অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৩৭)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
আমরা জ্বালবো মনের কথার আলো
সঙ্গোপনের থেকে সেও তো ভালো
আমরা ভাসবো অন্তবিহীনতায়
কবিতাজন্মে, নিবিড় বনচ্ছায়ে ।
সাংবাদিকতার দিকদিগন্ত ছুঁয়ে ,বাড়ি ফেরার পথে চৈত্র সন্ধ্যার মুখে , অমলেন্দুর শরীরটা যেন হঠাৎ শীতশীত করে উঠলো । সর্বনাশ ! অমলেন্দু ভাবলো — এখন তো ঠাসা কর্মসূচি। দিনভর একটা দুটো জেলা ঘুরে বেড়ানো ,খবর সংগ্রহ , রিপোর্ট বানানো , তারপর কাগজের দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়া ,যাকে বলে দম ফেলবার সময় নেই । রাত নটা নাগাদ বাড়ি ফিরে কবিতা সংগঠন নিয়ে প্রস্তুতি, চিঠি লেখা, এখানে ওখানে আবেদন পাঠানো — অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব ; কিন্তু লোকসংখ্যা তো সীমিত।নিজের কাঁধে অনেকটা তুলে নিলেও অমলেন্দু খুব ভালো করে জানে , সে বৃষস্কন্ধ নয়। সময় কম , এর মধ্যে জ্বর বাধিয়ে বসলে….
দরজার তালা খুলতে খুলতে আবার গাটা যেন শিরশির করে উঠলো। বাইরের পোষাক ছেড়ে , পরপর দুকাপ চা ,আর একটা প্যারাসিটামল খাওয়ার পর একটু ধাতস্থ হল সে। লুঙ্গি বা হাফপ্যান্ট অমলেন্দুর কোনোদিনই পছন্দ নয়। ঘরে বাইরে সে ঢলা পাজামা আর হাফ পাঞ্জাবিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে । সে অনুভব করলো–ওষুধ এমনই এক আশ্চর্য ম্যাজিক,যা জল দিয়ে গিলে ফেলার পরেই , নিরাময়ের চিঠির মতোই শরীরের প্রান্তে প্রান্তে মিশে যায় । আজকের এই দৌড়ে বেড়ানোর জীবনে , যেখানে মৃত্যু এলেও তাকে দরজার দাঁড় করিয়ে বাকি কাজগুলো সেরে নিতে হয় , সেখানে জ্বর বাধালে, বিছানায় শুয়ে থাকার মতো সময় কারোর নেই। অথচ , শৈশব আর কৈশোরের সন্ধিক্ষণে জ্বর আসবার মুহূর্তগুলো দারুণ উপভোগ্য ছিল তার কাছে । গভীর রাতে ঘুম আসছে না , কিন্তু জ্বর আসছে । সেই বিরল মুহূর্তে , ঘোরের মধ্যে তার মনে হতো,পাহাড় থেকে কেউ যেন তাকে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে–যে মহাশূন্যতায় সে অনুভব করতো মায়ের সুগন্ধটুকু।পুরোনো থার্মোমিটারে জ্বর মাপা , মাথা ধুইয়ে দেওয়া যেন মুছে দিত দুধ সাবুর একঘেয়েমি। চার পাঁচ দিন পরে গরম ভাত , আলুভাতে, আর টাটকা মাছের ঝোলের সেই অনির্বচনীয় সুগন্ধ যেন এই বুড়ো বয়সেও ফিরে পেল অমলেন্দু । যথারীতি আবার শিহরিত হলো । তবে , সেটা জ্বরের আচ্ছন্নতায় নাকি মার কথা ভেবে , সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ হিসেবে তার এই মুহূর্তে মনে পড়লো কবিতার নারী উন্মনার কথা । যদি এই মুহূর্তে উন্মনা তার কাছে থাকতো,তাহলে প্রেমিকার আকর্ষণে নয় , কবে চলে যাওয়া মায়ের কথা ভেবেই উন্মনার কোলের মধ্যে মুখ গুঁজে দিতে পারতো অমলেন্দু। নিশ্চিত পারতো। এই মুহূর্তে ওর একলা থাকার আশ্রয়টুকুকে বড্ড সহায়হীন বলে মনে হতে লাগলো । একা মানুষের সমস্ত দাপট এক মুহূর্তে নিভে যায় ,যখন সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে।