অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৫১)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
ছেড়ে যাওয়া নয়,চলে যাওয়া
নয়,
ঢেউ হয়ে ফিরে আসা;
কবিতা জন্মে উপহার দেবো,
বাবুই পাখির বাসা !
যে বাড়িতে শান্ততা নিবিড় হয়ে উঠোনে ,ঘরে ,ক্যালেন্ডারের পাতায় , ভোরের আলো আর রাতের তারা হয়ে লেগে থাকে ; সে বাড়িতে গরম ভাতেও মাধুকরীর সুগন্ধ থেকে যায়। দুপুরে যেমন তেমন একটু খাওয়া হয়েছিল,তাতে মন ভরেনি। আজ অনেকদিন পরে রাতে খুব তৃপ্তি করে গরম ভাত খেলো অমলেন্দু। তার একা থাকার জীবনে এমন গার্হস্থ্য সুখ খুব কমই মেলে। সেদিন বৈশাখী ঝড়ে হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল রাত দশটা নাগাদ।মেঘের গর্জন আর মিনিট দশেকের কালবৈশাখীর হালকা ঝড় বয়ে গেল । অনেক অনেক দূরের সাগর থেকে, কিছুটা দূরে পাহাড় জঙ্গলের দিকে আশ্চর্য এক সোঁদা গন্ধ যেন হঠাৎ বৃন্তচ্যুত কচি আমের গন্ধে মিশে গিয়ে,হারানো ছেলেবেলার সুবাস ফিরিয়ে আনলো। রান্নাঘরের ফুটন্ত ভাতের সৌরভকে সাক্ষী রেখে অমলেন্দু তোয়াকে শোনালো গোগল,তুর্গেনিভ, আর গোর্কির গল্প ।শোনালো জুলেভার্নের গল্প। শোনালো ভূতের মত অদ্ভুত কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা। তোয়াও কিছুটা বুঝলো , অস্তিত্বহীন ভূতের গা শিরশির অনুভূতি আসলে মানুষেরই উর্বর কল্পনা মাত্র ! তবু ,ঝড়ের পর জানলা দিয়ে হালকা বৃষ্টি ভেজা বাগানের দিকে তাকাতে ওর একটু ভয় ভয় লাগছিলো। অমলেন্দু যেন শিশু হয়ে ,কিশোর হয়ে শোনালো– রবীন্দ্রনাথের নৌকাযাত্রা , বাউল আর বীরপুরুষ । তিনটে কবিতাই বিড়বিড় করে বলে গেল তোয়া। তারপর ওর কিশোরী হাত দুটো নেড়ে নেড়ে শোনালো , সুকান্তের কবিতা — এক যে ছিল । মা মৃত্তিকা শোনালো রজনীকান্তের গান — তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করে , মলিন মর্ম মুছায়ে…
আর উন্মনা ? সে কি করলো ? কিচ্ছু না । শুধু চুপ করে বসে মাঝে মাঝে চায়ে চুমুক দিতে দিতে সব কিছু শুনলো । অমলেন্দু বুঝতে পারছিল বিগত সন্ধ্যার আবেশটুকু তার কবিতার নারী ঝড়ের পরে পড়ে থাকা কচি আমের মতোই কুড়িয়ে নিচ্ছিল। আঁচলে বেঁধে রাখছিল বাকি জীবনের সঞ্চয় হিসেবে । রাত বারোটা নাগাদ গ্রামের এই বাড়িটি নিস্তব্ধ নিঝুম হয়ে গেল।বাইরের দরজা ভেজিয়ে দুটো হালকা চেয়ার নিয়ে উঠোনে এসে বসার আয়োজন করতেই সামনে পড়ে থাকা হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া দড়ির খাটিয়াটার ওপরে ধপ করে বসে পড়লো উন্মনা। অমলেন্দুকেও পাশে বসতে বললো । ইতস্তত করে অমলেন্দু বসলো । উন্মনা হেসে বললো — এই দড়ির খাটিয়ায় আমি ,বাবা মা কতদিন বসে গল্প করেছি। বাবা চলে যাওয়ার পর আমি ,মা আর তোয়া অনেক রাত পর্যন্ত বসে থাকি এখানে । সামনের চেয়ারে পা তুলে বসো ,তাহলে কাদা জল লাগবে না। চারদিক থেকে একটা ভেজা বনজ গন্ধ উঠে আসছিল । অমলেন্দুর মনে হচ্ছিল এটাই যেন শালজঙ্গলের নিজস্ব গন্ধ । গেটের বাইরের পল্লীর