অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ১৮)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
তোমাকে অনেক কথা মনে মনে বলি
তোমার পথরেখায় শব্দহীন চলি
তুমি এলোমেলো করো যে দিনযাপন
পিরিতি পরম নিধি কেন অকারণ ?
শিশিরের ঝরে পড়ার যেমন কোনো শব্দ নেই, একটুকরো কাগজেরও মেঝেতে লুটিয়ে পড়া তেমনি নিঃশব্দ। অমলেন্দু অন্যমনস্ক হয়ে মানিপার্সে কিছু একটা খুঁজছিল ; কখন যে একটুকরো কাগজ পার্সের জেলখানা থেকে বেরিয়ে আকাশে ডানা না মেলে মেঝের ওপর পড়ে থেকে পুরোনো ফ্যানের হাওয়া খাচ্ছে , অমলেন্দু টেরই পায়নি। ভাগ্যিস কোনো কোনো চিরকুট মাটিতে পড়েও ঝরে পড়া শেষ শিউলির মতো তাকিয়ে থাকে ! তাকে এড়িয়ে চলে যাওয়া যায় না , যাওয়া সম্ভব হয়না । তাই মহাজাগতিক অনিবার্যতায় অমলেন্দুর চোখ হঠাৎ আটকে গেল সেই টুকরো কাগজের দিকে। সাংবাদিক অমলেন্দুর অভিজ্ঞ বুকও ছ্যাঁৎ করে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে। আরে , এটা তো ভীষণ চেনা একটা পুরোনো বাসের টিকিট। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কুড়িয়ে হাতে তুলে নিতেই তার চোখ দুটো শিশুর সারল্যে হেসে উঠলো–উন্মনার ফোন নম্বর ! অমলেন্দুর বিশ্ববিখ্যাত কুঁড়েমির জন্য ফোন নং টা মোবাইলে এতদিনেও সেভ করা হয়নি । আবিশ্ব বাঙালীর করছি করবো , যাচ্ছি যাবো ভাবটা ঘরানা ও পরম্পরায় অমলেন্দুর মধ্যেও গেঁথে গেছে। ফোন নম্বরটা সেভ করতেই ওর চোখ চলে গেল দেওয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে । অমলেন্দুর ক্যালেন্ডারের পাতা এখনো নভেম্বর মাসেই আটকে রয়েছে । টেবিলে গুটিয়ে রাখা গার্ডার দেওয়া নতুন ক্যালেন্ডার দেওয়ালে টাঙাতেই ঝকঝকে জানুয়ারি মাস হেসে উঠলো । সেখানে ছোট্ট করে লেখা একটি বাংলা মাসের তারিখ। পয়লা মাঘ , জানান দিলো –ওহে বুড়ো সাংবাদিক , জানলাটা খুলে দিলেই আমগাছের ডালে প্রথম কোকিলের ডাক শুনতে পাবে , কিন্তু পাতার আড়ালে তাকে দেখতে পাবেনা। অমলেন্দুর কাজে বেরোনোর কোনো ঠিকানা থাকে না বলে , কোনো ঠিকে কাজের লোক রাখা যায় না । ঘর ঝাঁট দেওয়া , টুকটাক বাসন ধোওয়া , হাত পুড়িয়ে চা তৈরি করা ,তারপরে কোনোমতে তৈরি হয়েই স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়া । দিনের খাওয়াটা যেখানে হোক খেয়ে নেয়। বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই যে বাজার এলাকা , যেখানে সারা বছর ডিজেতে বাজে — পাপ্পা ক্যাহতে হ্যায় বড়া নাম করেগা থেকে জীবনে কী পাবো না,ভুলেছি সে ভাবনা…