জ্বরের আবছা ঘোরের মধ্যেও অমলেন্দুর মনে হলো — সল্টলেক বা নিউটাউনের কোনো কোনো বাড়িতে , একজন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা একা একা থাকেন কি করে ? মৃত্যুভয় অমলেন্দুর কোনোদিনই নেই । কিন্তু আজ থেকে পঁচিশ বছর পরে , নিঃসঙ্গ প্রৌঢ় অমলেন্দুর ভবিষ্যৎটা যেন নিজেই দেখতে পেল সে। ল্যাপটপ অন করতে করতেই এইসব দুর্বল ভাবনাগুলো ঝেড়ে ফেললো এক নিমেষে । কখনও কখনও ফোন করাকেও অস্বস্তিকর মনে হয়। কিন্তু কবি বাদল মেঘকে যে কিছু কথা বলতেই হবে। আবার , তিথির মাঝরাতে ফোনের কথাও ঘুণাক্ষরেও বলা যাবে না।কাজেই , ল্যাপটপের পর্দায় চিঠি লিখে বাদল মেঘকে পাঠিয়ে দেবে , এই ভাবনায় কিবোর্ডের পালকে আঙুল ছোঁয়ালো–
প্রিয় কবি বাদল মেঘ ,
বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তোমার কবিতা পড়ে যখন আমরা খুব প্রাণিত হয়ে উঠছিলাম , তখন তুমি আমাদের এই কবিতা পরিবারে এলে । সঙ্গে এলো তোমার প্রিয় বন্ধু তিথি । তোমাদের সৃষ্টিশীল যুগলবন্দি দেখে , আমার বুড়ো হাড়েও নতুন করে যেন দুব্বোঘাস গজাতে শুরু করেছিল। তোমরা যে কবিতার মানুষ ও একইসঙ্গে প্রাণের মানুষ এটাও বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু গোপগড়ে আমাদের মিটিংএ , তোমার মুখে তিথি সম্পর্কে কিছু কথা শুনে , আমরা সবাই কমবেশি আহত হয়েছি। যখন একজন নারী তার দুকুল ছাপানো হৃদয়ের ভালোবাসা একজন পুরুষকে দিয়ে দেয় ,তখন সেই পুরুষের জীবনটাই কবিতার মতো সুন্দর হয়ে ওঠে; একথা নিশ্চয়ই তোমাকে বোঝাতে হবে না । তোমাদের প্রিয় উন্মনাদির অনুরোধেই তোমাকে আমি এই চিঠিটা লিখছি । ফোন করলে কথার পিঠে কথা উঠে আসতে পারতো । তাতে তর্ক জমে উঠতে পারে, কিন্তু অনুভব আহত হয়। তোমরা আজকের প্রজন্ম। আধুনিক দুনিয়ায় আফ্রিকা থেকে ল্যাটিন আমেরিকা পর্যন্ত যে দারিদ্র্য ও লড়াইয়ের কবিতা উঠে আসছে , সেই সাধারণ মানুষের খিদে ও ভালোবাসার কথা আমার থেকে তুমি ও তিথি ভালো জানো বলেই আমার বিশ্বাস। যতদিন বাঁচবো তোমাদের কবিতা কন্ঠে ধারণ করবো ,ছড়িয়ে দেবো মানুষের মাঝখানে।