসিকে খবর পাঠালো একটু আসতে। ইদানিং একটু বেলার দিকে সে আসে। কিন্তু অমলেন্দুর নিঃসঙ্গতা এখন যেন তার প্রতিপক্ষ ।‌ তিথি আর বাদলের সংসারে সে যেন ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছে । অথচ ওদের দিক থেকে ভালোবাসা বা যত্নের কোন ত্রুটি নেই। বিশেষ করে তিথি যেন তার দাদাকে সবসময় আগলে রাখে। কিন্তু অমলেন্দুর যে কী হয়েছে , সে নিজেই বুঝতে পারে না । একটু অপেক্ষা করে নিজের ব্রেকফাস্ট নিজেই বানিয়ে ফেললো আজ। তারপর, পরপর দু কাপ চা খেয়ে ধাতস্থ হয়ে , ল্যাপটপ খুলে কাজে বসলো। প্রবন্ধটা আজই শেষ করতে হবে । কি মনে করে, অভিমান পেরিয়ে উন্মনাকে দুলাইন লিখলো আজ — রাতে তিথি আর বাদল থাকবে না । পারলে ফোন কোরো। তিথির মার শরীর খারাপ শুনে হঠাৎ চলে গেল, হয়তো কালও ফিরতে পারবে না। অবশ্যই ফোন করবে, এমন কিছু কথা আছে যা তোমাকে একটু নির্জনেই বলতে হবে। যেভাবেই হোক , সময় করে ফোন কোরো। প্রাণতোষবাবু নিশ্চয়ই ভালো আছেন। তুমি দেখে নিও, উনি খুব তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠবেন। সবার শুভকামনা ওনাকে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ঠিক ফিরিয়ে দেবে । এসো, আমরা সবাই ওনার জন্য প্রার্থনা করি এই শুভ সকালে।
বিন্দাসের কোন খবর নেই । ফোনও নেই । ভরা শ্রাবণে যেন ভাদ্র মাসের গুমোট। অমলেন্দুর মনে হলো এই বিশ্বসংসারে তার আর কেউ নেই। প্রত্যেকেই যে যার নিজস্ব পৃথিবীতে বসবাস করছে। নিজস্ব স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে বেঁচে আছে । অথচ সে-ই একমাত্র সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে কবিতাজন্মের আরাধনা করছে। এটা কতদিন সম্ভব সে নিজেই ভেবে পাচ্ছে না। একটা বড় কাজ করতে গেলে পার্টটাইমারদের দিয়ে কোনো কিছু হয় না। ফুল টাইমার প্রয়োজন । দক্ষতার প্রয়োজন । আবেগ ও আদর্শের ধুনি হয়তো এক বছর বা দুবছর জ্বালানো যাবে‌ , কিন্তু তারপর ? প্রত্যেকে তার সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে অমলেন্দু কোথায় যাবে‌ ? কবিতা আঁকড়ে এভাবে কতদিন কাটাতে পারবে‌ ?
