অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪৪)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
আমার দাবিকে গুরুত্ব দিতে হবে
প্রাণের মিছিলে হৃদয় মেলবো তবে
জেনো , কবিতায় আঁধারের নেই স্থান
প্রতিটি শব্দে আমূল পরিত্রাণ।
অর্ধেন্দু ভাবেনি এত সহজে অনুষ্ঠানের শুরুতেই মাইক্রোফোন হাতে পেয়ে যাবে। নিজেকে সামলে, অমলেন্দুকে প্রণাম করে সে শুরু করলো–
নমস্কার। আমি অর্ধেন্দু সাহা।
এই জেলার নদী পাহাড় অরণ্য ও মাটির কাছাকাছি মিশে থাকা অর্ধেন্দু । আপাদমস্তক কবিতায় বসবাস করা কবি অর্ধেন্দু । মদ গাঁজার নেশা আমার কাছে তুচ্ছ । কারণ, আমি কবিতার নেশাতে বুঁদ।
সময় নষ্ট না করে , আমি সরাসরি কয়েকটি কথা অমলেন্দু স্যারকে বলতে চাই।
প্লিজ , এই কথাগুলো বলার জন্য আমাকে শত্রু বা বিরোধী পক্ষ ভাববেন না । আপনাদের দলের দু একজনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল ।তাদের কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল যে , আপনার সম্পর্কে এই গোষ্ঠীতে ভালো মন্দ দুরকম আলোচনাই আছে । তবু বলবো, আপনার উপরিতল দেখে এই সংগঠনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি আমি । এবার আপনি ও আপনাদের অভ্যন্তরে ঢুকতে চাই স্যার। আপনার দলে সুন্দর দেখতে ছেলেমেয়ে জুটিয়েছেন, আপনার এলেম আছে । আমি একজন কাঠ বেকার । লড়াই করতে করতে তিরিশের নিচেই নিজের শরীরের কাঠামোটা ভেঙে ফেলেছি । এই অসুন্দরকে সুন্দর আপনারা গ্রহণ করবেন কিনা জানিনা , তবুও আপনাদের কাছে আমি চলে এলাম । পিছন থেকে একজন চেঁচিয়ে বললেন– আপনি ভূমিকাটা বেশি করে ফেলছেন । অযথা সময় নষ্ট করবেন না , আপনার মূল বক্তব্য বলুন ।আমরা অমলেন্দু স্যারের কথা শুনতে এখানে এসেছি । অনেক আলোচনাও আছে। আপনি সংক্ষেপে যা বলার বলুন। সঙ্গে সঙ্গে অমলেন্দু উঠে সবাইকে থামালেন — ওনাকে বলতে দিন । অনেক তর্ক বিতর্কের মধ্যে দিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে । বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অনেক সময় আছে আমাদের হাতে। অর্ধেন্দু আপনি বলুন । একটা ছোট্ট ধন্যবাদ দিয়ে অর্ধেন্দু আবার হারানো কথার খেই ধরলো। অপরাধ নেবেন না স্যার। আপনি নিজে কবি না হয়ে কবিদের সংগঠনের নেতা হলেন কিভাবে ? প্রলয়দা আপনার সততা আর সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পর্কে আমাকে বুঝিয়েছে । বেশ মানলাম , আপনি সাহিত্য বোদ্ধা । কিন্তু ভাষা ও কবিতা নির্মাণের মর্মমূলে যিনি প্রবেশ করেননি , অ থেকে চন্দ্রবিন্দু , একক ধ্বনি থেকে দ্বৈত ধ্বনি,স্বরবর্ণের স্বাভাবিক উচ্চারণ থেকে ব্যঞ্জনবর্ণের আলোড়ন যিনি কাগজে কলমে আনতে জানেন না , তাঁর নেতৃত্ব মানবো কেন ? সৎ ও দারুণ পরিশ্রমী , শুধু এইটুকু তো একজন মানুষের কবি হবার জন্য যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না , তাই না ? কবিদের ও কবিতার একটুকরো ছায়াকে বুকের মধ্যে আগলে রাখবেন একজন প্রকৃত কবি , এটাই তো অভিপ্রেত । আপনি দারুণ অভিনয় করেন , দুর্দান্ত আবৃত্তি করে মাচা কাঁপিয়ে দেন । মঞ্চ থেকে নামলে সবাই আপনার অটোগ্রাফ নেয় , সুন্দরী মেয়েরা আপনার সঙ্গে সেলফি তোলে । কিন্তু স্যার , জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তো আপনার কলমের ডগায় কবিতা