এটাই আমার প্রতিজ্ঞা। কবিতা লিখতে না পারি ,কথক তো হতে পারি , সেটাই বা কম কিসের ? প্রিয় কবি বাদল মেঘ,আমি তোমাদের গুরু হতে চাইনা ,বন্ধু হতে চাই । আগামী নববর্ষের পরের রবিবারে , আমাদের সকলের প্রিয় উন্মনার আঙিনা যেন প্রথম গ্রীমের সাদা ফুলে ফুলে ভরে ওঠে । কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্বের জায়গা যেন সেখানে না থাকে। কবিতাকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে ,এটাই যেন আমাদের প্রতিজ্ঞা হয়। চলতে গেলে বাধা থাকবে,ব্যবধান ও থাকবে । আবার সেই প্রতিকূলতার মধ্যে কবিতাও সৃষ্টি হবে । আমাদের দুবেলা দুমুঠোর ব্যবস্থা আমরা ঠিক করে নিতে পারবো। মনে রেখো , আমাদের পুষ্পাঞ্জলিতে যেন কবিতার পাপড়ি থাকে । প্রিয় বন্ধু, অনুষ্ঠানের দিন সকালবেলা তোমাদের দুজনকে দেখে যেন মনে হয় , দুটো তাজা গন্ধরাজ ফুল । আরেকটা কথা বলি তোমাকে , অনেকের মতো আমিও নিজের দোষগুলো ধরতে পারিনা , এতটাই সীমাবদ্ধতা আছে আমার চরিত্রে । তবু তোমাকে বলবো — নতুন কবিতার অক্ষরে অক্ষরে কবি বাদল মেঘ যেন সত্যি হয়ে ওঠে । আজ আমার শরীরটা বিশেষ ভালো নেই বন্ধু । তাই চিঠি এখানেই শেষ করছি । কোথাও কারোর সঙ্গে যদি দূরত্ব তৈরি হয়ে থাকে, তবে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে সেই দূরত্ব মুছে ফেলো । তা নয়তো দূরত্বের মধ্যে কোথাও থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসবে একটা পাহাড়।বাকি জীবনেও সেই পাহাড় টপকে আর অন্যদিকে যাওয়া হবেনা ।দেখা হবে । ভালো থেকো। শুভ রাত্রি।
— তোমাদের বন্ধু
অমলেন্দু মন্ডল
বাদল মেঘের মেইল আইডি তে চিঠিটা সেন্ড করেই , কি মনে করে সেটা অমলেন্দু উন্মনাকেও পাঠিয়ে দিল । শরীরে প্যারাসিটামলের আশীর্বাদ কাজ করতে শুরু করেছে । একটু যেন খিদে খিদেও পাচ্ছে। কিন্তু খেতে বসে আলুভাজা রুটি আর ধোকার ডালনাও কেমন যেন বিস্বাদ মনে হল । তাড়াতাড়ি ঘরে এসে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়তেই , চারদিক থেকে জ্বরটা যেন আবার ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপরে । গা হাত পা ব্যথা করছে । যন্ত্রনায় মাথাও ছিঁড়ে যাচ্ছে । ঘরের আবছা অন্ধকারে মা বাবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে, অনুভব করবার চেষ্টা করলো , তার ছোট্টোবেলার জ্বরতপ্ত শরীরটা ঘিরে রয়েছে মা ,বাবা আর দাদা । মা জলপট্টি দিচ্ছে । বাবা পাখার বাতাস করছে। দাদা ওর একটা হাত চেপে ধরে বসে আছে । এই মুহূর্তে নিজেকে ডাকঘরের অমল বলে মনে হল তার । কিন্তু কোথাও সুধার পায়ের নুপূরের শব্দ নেই । যেন বিশ্ব চরাচর সম্পূর্ণ একা করে দিয়েছে তাকে। একা । আদি অন্তহীন একা । স্টেশনের শেষ প্রান্তে অর্জুন গাছটার মতো একা। হাত বাড়িয়ে জলের বোতলটাকেও আয়ত্তের মধ্যে পাচ্ছেনা অমলেন্দু। উঠে বসে যে আরেকটা ওষুধ খাবে , সেই এনার্জিটুকুও তার নেই যেন । মানুষের জীবনে শূন্যতা যে কী ভয়ঙ্কর , তা টের পাচ্ছে সে । সে কী মরে যাচ্ছে ? মানুষের