ঘন্টাখানেক থম মেরে বসে থাকলো অমলেন্দু । উন্মনা মেসেজ দেখেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না । কারণ ও প্রান্ত থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই । দেখতে দেখতে দুপুর দুটো বাজতে চলল। ফ্রিজে গত রাতের কিছু খাবার অবশিষ্ট রয়েছে। রান্নার দিদি এবেলা এলো না । ওবেলার কথা না ভেবেই , সেটুকু গরম করে খেয়ে ফেললো অমলেন্দু। বেঁচে থাকতে হবে । আর এই একলা জীবনটাকে বেশ কয়েক বছর চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কবিতাজন্ম যদি সার্থক নাও হয়, কবিতার আশ্রয় যদি ভ’রে নাও ওঠে , তবু অমলেন্দুকে তো তার সদর্থক চিন্তা নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে । আচ্ছা , এসব সে কী ভাবছে ? খাওয়া দাওয়ার পর একলা বাড়িতে বসে , এগুলো ভাবতেই নিজেরই কেমন হাসি পেল । সবাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ,অথচ সে-ই ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছে ? অমলেন্দুর মনে হল সে খুব স্বার্থপর। তা নয়তো প্রাণতোষের জন্য উন্মনার স্বাভাবিক উদ্বেগ দেখে সে নিজেকে বিপর্যস্ত ভাববে কেন ? তিথি আর বাদলের সংসারে সেও তো একজন ! অন্তত তারা তো তাই মনে করে , তাহলে সে নিজেকে বহিরাগত ভাবছে কেন ? সে কি ভেবেছিল , পাগলা বিন্দাস প্রতিদিন সকালে এসে তার খিদমতগিরি করবে ? সে তো একজন গানের বাউল । তারও একটা আলাদা জীবন থাকার কথা । সে যদি তার প্রাণের শিকড় খুঁজতে যায় , তাহলে অমলেন্দুর তাতে অভিমানের কারণ কি ? অমলেন্দু কেন ভাবলো যে , প্রতিদিন সবাই তাকে ফোন করে তার খবর নেবে ? কবিতার আশ্রয় কি একদিন দুদিনের ব্যাপার ? প্রত্যেকেই তো রুটি রুজির বাইরে , আলাদা করে এই ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করছে। হয়তো অমলেন্দুর মতো সবকিছু ছেড়ে দিয়ে , শুধু কবিতাজন্ম নিয়ে পড়ে নেই। কিন্তু তাই বলে কি তাদের স্বার্থপর ভাবা যায় ? প্রত্যেকেরই তো সংসার আছে , দায়বদ্ধতা আছে আলাদা আলাদা। তাহলে ?
অমলেন্দু হঠাৎ তীব্র অভিমান থেকে বিচ্যুত হয়ে , নিজেকে স্থিতধী করবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। একজন মনোবিদ তার ভীষণ প্রয়োজন। তাকে তো অনেকদিন সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে হবে। এমনও তো হতে পারে যে উন্মনা নিজের পূর্বাশ্রম আঁকড়ে, নিজের অসুস্থ স্বামীকে সুস্থ করে তোলবার চেষ্টায় লড়াই চালিয়ে গেল ?. তাকে কি স্বার্থপর ভাববে অমলেন্দু ? উন্মনা তো তার গভীর হৃদয় নিয়েই তাকে কবিমন বলে ডেকেছিলো । এত সহজে তার কবিতার নারী কবিতাজন্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে ? যেতে পারে কখনও ? এমনও তো হতে পারে , প্রাণতোষ তার স্ত্রী সন্তানকে আঁকড়ে নিয়ে বাঁচতে চাইলো। এমনও তো হতে পারে, একটা কঠিন অসুখ থেকে উঠে , সে নিজেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করলো । তখন ? অমলেন্দু কি ঝাঁপিয়ে পড়বে তাদের ভরা সংসারে ভাঙন ধরানোর জন্য ? কোন গভীর মনের মানুষ কখনো কাউকে ছিনিয়ে নিতে চায় ? কবি উন্মনাকে তো তার নিজের মতো করে বাঁচতে দিতে হবে । তার কবিতাজন্মে নিশ্চয়ই অমলেন্দু থাকবে । কিন্তু তার সংসার জীবনে যদি প্রাণতোষ থাকে, তাহলে সেটাও তো অমলেন্দুকে মেনে নিতে হবে । অমলেন্দুর হঠাৎ মনে হল , এই এক বছরে উন্মনাকে বোঝবার সে আদৌ চেষ্টা করেনি । দুটো আলাদা জীবন নিয়ে একজন নারী যে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে , সেটা কি অমলেন্দু কখনও গভীরভাবে ভেবেছে ? একজন পুরুষ যে তার সাত পাকে বাঁধা, অগ্নিসাক্ষী করা স্বামী — একদিকে তাঁকে সে সংকট থেকে বাঁচাচ্ছে , ক্রমশ তার ম্লান মুখে‌ মেঘ ভাঙা এক চিলতে রোদের মতো হাসি ফুটে উঠছে । যিনি তাঁর সন্তানের জন্য নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন, যিনি তাঁর স্ত্রীকে মর্যাদা দিচ্ছেন, নতুন করে ভেঙে যাওয়ার সম্পর্কটাকে জুড়তে চাইছেন , সেখানে প্রাণতোষের অপরাধটা কোথায় ? ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া তাঁর তো অন্য কোন জীবন নেই ! কবিতার আশ্রয় নেই। তিনি কি করে অমলেন্দুর শত্রু হবেন ? অমলেন্দুর যেন হাহাকার করে উঠতে ইচ্ছে করলো। এই মুহূর্তে উন্মনাকে ফোন করতে ইচ্ছে করলো । চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে-কবিতার নারী উন্মনা , তোমার স্বামীর মতো আমিও তোমাকে নিজের সম্পত্তি ভাবতে শুরু করেছিলাম । অথচ অনুভব করছিলাম না যে মানুষ আসলে জন্মস্বাধীন । আমার ইচ্ছে দিয়ে কারোর ইচ্ছেকে বেঁধে রাখা যায় না। কোন সুস্থ মানুষ কখনও তার অতীত সম্পর্ককে মুছে ফেলে সামনের দিকে এগোতে পারে না । অমলেন্দুর মনে পড়লো — তার এক কলেজের বন্ধু ডিভোর্সের পরে, বাড়ি থেকে প্রথম বিয়ের সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে । তারা নাকি এখন সুখে শান্তিতেই আছে ! হা হা,অমলেন্দু জাস্ট ভাবতে পারে না এমন নিরর্থক ও দুর্বল ভাবনাগুলো। কী করে তা সম্ভব হয় ? একদা ভালোবাসার ঘর সংসার , একসঙ্গে থাকা , কারোর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে মুহূর্তে তাকে বুঝে ফেলা, কারোর চোখের জলে উদ্বেল হাওয়া , কারোর জ্বরতপ্ত কপালে হাত রেখে পাগলের মতো ডাক্তারের কাছে ছুটে যাওয়া, কারোর জন্য পছন্দ করা ফুলের গুচ্ছ আনা — সবকিছু এক নিমেষে অতীত করে দেওয়া যায় ? বাড়ি থেকে সব ছবি সরিয়ে দিলেই কি অতীতটাকে মুছে ফেলা যায় ? এক ছাদের নিচে যে অন্তরঙ্গতার স্মৃতি , তাকে মুহূর্তের মধ্যে আস্তাকুঁড়ে বিসর্জন দিয়ে , নতুন করে কারোর সঙ্গে ঘর সংসার করা কিভাবে সম্ভব হয় ? অমলেন্দু ভাবতে চেষ্টা করে — হয়তো সেই অস্বাভাবিক ,বাকি সবাই স্বাভাবিক ! হয়তো এভাবেই মানুষ মুখোশ পরে একটা জীবন থেকে অন্য জীবনের দিকে গড়িয়ে যায় । অতীতের জন্য কোন তাপ উত্তাপ থাকে না। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে কর্ণের মৃত্যুর পর সেই অসহায় মৃতদেহ দেখে, গড়িয়ে পড়া রক্তশ্রোত দেখে, অর্জুন কী করে শিবিরে ফিরে গিয়েছিল ? কিভাবে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আবার পরের দিনের যুদ্ধ নিয়ে রণকৌশল সাজিয়েছিল ? তার মানে , প্রতি মুহূর্তেই মানুষ নিজেকে আপডেট করে পরের মুহূর্তটির জন্য ? আসলে মানুষের হাতে বোধহয় একটা কঠিন ইরেজার আছে ,যা এক নিমেষে ও নিঃশব্দে অতীতকে মুছে ফেলছে । বাবার মৃত্যুর পর বাবাকে মুছে ফেলছে, মায়ের মৃত্যুর পর মাকে ভুলে যাচ্ছে। কর্ণের মৃত্যুর পর কর্ণের অস্তিত্ব ও বীরত্বকে ভুলে যাচ্ছে। এইভাবেই বোধহয় একজন আধুনিক বাবা তার নিহত সন্তানের লাশ সনাক্ত করেও , রাতে খাবার জন্য দু’মুঠো ভাত চাপায় । গা গুলিয়ে ওঠা খিদে তাকে পরের দিনের জন্য বেঁচে থাকতে শেখায় । কোন পৃথিবীতে সে বেঁচে থাকছে ? স্মৃতিহীন বিস্তৃতিহীন আলোহীন অন্ধকারহীন , হাসিকান্নাহীন — শুধু বাস্তববোধের পৃথিবীতে ? যে পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তকে আমরা শুধু বর্তমান বলে ভেবে নিচ্ছি । আশা করছি পরের দিনে আমার জন্য নতুন কিছু অপেক্ষা করছে ? অথচ সেই পরদিন সকালেই আগের দিনটাকে সে নির্লিপ্ত মুখে মুছে ফেলছে !