হয়ে ঝরে পড়ে না ! তার কি হবে ? একজন প্রকৃত কবির সঙ্গে একজন পারফরমারের পার্থক্য তো থাকবেই । স্যার, কলকাতা থেকে দূরবর্তী জেলাগুলো পর্যন্ত সবাই জানে , আপনি একজন উঁচু দরের বাচিক শিল্পী। সেখানে আপনি মুকুটহীন সম্রাট। আপনাকে আমরা ভালোবাসি ,কারণ আপনি বাংলার কবি ও অসামান্য কবিতার কাছে নতজানু হতে জানেন। আপনার কন্ঠে শব্দ শিল্প হয়ে ঝরে পড়ে । কিন্তু , সরি টু সে– আপনি কবি নন। তাই যদি হয় , তাহলে কি মানতে হবে , কবি নয় , একজন বড় মাপের সংগঠকের ওপর নির্ভর করে আমরা কবিতা জন্মের আশ্রয় খুঁজবো ? গোটা সামিয়ানা জুড়ে পিন পতনের নীরবতা । অমলেন্দু পাথরের মতো চুপ।গলার কাছে চোরা অম্বলের হাতছানি সামলাতে হলো বার দুয়েক । অর্ধেন্দু আবার শুরু করলো — আমি তরুণ কবি শুভব্রতকে বলে আগেই আপনাদের আড্ডায় ঢুকতে চেয়েছিলাম। ইনফ্যাক্ট শুভই আমাকে আপনার মুখোমুখি হবার সাহস জুগিয়েছে ।আমার প্রশ্ন , আপনি নিশ্চয়ই আলোকিত স্বৈরাচারীদের মতো সকলের প্রশ্নহীন আনুগত্য আশা করেন না , কারণ ব্যক্তিগত জীবনে আপনি একজন নির্ভীক ও সৎ সাংবাদিক । কলকাতার একটি দৈনিকের আপনি জেলা করেসপন্ডেন্ট। অনেক প্রলোভনের হাতছানি আপনি অনায়াসে পাশ কাটিয়ে চলে যান। যে কারণে সকলের শ্রদ্ধা পেয়ে থাকেন । কিন্তু সেখানে প্রশ্নহীন আনুগত্যের জায়গা কোথায়? বরং যুক্তিবাদকেই তো মেনে নিতে হবে , তাই না ? স্যার , একটা কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি– এই সংগঠনে আপনার প্রতি কুন্ঠাহীন আনুগত্যের আড়ালে ,বিরূপ সমালোচনাও আছে। উপস্থিত সবার প্রতি আমার এই নিবেদন — আমার সরাসরি বলা এই কথাগুলো আপনাদের পছন্দ না হলে ,অনায়াসে আমাকে এই সভা থেকে বার করে দিতে পারেন। তাতে আমি কিছু মনে করবো না । কিন্ত , তার ফলে আড়ালে ওঠা ফিসফিস মন্তব্যগুলো আরও তীক্ষ্ণ হবে — এটাই জানবেন। সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও স্যারকে প্রণাম। অমলেন্দু শরীর ভরা অস্বস্তি নিয়েও হাসিমুখে এগিয়ে এসে অর্ধেন্দুকে মঞ্চেই পাশের চেয়ারে বসালেন।সামনের সারি থেকে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা। চোখে মুখে ও চেহারায় মেধা ও বুদ্ধির দীপ্তি ফুটে আছে । বললেন — স্যার আমাকে একটা কর্ডলেস মাইক্রোফোন দিলে আমি এখান থেকেই কিছু কথা বলতে পারি। ঘটনার আকস্মিকতায় তাড়াতাড়ি ছুটে আসা উন্মনা , ভদ্রমহিলার হাতে একটা কর্ডলেস মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিলো । মৃদু হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে ভদ্রমহিলা মুহূর্তে মধ্যেই জড়তা সরিয়ে সরাসরি কথা বলতে শুরু করলেন — স্যার,আমার নাম অরুণিমা সাঁতরা । আমি একজন শিক্ষিকা ও আপনার আবৃত্তির গুণমুগ্ধ শ্রোতাও বটে । কলকাতা ও জেলাগুলোতে কিছু কিছু কবিসম্মেলন ও পত্রিকা প্রকাশকে ঘিরে একটা দুষ্ট চক্র কাজ শুরু করেছে বলে আমার স্থির বিশ্বাস। ছুটির দিনগুলোতে দু আড়াই ঘন্টা জার্নি করে গিয়ে , একটি দেড় দু মিনিটের কবিতা বলার জন্য , সকলের কাছে দুশো, আড়াইশো , তিনশো টাকা করে নেওয়া হচ্ছে । একটি ছোট সাইজের পত্রিকার দাম এমন রাখা হচ্ছে যা অনেক তরুণ কবির আয়ত্তের বাইরে। মনে হচ্ছে কবিতা লেখাটা অপরাধ । আমি মাঝে মাঝেই আমার বিচার বুদ্ধি ও শিক্ষা দীক্ষাকে ধিক্কার দিই । বুঝতে পারিনা কিসের আশায় কোন স্বপ্নে বিভোর হয়ে বাংলার তরুণ কবিরা এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন ? কোনো বিশেষ সম্মান পাওয়ার জন্য তাদের আরও আরও টাকা গুণতে হচ্ছে । সরাসরি সাহায্য চাওয়াটা একরকম। কারণ, আমরা জানি , একটা লিটল ম্যাগাজিন বার করতে পয়সার প্রয়োজন হয় । যাদের সামর্থ্য আছে ,তারা দুমুঠো দিলেই সেটা সম্ভব হতে পারে । কিন্তু “প্রি বুকিং ও আমরা সৌজন্য সংখ্যা দিতে অপারগ” — এই বলে কেন সবার কাছ থেকে টাকা তোলা হবে ? আমার প্রশ্ন , এইসব স্বঘোষিত সম্পাদকরা পত্রিকা প্রকাশ না করলে ,বাংলা ভাষাজননী কি না খেতে পেয়ে মরবেন ? নাকি , তিনি এতটাই বধির যে তরুণ কবিদের কান্না তাঁর কান পর্যন্ত পৌঁছোয় না ? বেশ কিছু বড় পত্রিকায় লেখা সত্ত্বেও যখন এই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হই , তখন তৃষ্ণার জল আর মরীচিকার পার্থক্য বুঝতে পারি না , গা গুলিয়ে ওঠে । মনে হয় ছুটির দিনে কবিসম্মেলনে না গিয়ে বাড়িতে বিনি পয়সায় কিছু ছাত্র পড়ালে বোধহয় ভালো হতো। এর থেকে মুক্তির উপায় জানতে চাই স্যার। ব্যাগ থেকে বোতল বার করে একটু জল খেয়ে নিয়ে তিনি আবার বললেন — অর্ধেন্দুবাবুর কথার উত্তরে আমার একটা কথা বলার ছিল। স্বীকার করছি তিনি স্পষ্টবাদী । অপ্রিয় সত্য বলতে ভয় পান না । কিন্তু তিক্ত সত্যকে একটু নরম করে বলবার জ্ঞান তারও থাকা উচিৎ । তিনি কবিতার মানুষ বলে নিজেকে পরিচয় দিলেন । কিন্তু , কবিদের নরম মনটা তিনি হারিয়ে ফেললেন কী করে ? আর উনি , আমাদের অমলেন্দু স্যার সম্পর্কে কতটা হোম ওয়ার্ক করে এসেছেন আমি জানি না । কিন্তু , উনি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন , বেশ বুঝতে পারছি। কিছুদিন ছাত্রের মতো তাঁর সঙ্গে মিশে যদি মন্তব্য করতেন , মেনে নিতে পারতাম। সেটা না করে , উনি সভার শুরুতেই আজকের মূল সুরটা নষ্ট করে দিলেন । আমরা তো এখানে এসেছিলাম বছরের প্রথম রবিবারটায় কোনো কিছু সৃষ্টি করবো বলে । একজন মানুষ রুটি রুজির জন্য যে কোনো কাজ বেছে নিতে পারেন , সেটা তার যোগ্যতা ও বেঁচে থাকার লড়াই । আমরা জানি, বাকি সময়টা শুধু সংগঠন নয় , তাঁর সময় কেটে যায় কবিতার ভাবনায় , কবিজন্মের অন্বেষণে । আমার জানা কোনো ইদানিং কালের কবিকে এই ভাবনায় জারিত হতে দেখিনি । আমি কলেজ ইউনিভার্সিটিতে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলন করেছি । প্রশ্নহীন আনুগত্যের প্রশ্নই ওঠে না। আনুগত্য আসে একজন মানুষের কর্মক্ষমতা ,ব্যক্তিত্ব ও মেধার দক্ষতা দেখে। আমার প্রস্তাব– আমরা অন্তত এক বছরের জন্য এই মানুষটার নেতৃত্বকে মেনে নিই । আমাদের কবি ও কবিতা জন্মের স্বপ্ন আগে ভূমিষ্ঠ হোক। তারপর না হয় সেই সংগঠনের সঠিক অভিভাবককে খুঁজে বার করবো আমরা । অমলেন্দু স্যারকে আমি যতদূর জানি , তিনি নির্দ্বিধায় এই প্রস্তাব মেনে নেবেন । আমি দূর থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে একটা কথা বুঝতে পেরেছি যে , তিনি একজন প্রকৃত নেতা । কারণ, তিনি সবার আগে একজন দক্ষ ও ক্লান্তিহীন কর্মী।
সবাই লক্ষ্য করলো , মঞ্চের উপর অমলেন্দুর চওড়া হাতের মধ্যে অর্ধেন্দুর দুটো হাত। আর ,মঞ্চের সামনে অরুণিমা ম্যাডামের হাত থেকে কর্ডলেসটা নিতে এসে কবিতার নারী উন্মনার দুচোখ ভরা জল।
ক্রমশ