রাস্তায় কোনো জনমানব নেই। গোটা গ্রাম নিঃশব্দ নিঝুম। ওরা অনেকক্ষণ হাতে হাত রেখে বসে থাকলো । গ্রীষ্মের দীর্ঘ রাতের একটা গোটা প্রহর কেটে গেল । মেঘ সরিয়ে আকাশে তারা ফুটলো । একসময় উন্মনার মনে হল অমলেন্দুর নিঃশ্বাসটা একটু জোরে পড়ছে । তার কবিমনের হাতদুটো আরো নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিয়ে উন্মনা বললো — চলো এবার বিশ্রাম নেবে কবিমন । সারাদিন অনেক ধকল গেছে ।
শুভ রাত্রি জানিয়ে অমলেন্দু শুতে গেল উন্মনার ঘরে । মৃত্তিকা, উন্মনা আর তোয়া আরেকটা ঘরে সবাই মিলে শুয়ে পড়লো। মাঝে ভারী পর্দা , মাঝে দরজার আড়াল । মা মৃত্তিকা তোয়াকে কোলের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। উন্মনার দুচোখ থেকে ঘুম যেন উধাও হয়ে গেছে। দড়ির খাটিয়ায় বসে দুজনের মনে মনে যে কথার আদান প্রদান হয়েছে, সন্ধ্যায় পাহাড়ি টিলার কাছে যে অনুভবের দেওয়া নেওয়া হয়েছে ,তারই গভীর ভাবনায় ডুবে গেল সে। একটু পরে পাশের ঘর থেকে পুরুষালী নিঃশ্বাসের শব্দে কি একটু অস্বস্তির আভাস ? উন্মনা বারবার সেই শব্দের আভাসটুকু শোনবার চেষ্টা করলো । তার কবিমনের শরীর কি খারাপ লাগছে ? একটা কথা নিশ্চিত যে কবিমনের হার্টের অবস্থা ভালো নয় । শহরের বড় ডাক্তার নিশ্চয়ই দীর্ঘ চিকিৎসার কথা বলবেন। ভর সন্ধ্যার আবেশে , পাথরের উপর বসে , ঘুমন্ত তোয়াকে পাশে রেখে , সে উঠে এসেছিল অমলেন্দুর একেবারে বুকের মধ্যে । এই প্রথম সে বুঝেছিল পুরুষের স্বাভাবিক সান্নিধ্যে মিশে থাকে তার ব্যক্তিত্বের অমোঘ আকর্ষণ। এই প্রথম সে অনুভব করেছিল , পুরুষ স্পর্শের আশ্চর্য উন্মাদনা। এই প্রথম তার মনে হয়েছিল , নারী পুরুষের প্রাণবন্ত ভালোবাসা , দুটো শরীরের দুকুল ভাসানো উচ্ছ্বাসে মিশে থাকে। আজ সন্ধ্যায় দুজন শিক্ষিত এবং সংযত নারী-পুরুষ তাদের স্বাভাবিক সান্নিধ্যটুকুই শুধু পেয়েছিল । উত্তাপ পেয়েছিল। ভেসে যায়নি, ডুবেও মরেনি। তাতে উন্মনার দুকুল ছাপিয়ে গিয়েছিল প্লাবিত ভালোলাগা আর ভালোবাসায় । বেশ কিছুদিনের বিবাহিত জীবন তাকে শরীর ভরা বৈধ কামনা বাসনা দিলেও, যা দেয়নি তা হলো –সর্বগ্রাসী ভালোবাসার ব্যাপক তীব্রতা। স্বামী প্রাণতোষের স্বাভাবিক নির্লিপ্ততাই হয়তো এর কারণ।তার মনে পড়ে গেল কিশোরী বেলার কথা । তার মা-বাবার যৌথ জীবনের একটা অদ্ভুত ঘটনার কথা। সন্ধেবেলায় দুজনের মধ্যে কোন একটা সাংসারিক বিষয় নিয়ে কিছুটা বাদানুবাদ হয়েছিল । মা একটু বেশি চেঁচামেচি করে ফেলেছিল । সেদিন রাতে , বাবা নিঃশব্দে ঘর পেরিয়ে বারান্দার মেঝেতে শীতলপাটি বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল । কিশোরী উন্মনার কান্না পেলেও সে চুপ করে ছিল। অনেক রাতে ঘুম ভেঙে দেখেছিল– ঘর থেকে বারান্দায় যাবার দরজায় , মাথার বালিশ দুহাতে চেপে ধরে, দেয়ালে হেলান দিয়ে মা এক দৃষ্টিতে ঘুমন্ত বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পেরেছিল, মা অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাবা গভীর ঘুমে ডুবে গিয়েছে বলে মাকে লক্ষ্যই করেনি। এই চিত্রটা সে পরিণত বয়স পর্যন্ত বুকের মধ্যে রেখে দিয়েছে । আজ হঠাৎ তার মনে হলো, যে মানুষটা দুপুরবেলায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, এখনো তার স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি ।হয়তো ভবিষ্যতে চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। এই মুহূর্তে তার নিঃশ্বাসের শব্দটা স্বাভাবিকভাবে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে না। উন্মনার মনে হলো , দরজা ও পর্দার ওই অহেতুক বাধাটুকু পেরিয়ে নিঃশব্দে তার কবিমনের কাছে পৌঁছে যেতে। মাথায় হাত বুলিয়ে , ভালোবাসা দিয়ে , স্নেহ দিয়ে তাকে স্বাভাবিক ঘুমের দেশে পাঠিয়ে দিতে । ভূতগ্রস্তের মতো অনেকক্ষণ অন্ধকার বিছানায় উঠে বসে থাকলো উন্মনা। তার পাশে নিথর হয়ে ঘুমোচ্ছে মা ও মেয়ে। পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে তার কবিমন ।কোন সুদূর বিপুল তরঙ্গ থেকে তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে বয়ে চলেছে পুরনো একটা গান — ঘুমালো রাতের চাঁদ মেঘের শয়নে ওই ,পৃথিবী ঘুমায় , শুধু আমি একা জেগে রই….
মা অনেকদিন গুনগুন করে গেয়েছে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের এই সুন্দর গানটা । আজ হঠাৎ ওঠা বৈশাখী ঝড়ের পরে , হালকা বৃষ্টিস্নাত রাতের গভীরে তার সেই কথাগুলোই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল । আচ্ছা , তার কবিমন যদি সত্যি সত্যি কবিতা লিখতে পারতো ! চেষ্টা করে নয়, যদি তার অন্তর তাকে কবিতা লিখতে বাধ্য করতো ; তাহলে কবিমনের কথাগুলো কেমন হতো ? হঠাৎ উন্মনার সারা অনুভূতি ছেয়ে গেল নতুন কবিতা লেখার ইচ্ছেতে।
মোবাইলের আলোয় খাতা পেন টেনে নিলে উন্মনা। সারাদিনের প্রচন্ড পরিশ্রম পেরিয়ে ,আশ্চর্য রাতের বৃন্তে এসে ঘুমিয়ে না পড়ে, খাতার পাতায় একটা একটা করে শব্দ যেন গুহাচিত্রের মত এঁকে দিতে লাগলো। কবিতার নাম দিলো –
তুমি তুমি তুমি !
তারপর একটানা লিখে গেলো–
তুমি একা দগ্ধ মাঠে ছায়াময়ী বটের নিভৃতি ,
আমি যেন দলছুট ক্লান্ত অশ্বারোহী সেই পাগল দুপুরে;
তুমি মেঘ নেমে আসা স্বপ্নে পাওয়া জলসত্রতলা ,
আমার পৌরুষ স্তব্ধ ঝুমঝুম তোমারি নূপুরে ।
তুমি সেই মাঠময় ফুটে থাকা দীর্ঘ দীর্ঘ সাইকেল পথ !
আমি তো পথের ধারে ভোর থেকে প্রতীক্ষা কৈশোরে ;
আমার লাজুক চিঠি যাবে তোর ঘামে ভেজা বুকে ,
পড়াশুনো সব লাটে , ঠোটে ঠোঁট উন্মনা , প্রেমের বেঘোরে!
তুমি সেই তাড়া খাওয়া বিবর্ণকে নম্র চোখে লাগাম পরালে ।
তুমি দিলে গান তার ভাঙা কণ্ঠে
পায়ে পায়ে চলার মিছিল ।
তুমি দিলে সব কুঁড়ি , কচি পাতা, ফুটে ওঠা মগ্ন প্রতিশ্রুতি ;
তুমি দিলে ব্যর্থতার শেষ রাতে, অসমাপ্ত কবিতার অনিবার্য মিল !
তুমি তুমি তুমি আজও সবুজ গালিচা পাতা বুকখোলা অবারিত মাঠ ,
আমি যেন উদ্ভাসিত জয়– পরাজয়হীন কবিয়াল ভারত সম্রাট !
ক্রমশ
অসাধারণ