মৃত্যুর আগে চেতনা কি এইভাবেই অবলুপ্ত হয়ে যায় ? অমলেন্দু প্রাণপণে দেওয়ালের ছবির দিকে তাকিয়ে ককিয়ে উঠলো — মা ,মা গো , তোমার ঠান্ডা হাতটা আমার কপালে একটু ছোঁয়াও মা । আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে টের পেল তার ফোন বাজছে । কেউ যেন পাহাড়ের শীর্ষবিন্দু থেকে ফোনের আওয়াজ হয়ে তাকে ডাকছে। অমলেন্দু বুঝতে পারেনা,এটা সত্যি ফোনের আওয়াজ , নাকি , মহাকালের কন্ঠস্বর।ফোনটা বেজে বেজে থেমে যায়। তারপর একটু দম নিয়ে আবার বেজে ওঠে । আবার থেমে যায় । আবার বেজে ওঠে। হঠাৎ অমলেন্দুর অনুসন্ধানী হাত ছুঁয়ে ফেলে ফোনের ভাইব্রেশনকে । আঃ! এই কম্পন তো তার চেনা । ভীষণ চেনা । এই কম্পন তো তার কবিতার নারী উন্মনার বুকের ছোঁয়া লাগা হৃৎস্পন্দন। সমস্ত চেষ্টার শেষবিন্দু দিয়ে অমলেন্দু আঁকড়ে ধরলো ফোনটা । যতটা স্বাভাবিক থাকা যায় , সেইভাবে বলতে চেষ্টা করলো– উন্মনা আমি ভালো আছি। তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরো না। মহারণ্যের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া একটা প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের মতো , আমরা আমাদের কবিতাজন্মকে ঠিক খুঁজে বার করবোই । যতদিন না সেই খোঁজা সম্পূর্ণ হয়, খুঁজে যাবোই । এই আমি , অমলেন্দু মন্ডল , হাল ছাড়বো না । বেঁচে থাকবো,বাকি সবাইকেও বাঁচিয়ে রাখবো। ও প্রান্ত থেকে উন্মনার ভয়ার্ত উদ্বেগ– কবিমন , তুমি তো ভালো নেই । কী হয়েছে তোমার ? জ্বর এসেছে ? আমি জেগে আছি । তোমার কবিতার নারী উন্মনা। দূরত্ব যতই থাকুক,আমার হাতের আঙুল দিয়ে তোমার সমস্ত উত্তাপ শুষে নিচ্ছি । তুমি ঘুমিয়ে পড়ো কবিমন । আমি সারারাত তোমার শিয়রে রাত জাগা প্রদীপের শিখা হয়ে জেগে থাকবো । উত্তরে অমলেন্দু কি কিছু বলবার চেষ্টা করেছিল ? নাকি , চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারলো না , কতগুলো কবিতার মতো শব্দ ছাড়া–
তোমার লাজুক হাতটা… একটু ছুঁতে পারলেই…
নতুন কিছু লিখতে পারতাম…
সত্যি বলছি..
অথচ ,উতল হাওয়া…
তোমার নর্ম ছায়াটাকেও পর্যন্ত…
ভাসিয়ে নিয়ে গেল শাল-দিগন্তে..
ধরতে পারলাম না…বলতেও পারলাম না…
অর্ধেক নয়…নারী তুমি সম্পূর্ণ
আকাশ….
উন্মনার রাত জাগা দুটো চোখ ,হৃদয় তোলপাড় কন্ঠস্বর হয়ে বলতে লাগলো — কার কবিতা ,কবিমন , তোমার ?
অমলেন্দু , না কি অমলেন্দুর ভেতর থেকে অন্য কেউ , জড়িয়ে জড়িয়ে কোনোমতে উত্তর দিলো–জানিনা , সত্যি বলছি উন্মনা ,জানিনা…
জ্বরের ঘোরে , তোমাকে পাগলের মতো জড়িয়ে ধরে , এই শব্দগুলোই আমার গলায় উঠে এলো । আমি জানিনা , সত্যিই জানিনা,এই কবিতা আমার , নাকি অন্য কারোর,অন্য কোনোখানের….
ক্রমশ