অনেকক্ষণ ধরে মাথার চুল শক্ত করে চেপে অমলেন্দু বসে থাকলো। বিকেল কখন সন্ধেয় গড়িয়ে গেছে। কানের চারপাশে মশাদের গুনগুন ধ্বনিতে তার চমক ভাঙলো । বেঁচে থাকতে হবে। বিবর্তনবাদের নিষ্ঠুর ইতিহাস পেরিয়ে, সংগ্রামের পর সংগ্রাম পার হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।পিঁপড়ে , মশারা যেভাবে কোটি কোটি বছর বেঁচে আছে , সেভাবেই মানুষকেও বেঁচে থাকতে হবে।
বাইরে হঠাৎ ক্যুরিয়ার কোম্পানির সাইকেলের বেল বেজে উঠলো । নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে আমাদের বাইরে এসে চিঠিটা রিসিভ করলো। ঘরে ফিরে এক কাপ চা তৈরি করে চিঠিটা খোলে অমলেন্দু । হঠাৎ এক ঝলক খুশি তাকে সারাদিনের বেদনা বোধ থেকে যেন তুলে আনতে চায়। আসানসোলে দুদিন ব্যাপী মঞ্চনাটকের কর্মশালা পরিচালনা করতে তাঁকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। অমলেন্দুর মনে পড়ে , ফোনে বেশ কিছুদিন আগে এই সম্পর্কে কথা হয়েছিল । প্রাথমিক কিছু কথাবার্তা । দু পৃষ্ঠা চিঠি পড়ে মুগ্ধ হল অমলেন্দু । মঞ্চ নাটক নিয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা , নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। কলকাতার থিয়েটার থেকে ওয়ার্কশপ নিতে আসছেন স্বনামধন্য একজন পরিচালক । রাঢ় বাংলা থেকে নির্বাচন করা হয়েছে অমলেন্দু মন্ডলকে । অমলেন্দুর থিয়েটারি রক্তে দোলা দিয়ে গেল এই বার্তা। অনেকদিন বাদে যেন কানের সামনে ক্ল্যারিওনেট এবং মঞ্চ নাটকের থার্ড বেলের আওয়াজ ভেসে উঠলো।
সেদিন রাত এগারোটা নাগাদ উন্মনার ফোন এলো– হ্যালো কবিমন, তোমার সব খবর ঠিক আছে তো ? মনে হচ্ছে তুমি কিছুটা ডিস্টার্বড হয়ে রয়েছো। কিন্তু তুমি কি আমার অসহায় অবস্থাটা ফিল করছো ? অমলেন্দু এ কথার জবাব দিতে পারে না । শুধু ধীরে ধীরে বলে — ঘন্টাখানেক কথা বলার মতো সময় তোমার আছে ‌? আমরা বোধহয় জীবনের কয়েকটা ডিসিশন নেবার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি । উন্মনা মৃদু কন্ঠে শুধু বললো —
বলো ।
আমি প্রস্তুত।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।