আর চায়ের দোকানে ল্যাপটপ নিয়ে বসলেই জুটে যায় পাগলা বিন্দাস , যে অমলেন্দুকে দেখলেই দুটো চায়ের সাথে দুটো লম্বুর অর্ডার দিয়ে দেয় , আর হাতের একতারা চায়ের দোকানের টেবিলে রেখে গুণগুণ করে ধরে–আবার কই মাছটা মারছে কাঁটা পরান যায় জ্বলিয়া রে,কী মাছ ধরেছো বঁড়শি দিয়া,ও গুরুজী কী মাছ ধরেছো বঁড়শি দিয়া…
সারাদিনের অক্লান্ত কাজের পর এইটুকুই সান্ত্বনা যে তাকে রান্না করে খেতে হয়না।্পাশের কোনো বাড়ি থেকে চাবি নিয়ে এসে মৃদুভাষী রান্নার দিদি রাতের খাবারটুকু বানিয়ে টেবিলে রেখে নিঃশব্দে চলে যায় । খাবার জলটাও চার পাঁচটা বোতলে ভরে যত্ন করে সাজিয়ে রেখে দেয়।
চায়ের কাপ আধখাওয়া অবস্থায় সরিয়ে রেখে ফোন নংটা প্রথমে সেভ করলো অমলেন্দু । তারপর কল করতেই রিং টোনে একটা মিষ্টি গান বেজে উঠলো–আমি আপন করিয়া চাহিনি,তবু তুমি তো আপন হয়েছো, জীবনের পথে ডাকিনি তোমায় , সাথে সাথে তবু রয়েছো…
বিষাদসঙ্গীত হলেও অমলেন্দুর সকালের মনের কোণে কোণে আলো জ্বেলে দিলো ,আশা ভোঁসলের এই গান। অমলেন্দুর মনে পড়ে গেল ,ছবিটা সে দেখেছে। সুচিত্রা সেন আর বসন্ত চৌধুরীর ছবি–মেঘ কালো। রিং টোনের সীমারেখার প্রায় শেষ প্রান্তে গিয়ে ফোন তুললো ওপ্রান্তের কেউ — হ্যালো ,কে বলছেন ? শব্দে শব্দে কণ্ঠে যেন সন্তুর বেজে উঠলো , নাকি জলতরঙ্গ ! অমলেন্দু নার্ভাস হয়ে যায়–হ্যালো , আমি অমলেন্দু মন্ডল । চিনতে পারছেন ? আপনি তো উন্মনা। ওপ্রান্ত থেকে আবার ছোট্ট ঝর্ণার কলকাকলি–ওহ স্যার , আপনি আমার ফোন নংটা গুছিয়ে রেখেছিলেন ? কেমন আছেন আপনি ? আপনার সব খবর ভালো তো ? অমলেন্দু অনেক যত্ন করে আবেগ চেপে রেখে জবাব দিলো — সব খবর ভালো । অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট । ও প্রান্তে উন্মনা হেসে ফেললো — এরিখ মারিয়া রেমার্কের বিখ্যাত যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস — বাংলা অনুবাদে মা পড়িয়েছিল ছোটোবেলায়। স্যার , আপনি সত্যি আমাকে মনে রেখেছেন ? অমলেন্দু সরাসরি তার কোনো জবাব না দিয়ে বললো — আমার দিগন্তে এখন আর কোনো সিগারেটের ধোঁয়া বা গন্ধ কোনোটাই নেই কিন্তু।
— সে কি ? আপনি সত্যিই ধুমপানের নেশা ছেড়ে দিয়েছেন ?
— হ্যাঁ।একশোর চেয়েও দশ পার্সেন্ট বেশি সত্যি । আমি এখন সম্পূর্ণ নেশাহীন একজন মানুষ । রুটিরুজির কাজ ছাড়া একটা কবিতা –নাটকের সংগঠন গড়ে তুলবো বলে মনে করছি। আপনার সহযোগিতা পাবো ?
— আমার সহযোগিতা ? যদি পারি , নিশ্চয়ই করবো। স্যার , আপনি নিউজ কভার করতে আমাদের গ্রামের দিকে আসবেন না ?
— কেন বলুন তো ?
