অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ১৭)

শাল জঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
ভালোবাসার নবান্ন খাই,আলতো রোদের কাছে ,
চিরদিনের অন্ন আজও ছোট্ট গোলায় নামে।
মুছে দিতে পারেনি কেউ পৌষ পাবনের হাসি,
আমার বাংলা নরম রোদে ,অবুঝ সবুজ গ্রামে।
দেখতে দেখতে নতুন বছরের দিন পনেরো পেরিয়ে গেল।পৌষের শেষাশেষি বাড়ির ছোট্ট মেয়ে করতোয়া ইস্কুল থেকে কতগুলো পিঠের নাম মুখস্থ করে এলো। খাতার পাতায় আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা পিঠের নামগুলো মাকে লুকিয়ে দিম্মার কাছে দেখাতেই মৃত্তিকার সেকি লুটোপুটি হাসি ! পড়ানোর থেকে ফিরে চায়ের কাপ নিয়ে বসা উন্মনাকে ডেকে তাড়াতাড়ি বললো–ওরে দ্যাখ দ্যাখ , তোর মেয়ে কত পিঠেপুলির নাম শিখে গেছে ! মেয়ের লেখার ভুলগুলো নরম চোখের উন্মনা মনে মনে ঠিকঠাক করে , জোরে জোরে পড়তে শুরু করলো– পাটিসাপটা,মুগপুলি,দুধপুলি,গুড়পিঠে, সরুচাকলি,সরাপিঠে ,ভাপাপিঠে ,গোকুল পিঠে। দিম্মা মৃত্তিকা গালে আঙুল ঠেকিয়ে এমন ভাব করলো যে , তোয়া দিম্মার নিঁখুত অভিনয়ে ভেসে গেলো আর বায়না ধরলো–এবারে তাকে পিঠে খাওয়াতে হবেই । কাজেই , নাতনির মান রাখতে মৃত্তিকা এবার খোলস ছেড়ে গাছকোমর বেঁধে যেন কুড়ি বাইশ বছরের শ্বশুরবাড়ি মাতানো নতুন বৌ হয়ে গেলো। পৌষ সংক্রান্তির দিন তিন চার আগে থেকে বিউলির ডাল বেটে বড়ি দেওয়া , আর রসবড়া দিয়ে শুরু হল পৌষ পাবনের উৎসব । তারপর একে একে পাটিসাপটা,মুগপুলি , ভাপা পিঠে ,সরুচাকলি,নলেন গুড়ের পায়েস ….
মেয়ের ছাত্রছাত্রী আর নাতনির বন্ধুরা কলা পাতার পাতে আশ মিটিয়ে পিঠে খাচ্ছে–এই স্বর্গীয় দৃশ্য অ্যান্ড্রয়েডের ক্যামেরায় বন্দি করতে করতে, পিঠেপুলি তৈরির হাত ধুয়ে উন্মনা তার বইয়ের তাক থেকে বার করলো — বিভূতিভূষণের শ্রেষ্ঠ ছোটোগল্প। নিজের ঘরের ছোট্ট একান্তটুকুতে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে মন ডুবিয়ে দিল পুঁইমাচা গল্পে । যেখানে , মা অন্নপূর্ণা রান্নাঘরের লম্ফ দোলানো অভাবের সংসারে সরুচাকলি পিঠের জন্য চালের গুঁড়োর গোলা তৈরি করছে । দুই কিশোরী কন্যা পুঁটি ও রাধী পৌষ পাবনের ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে অকালে চলে যাওয়া বিবাহিত দিদি খেন্তির কথা ভাবতে ভাবতে বেদনায় নীল হয়ে যাচ্ছে । উন্মনা ভাবতে চেষ্টা করে — মানুষের অব্যক্ত বেদনার ভাষা , প্রিয়জনের বিয়োগবেদনা এমন করে ভাবতে পারেন আর কোন কথাশিল্পী ! রান্নাঘরের দাওয়ায় শিশুদের কলকণ্ঠ থেকে মন তুলে নিয়ে জানলার বাইরে নিঝুম অন্ধকারে তাকিয়ে উন্মনার মনে হয় ,আজ এই মুহূর্তে যদি অরণ্যের দেবতা বিভূতিভূষণ পথ ভুলেও অন্তত তাদের বাড়ির উঠোনে হাজির হতেন , তাহলে উন্মনা তার নারীজন্ম উপুড় করে কলাপাতায় সাজিয়ে দিতো নবান্নের আয়োজন , সেই মানুষটির সামনে ; যিনি আশ্চর্য সুন্দর সব ছোটোগল্প লিখে গেছেন–তালনবমী,মৌরীফুল,কিন্নর দল ,একটি ভ্রমণ কাহিনী , আহ্বান, কুশলপাহাড়ী….
অনেক রাতে, যখন ঘুমন্ত মেয়ের ঠোঁটে তখনও নবান্নের স্বপ্ন লুটোপুটি খাচ্ছে , আর ওঘর থেকে মায়ের গলায় গুনগুন করছে টুসু গান–আমার টুসু ধনে,বিদায় দেবো কেমনে….
