জাতীয় রাজনীতি বা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এই মানুষটির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে , ভবিষ্যতেও থাকবে। ভালো-মন্দ মিশিয়েই মানুষ। কারো কাছে জ্যোতি বসু নায়ক আবার কারো কাছে খলনায়ক। আমি তাঁকে কী চোখে দেখি, সেটাই আজ তাঁর জন্মদিনে মুখ্য বিষয়। জ্যোতি বসু (অনেকের কাছেই) পশ্চিমবঙ্গকে রসাতলে পাঠানোর কারিগর হতেই পারেন, তবু আমার মতে তাঁর মতো ক্যারিশম্যাটিক ও প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতা খুবই কম ভারতীয় রাজনীতিতে। প্রেসিডেন্সি থেকে পাস করে তিনি লন্ডনে থাকাকালীন রজনী পাম দত্তের কাছ থেকে সাম্যবাদে দীক্ষিত হন। তারপর দেশে ফিরে কখনো নেতাজিকে সমর্থন করে ব্রিটিশ পুলিশের রোষানলে আসা, চট্টগ্ৰাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনকে সমর্থন, কখনো নৌবিদ্রোহে অংশগ্ৰহণ, কখনো ছেচল্লিশের দাঙ্গায় গান্ধীজির সাথে দেখা করা, তেভাগা আন্দোলনে অংশ নেওয়া, দেশভাগের বিরোধিতা করা।
স্বাধীনতা এলে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান, রেলওয়ে ইউনিয়নের নেতা, খাদ্য আন্দোলন, ট্রামের ভাড়া বৃদ্ধির বিক্ষোভ কর্মসূচি, কখনো অসুস্থ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভার নেওয়া, বারংবার কারাবরণ।
তারপর ইতিহাস….পার্টির নবরত্নের সদস্যপদ লাভ, বিধানসভার প্রার্থী হিসাবে হারের পর বিরোধী দলনেতা হিসাবে জয়লাভ, উপমুখ্যমন্ত্রী, ১৯৭৭ থেকে ২০০০ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকা-যা রাজনীতির ইতিহাসে লম্বা সময়ের ফ্রেম, বিরল।
মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন জোতদারদের থেকে কৃষকদের জন্যে জমির অধিকার ও সমবন্টন আইনের প্রবর্তন করা (অপারেশন বর্গা) ও কৃষিতে পশ্চিমবঙ্গকে একনম্বর স্থানে তোলা। ত্রিফলা পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রবর্তক, শিল্পেও একনম্বরে বাংলা ওঠানোর কারিগর, বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল সহ একাধিক কল-কারখানা স্থাপন। সড়ক উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথম অবৈতনিক শিক্ষার প্রচলন, দেশীয় শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া, সল্টলেক যুবভারতীর ভিত, আইটি সেক্টরের ভিত্তি, নন্দনের ভিত্তি স্থাপন। পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বিজেপি কৃত দাঙ্গা কোনোদিন হতে দেননি এই মানুষটি। মেরুদন্ড সব সময় সোজা ছিল তাঁর।
জ্যোতি বসুর মতো শার্প মাথার বামপন্থী ইতিহাসে খুবই কম। তাইতো ফিদেল কাস্ত্রো থেকে, নেলসন ম্যান্ডেলা, ইন্দিরা গান্ধী থেকে মাদার টেরেসা, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, অটলবিহারী বাজপেয়ী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, থেকে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় , মিঠুন চক্রবর্তী থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবাই শ্রদ্ধাশীল তাঁর প্রতি।
প্রধানমন্ত্রীত্বের সুযোগ পেয়েছিলেন কিন্তু পার্টি , পলিটব্যুরো প্রথমে তাঁর কাছে, তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্ৰহণ করেননি।
আজ জ্যোতি বসু নামক এই কমিউনিস্ট বিস্ময়কে তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধা।