অ আ ক খ – র জুটিরা

আজকাল আর সময় হয় না ভিড়ের মাঝে খাতা খোলার। ব্যস্ত সময় কেড়ে নিয়েছে অতি-পরিচিত যাপন। আসতে আসতে বেহিসেবি হয়ে উঠেছি বড্ড। এখন আর কোলাহলে ঠিক চেনা সুর বেজে ওঠে না। সারাদিনের শেষ অংশে তাল মেলানো টাই চাহিদা। তবু কখনো ফিরতি পথে ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীর যখন এলিয়ে দি বাসের জানলার গায়ে, চোখ আপনেই বন্ধ হয়ে আসে। মনে মনে ডুবে যাই সেই ফেলে আসা চেনা রাস্তায়। যেখানে কোন পিছুটান নেই, নেই দায়িত্বের বিশাল ভার। খুব চেনা তবুও অচেনা সেইসব পাঠ্য বইয়ের ভেতরে। যেই যেই সকালে বৃষ্টি হতো খুব, অনেক ম্যানেজ করে পাওয়া যেত একটা স্কুল ছুটি। ব্যাস সকালের পড়াশুনা শেষ করেই বসে পড়তাম ডায়েরির মন পাতা নিয়ে। দিনে দিনে যেন নেশা। জানলা দিয়ে বৃষ্টির হালকা ছিটে ফোঁটা এসে চোখে-মুখে লাগত। বেশ লাগতো। আরও কাছে চলে যেতাম জানলাটার। পারলে মুখ রাখতাম ভেজা গ্রিলে। ছোট ছোট জলের ফোঁটারা… আহা! চারিদিকে কালো করে আসা আকাশ আর বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘরের রেডিও তে বাজত কোন এক রবীন্দ্রসংগীত। মনে তখন অনেক ওলি-গলি ভাবনা। ভেবে ভেবে লিখে রাখতাম সব।
আজও খুব বৃষ্টি হচ্ছে। অঝোর ধারায় ঝরছে শ্রাবণ। এখন তো সারাবছরই বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায়। তাই আলাদা কোন অনুভূতি ও নেই। তবুও বৃষ্টি তো বৃষ্টিই হয়। শুধু সেই ডায়েরির বাঁকি থাকা কিছু পাতা ফাঁকাই রয়ে গেছে। ধুলোর আস্তরণ জমেছে মোটা কভার টার ওপর। এক টাকা দু-টাকা জমিয়ে কেনা গোলাপ গুলো বাদামি বর্ণ নিয়েছে। রেডিও তে আর রবীন্দ্রসংগীত বাজে না এখন।
– দিদি নামুন চলে এসেছে।
– চোখ খুললাম। গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে তো। তাই বাস থেকে নেমে পড়লাম। ছাতাটা আনতে আজ ভুলে গেছি। ছোটবেলায় ইচ্ছা করেই ভুলে যেতাম ছাতাটা যাতে একটু বৃষ্টিতে ভেজা যায়। আজ সত্যিই ভুলে গেছি। যেই বৃষ্টি পড়লেই ভেজার ইচ্ছা হতো, আজ সেই বৃষ্টিই বেশ অস্বস্তির কারণ। তবু আজ আর বাঁধা দিলাম না। ধীরে ধীরেই হাঁটলাম অটোর দিকে। গাঁয়ে বেশ বৃষ্টির শিহরণ। ভালোই লাগছে। অটোর কাছে আসতেই শুনলাম কোথাও একটা বাজছে “শ্রাবনের ধারার মত পড়ুক ঝরে/পড়ুক ঝরে”। কোথায় বাজছে তাকাতেই দেখলাম লাইনের তৃতীয় নম্বর অটোতে সাউন্ড বক্স এ বাজছে। লোক নেই একটাও। ছাড়তেও মনে হয় বেশ দেরি হবে।
– দিদি একজন? এইদিকে আসুন, এদিকে। এখুনি ছাড়বো।
লাইনের প্রথম অটোটা পুরো ভর্তি শুধু একজন প্রয়োজন। তাড়াতাড়ি পৌছানোও যাবে। তবু পা বাড়ালাম তৃতীয় নম্বরের দিকেই।
– ও দিদি কি হলো? বললাম তো এদিকে। ও দিদি….
কোনদিকে না তাকিয়ে উঠলাম গিয়ে সেই অটোটায়। শরীর টা এলিয়ে দিলাম সিটে।
-কি হলো দিদি আগের অটোটায় গেলেন না? এটা ছাড়তে কিন্তু অনেক দেরি হবে।
দেরি হলে আমার অসুবিধা নেই। তুমি যাবে তো! তাহলেই হবে।
-আচ্ছা তবে বসুন।
ভাই শুনুন। সাউন্ড এর ভলিউম টা একটু বাড়িয়ে দিন প্লিজ।
“যে শাখায় ফুল ফোটে না/
ফল ধরে না একেবারে,/
তোমার ওই বাদল-বায়ে দিক জাগায়ে/
সেই শাখারে।/”……………