সেই মুহূর্তে রাতের গভীর বৃন্ত ছিঁড়ে উন্মনা কবি হয়ে উঠলো । ইদানিং রোজ রাতে খাতার পাতায় কিছু অন্তত না লিখে সে ঘুমোতে পারে না। আচ্ছা,কাকে দেখাতে চায় সে ? প্রজাপতির পাখার রঙই বলো আর হাওয়ায় দোলা ফুলের ঢঙই বলো, সবই তো আসলে নিজেকে মেলে ধরার জন্য ,তাই না ? উন্মনা তার কবিতার খাতা কার সামনে উপুড় করতে চায় ? স্বামী প্রাণতোষ তো তেমন কবিতা প্রেমিক মানুষ নন ! তাহলে ?
কবি শুভ ও প্রলয়কে ? ধুস। ওরা তো উন্মনা কিছু লিখলেই খুশিতে উপচে পড়ে। সে খুশিতে প্রশ্রয় থাকে। নির্মোহ আলোচনার আলোটা থাকে ,চোনা থাকে না । তবে ? বাঁকুড়া , বিষ্ণুপুর ,ঝাড়গ্রাম , মেদিনীপুরের নামী কবিদের ? না না, তেমন কোনো ইচ্ছেও তো তার নেই। পোস্ট মর্ডান নাকি উত্তর আধুনিকতা ? কবিতার দশকের পর দশকের চুলচেরা বিশ্লেষণ ? গোষ্ঠীবদ্ধ পিঠ চুলকোনি । তাদের কাছে শোনাবে ? নাঃ! উন্মনা তো ওদের মতো এত জ্ঞানীগুণী নয় । মনে পড়লো বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটিতে সহপাঠী মেয়েদের কবিতা পড়ে , একদল আঁতেল কবি টিপ্পনি কাটতো মহিলা কবি বলে , যেন কবিতা লেখাটা পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার । আর বাড়িতে মা তো মাটির মতো সহনশীলা । তার চোখে তো মেয়ের জন্য শুধু দুকুল ভাসানো জোছনা । খাতার পাতায় লেখা লাইনগুলোর দিকে তাকিয়ে উন্মনা ভাবে –কলেজ ইউনিভার্সিটিতে এইসব শব্দগুলো কেন তার কলমে আসতো না ? যারা তাকে আলগা বেপাত্তা বা ইচ্ছাকৃত তাচ্ছিল্য করতো ,তারা কি খুব একটা ভুল করতো ? আজ চল্লিশের কাছাকাছি বয়সে পৌঁছে উন্মনার মনে হয়,মাত্র একুশ বছর বয়সে বাংলা ভাষার দিক দিগন্তকে কাঁপিয়ে দিয়ে, আলোড়িত করে ,কবি সুকান্ত তো পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন। তাহলে ? উন্মনা কেন পারলো না ?
হঠাৎ মন খারাপ কাটাতে , নিজের অতীত ব্যর্থতার গ্লানি সরিয়ে, কিছুক্ষণ আগে লেখা নিজের কবিতার লাইনগুলোর ওপর হঠাৎ চোখ পড়ে যেতেই চমকে উঠলো উন্মনা। এখনও কবিতার নাম দিয়ে উঠতে পারেনি সে। কিন্তু পড়তে গিয়ে মনে হলো ,তার কবিতার শব্দগুলো কেমন যেন ছিটকে ছিটকে উঠছে । ছন্দের মধ্যে একটা মজা উঠে আসছে । যেন রবিঠাকুরের বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান–এর মতো অনেকটা । মনে মনে মাকে একটু গাল টিপে আদর করে দিলো এই ভেবে যে , মা যদি টুসু গান না গাইতো ,তাহলে আমার কবিতাটা লেখাই হতো না হয়তো ! এবার সে একটু জোরে জোরেই নিজের কবিতা পড়তে শুরু করলো।
একটু শিশির,একটু উষ্ণ,একটু চালের গুঁড়ি;
হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি আমার, হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি…
আমার চোখে তোর জোড়া চোখ পাগল অনর্গল,
নতুন গুড়ের গন্ধ ঠোঁটে, হিমে ভিজবো,চল।
ও টুসু , আয় পলাশ ডালে ,গাঁয়ের সাঁঝবেলাতে,
প্রথম ছোঁবো,জ্বর বাধাবো,জাউয়ের ফ্যানা ভাতে।
চাঁদ ভাসাবো ধানের গোলায়, তোর মেঘলা চুলে,
সাতজন্মের ভাব আড়ি ভাব –তুই যাস না ভুলে…
টুসু আমার কাঁসাই জলে পঞ্চদশী মেয়ে,
রূপ ফোটাবো পাপড়ি হয়ে মকরের গান গেয়ে।
হাতের ওপর চাঁপাকলি ডুবলে সূয্যিমামা,
টিউশনি তো যাবিই টুসু,
দাঁড়া, সাইকেল থামা…
তোর সঙ্গে লুটুরপুটুর, ঘর বাঁধবো বাবুই পাখি,
বুকের মধ্যে জোনাক জ্বেলে সত্যি , তোকে ভীষণ ডাকি!
