ঘাড়ের উপর অঙ্ক পরীক্ষার জুজুবুড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। দিদির মুখ গম্ভীর ,অথচ আমাকে ওর কাছেই ফটো তোলার কথাটা পাড়তে হবে । বাবাকে দিয়ে দিদিই অ্যাপ্রুভ করাবে ; তারপরে, রাত আটটার আগেই আদ্যাপীঠের সামনে সাহাদার স্টুডিওতে ছুটতে হবে। কতো কাজ, কত অঙ্ক — অথচ দিদি আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না । অঙ্ক পরীক্ষা তখন আমার মাথায় উঠেছে ,ও যা হয় হবে। সোমবার তো পরীক্ষা, আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেবো।এখন আসল কাজ আমার ছবি তোলা ।সার্টিফিকেটে আমার ছবি থাকবে! ভাবা যায় ! জিতলেও থাকবে, হারলেও থাকবে ! কিন্তু আমার সাহস যদি শেষ পর্যন্ত বাবার তিন হাত আগে গিয়ে আটকে যায় ! তখন কী হবে ? দিদিকে টপকে বাবা পর্যন্ত যদি পৌঁছতে না পারে ? তখন ? আর এই জায়গাটায় দিদি আমাকে সুন্দর, বেশ সুন্দর করে খেলায় । মাকে বললাম চুপি চুপি — ওমা , এখন তো সবে অক্টোবর মাসের গোড়া ! বাবা তো আর বলতে পারবেনা যে , মাসের শেষ… এখন হবে না ! আমার তো ছবিটা তুলতেই হবে । দিদি কোন সময় পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে জানতে পারিনি ।গম্ভীর মুখে বলল , ওসব মাকে দিয়ে হবে না । বাবাকে একমাত্র আমিই বলতে পারবো। তুই আমার পায়ে হাত দিয়ে তিনবার প্রণাম কর; আর প্রতিজ্ঞা কর ,জীবনেও আমার মুখে মুখে তর্ক করবি না।তাহলে আমি ব্যাপারটা ভেবে দেখতে পারি ।
বাড়িটা আজ ফাঁকা ফাঁকা । দাদা নেই, মণি মামাও চলে গেছে ।বাবা কখন ফিরবে কে জানে ! দিদির কাছে ঝাড় খেয়ে চুপচাপ অঙ্ক নিয়ে বসলাম । মা পড়ার টেবিলে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে সামান্য জলখাবার রেখে বলল–ভাবিস না, একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে । শিখা যখন বলেছে, বাবাকে ঠিক ম্যানেজ করবে ।তুই মন দিয়ে অঙ্ক কর । এবার আমি সত্যি সত্যিই ভ্যা়ঁ করে কেঁদে ফেললাম। তাই বলে দিদি আমাকে তিন-তিনবার প্রণাম করাবে ? ভেবেছে কি? একদিন বড় হয়ে আমি যদি এর শোধ খুলতে না পারি, তাহলে পাড়ার কুকুর জিমিকে আমার নামে ডেকো । মা বুঝলো, কোথাও আমার প্রেস্টিজে লেগে গেছে। দিদিও এখন আশেপাশে ঘুরঘুর করছে, কিছু একটা বলে ড্যামেজ কন্ট্রোল করবে বলে….
এরকম পরিস্থিতিতেই বোধহয় ক্রিকেটের হিন্দি ধারাভাষ্যকাররা বলে থাকেন — স্থিতি বহুৎ গম্ভীর হ্যায় । যখন ইংল্যান্ডের লর্ডসের মাঠে টেস্ট ক্রিকেটে, শূন্য রানে ভারতের দু দুটো উইকেট পড়ে যায় , তখনই ওই রকম বলা হয়। আমাদের বাড়ির পরিস্থিতি এখন অনেকটা সেইরকম। এইসব আবোলং তাবোলং যখন ভাবছি , হঠাৎ শুনি বাড়ির একশো গজ দূর থেকে বাবার বিখ্যাত পাম্প-শ্যু’র মচ মচ মচ মচ পাড়া কাঁপানো আওয়াজ । আমার বাবার ফুটবল খেলার জীবনে ডান পায়ে একটা চোট আছে । তাই বাঁ পায়ের উপর একটু বেশি ভর দিয়ে হাঁটে ; আর তাতেই জুতোর একটা অদ্ভুত শব্দ হয় ।একটা মচ একটু বেশি , আরেকটা একটু কম। আর মা সেটাকেই ঠাট্টা করে বলে — ওই আসছে দশ-আনা, ছ-আনা, দশ-আনা, ছ-আনা….
তার মানে এক্ষুণি গেট খুলে বাবা ঢুকবে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই তো কাঠ হয়ে গেলাম। বাবাকে একটুও ভয় করিনা ; অথচ, এত ভয় লাগে কেন ? এটা কি আমার অসুখ ? আজ কিন্তু সব ভয় ভেঙে দিলো বাবা । ঘরে ঢুকতে ঢুকতে — ওগো শুনছো , গরম গরম তেলেভাজা এনেছি। আমি বুঝে গেলাম — অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট । সব শুনে বাবা হো হো করে হেসে বলল , ওরেব্বাবা ! দারুন ব্যাপার ! আমাদের ছোট কর্তা ফাইনাল ম্যাচ খেলবে ! তাও আবার চুনী গোস্বামীর সামনে ! তার ওপর আস্ত একটা সার্টিফিকেট পাবে ছবি সমেত ? যা যা শিখা, এক্ষুণি ছবি তুলিয়ে আন।স্টুডিও বন্ধ হয়ে যাবে ,তাড়াতাড়ি যা !
দিদির সঙ্গে প্রায় উড়তে উড়তে চলে গেলাম সাহাদা’র স্টুডিওতে। সাহাদা ক্যামেরা ঠিক করতে করতে বললেন– মুখে হাসি আনবি কিন্তু । আর তখন আমার অলরেডি বত্রিশ পাটি অলআউট ! শেষ পর্যন্ত প্রবলেমটা যে এভাবে সলভ হয়ে যাবে, ভাবতেই পারিনি ! সাহাদা’কে টাকা-পয়সা বুঝিয়ে দিদি এবার আমার মান ভাঙানোর জন্য আদ্যাপীঠের গেটের সামনে দাঁড়ানো ফুচকাওয়ালার থেকে গুণে গুণে ছয়-সাতটা করে ফুচকা নিজেও খেলো, আমাকেও খাওয়ালো।
ফেরবার সময় পাড়ায় ঢুকতেই, ডানদিকের লম্বা ঝিলের হাওয়া আমাকে ডেকে বলল — সোমবার কোনরকমে অঙ্ক পরীক্ষাটা দিয়ে নে, তারপর তো মহালয়ার দিন বিকেলে ফুটবল ফাইনাল খেলা রে পাগলা ! আর, তারপরেই তো দুগ্গাপুজোর ঢাকের আওয়াজ…
ব্যস ! দিদির সঙ্গে মুহূর্তেই ভাব ভাব ভাব ভাব ভাব ….