কন্ঠিবদল পাহাড় বনে,
ঘর ভাঙি আর হাওয়ায় দুলি;
হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি আমার হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি…
রূপ ফুটবে পাপড়ি হয়ে, সবার গোলায় ধান;
টুসু আমার কাঁসাই জলে
ভালোবাসার গান।
কবিতাটা পড়বার পর , এখনকার প্রজন্ম বা তার নিজের মেয়েও যেমন শূন্যে ঘুষি চালিয়ে চিৎকার করে ওঠে –ইয়েস বলে , তেমনই ছেলেমানুষি করে বসলো উন্মনা । পাশের ঘরে সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর , ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়া মা মৃত্তিকাকে ডেকে তুলে শোনাতে ইচ্ছে করলো উন্মনার । সঙ্গে সঙ্গে সেই ইচ্ছেটাকে দমন করলো। কাল সকালে চায়ের আসরে শোনাবে। মনে মনে আওড়াতে থাকলো — হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি আমার হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি । সঙ্গে সঙ্গে আবার শূন্যে মুঠি চালিয়ে দিয়ে বললো– ইয়েস , পেয়ে গেছি কবিতার নাম । লঘু পায়ে বাথরুমে যেতে যেতে রান্নাঘরে একবার উঁকি দিলো। পড়ে থাকা পায়েসের হাঁড়িতে তখনও জমাট ক্ষীর লেগে আছে । আঙুল ডুবিয়ে সেই ক্ষীর দু’একবার চেটে নিয়ে নাচের ছন্দে ফ্রিজ খুলে ফেললো উন্মনা । মায়ের হাতে তৈরি একটা হিমঠাণ্ডা মুগপুলি মুখে পুরে এমনভাবে দুপাক নেচে নিলো , যেন হিমালয়ের কোনো দুর্গম শৃঙ্গ জয় করে ফেলেছে ! আর ঠিক সেই মুহূর্তে ওর মনে পড়লো অমলেন্দুর মুখটা । স্যার কি এই মুহূর্তে জেগে আছেন ? ল্যাপটপে অফিসের কাজে ব্যস্ত ? নাকি ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন ? স্যারের বাড়িতে কে কে আছেন,তাও তো জানা হল না। ফোন বাজলে যদি বিরক্ত না হন,তাহলে এই মুহূর্তে নিজের কবিতাটা শোনাতে ইচ্ছে করছে স্যারকে। পরক্ষণেই ওর চিন্তার আকাশে চেরাপুঞ্জির মেঘ ঢুকে গেল যেন । সাংবাদিক অমলেন্দু মন্ডলের দুনিয়াটা অনেক বড় । সেখানে হাজার মানুষের ভিড় । আমার মুখটা স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মনে না থাকারই কথা । আচ্ছা , বাসের টিকিটের পেছনে লেখা আমার ফোন নম্বরটা স্যার কি আদৌ গুছিয়ে রেখেছেন বা মোবাইলে সেভ করেছেন ? বাসের শেষ পাদানি থেকে মাটিতে পা রাখার পরেই তো অনৈতিহাসিক টিকিটটা মুহূর্তে অতীত হয়ে যায়। আচ্ছা , আজকে কেউ ওনাকে ডেকে পিঠে খাইয়েছে ? মা আছে ওনার ?
পরদিন মাঘ মাসের প্রথম সকালে , সদ্য অতীত হয়ে যাওয়া পৌষের আশ্চর্য অদ্ভুত একটা সুগন্ধ যেন তখনও লেগে আছে… চা খেতে খেতে মা মৃত্তিকা পরপর তিনবার শুনলো তাঁর আত্মজার লেখা নতুন কবিতা । মায়ের চোখে অদ্ভুত একটা নতুন আলো। চিরদিন কম কথা বলা মৃত্তিকা যেন চোখের ভাষায় বলছে–ও মেয়ে , তোকে খুব অন্যরকম লাগছে যে ! দুষ্টু প্রজাপতির মতো এ ঘর ও ঘর উড়ে বেড়ানো করতোয়া কখন যেন রেডিও চালিয়ে দিয়েছে । মান্না দের গানে গোটা সকাল , সোনালি রোদ , দূরের মাঠ , জঙ্গল , আর শুশুনিয়া থেকে অযোধ্যা পাহাড় অব্দি হেসে উঠছে ! একটা হালকা ফুরফুরে হাওয়া ভেসে এসে তিনটি নারীজন্মের চোখের পাতা কাঁপিয়ে দিচ্ছে ! আহা ! মান্না দে ! চিরদিনের মান্না দে !
সে বাতাস বাঁশি কি গো বাজাবে,
সে আবেশ মনে মনে সাজাবে,
বোঝা আর না বোঝার কাছাকাছি
কোনো গান, ভালো আর বাসবে কি কখনও ….
পৌষের কাছাকাছি রোদ মাখা সেই দিন ফিরে আর আসবে কি কখনও
খুশি আর লজ্জার মাঝামাঝি সেই হাসি
তুমি আর হাসবে কি কখনও…
ক্রমশ