— এমনিই বললাম। আমার মা মেয়ে সবাইকে আপনার গল্প করেছি। বলুন না, এদিকে আসবেন কিনা ?
মাঝে মাঝে মানুষের কোনো হৃদয় বার্তা বাতাসে বা শব্দ তরঙ্গে সহজ নদীর স্রোতের মতো ভেসে আসে। অমলেন্দুর মনে হল — উন্মনা তাকে সুন্দর করে মনে রেখেছে। সে এবার একটু সাহসী হলো।
— আপনাকে আমারও অনেক কথা বলার আছে । সঙ্গে প্রলয় ও শুভব্রতকেও পেলে ভালো হতো । কিন্তু ওদের দুজনেরই আলাদা রকমের ব্যস্ততা । আচ্ছা আপনি কি জেলা শহরের দিকে আসেন ? বাঁকুড়া বা মেদিনীপুর ?
— নাঃ ! আমার জীবন খুবই নিস্তরঙ্গ। তাছাড়া মার শরীর ভালো যাচ্ছে না। মেয়ের লেখাপড়ার চাপ বাড়ছে। এই তো দেখুন না , বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটি থেকে আমার মাস্টার্সের সার্টিফিকেটটাই নেওয়া হয়নি । যাবো যাবো করেও যেতে পারছি কোথায় ?তবে ভাবছি , ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে যেভাবেই হোক একবার যাবো। স্যার , আপনি কি ইউনিভার্সিটির খবর কভার করেন ? আসেন ওদিকে ?
— অবশ্যই আসি। এগুলো আমার কাজের মধ্যেই পড়ে। কবে আসবেন,জানাবেন প্লিজ। আমি ঐদিন যাওয়ার চেষ্টা করবো।
— অবশ্যই জানাবো স্যার। এটাই আপনার নম্বর তো ?
— হ্যাঁ এটাই আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। অফিসের কাজের জন্য আরেকটা নম্বরও আছে। আপনি এটাই সেভ করে রাখুন । তাহলে সামনের মাসের প্রথম সপ্তাহেই তো ? সত্যি আসবেন ?
যাবো — উন্মনা ছোট্ট ও সুনিশ্চিত জবাব দিলো। আপনার জন্য অনেক কথা জমা হয়ে আছে স্যার । আপনার কবিতার কর্মশালা থেকে ফিরে এসে , মাঝে মাঝে, কবিতা লেখার পুরোনো অভ্যেসটা ঝালিয়ে নিচ্ছি । জানি , প্রলয় বা শুভব্রতর মতো লিখতে পারবোনা , তবু চেষ্টা করি । আচ্ছা স্যার ,একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ?
— বলুন।
আপনার কবিতা কোনো পত্র পত্রিকায় দেখিনা কেন ?
অমলেন্দু দীর্ঘশ্বাস গোপন করে । জানেন উন্মনা , আমি কবিতা লিখতে পারিনা , কিন্তু কবিতাকে অনুভব করতে পারি । এ জীবন তো খড়কুটো কুড়িয়েই গেলো । তাই , ভালো একজন পাঠক হবার চেষ্টা করছি। পরের জন্মে কবি হবো।
— আপনি পরের জন্মে বিশ্বাসী ?
— একটুও না ।ওসব আষাঢ়ে গল্পে আমার বিশ্বাস বা আগ্রহ কোনোটাই নেই।
— তাহলে যে বললেন –পরের জন্মে কবি হবো ?
— ওটা রোমান্টিক তন্ময়তা । না পারার বেদনা থেকে বলা। কবিরা আসলে অমৃতের পুত্র। জানেন , আমার ভীষণ বিস্ময় লাগে– কোন আলোকে প্রাণের প্রদীপ জ্বেলে জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থ লিখেছিলেন ?
— স্যার,এই আশ্চর্য সুন্দর কথাগুলোই বলে দিচ্ছে , আপনি কবির অন্তরে থাকা কবি।
অমলেন্দু এবার লজ্জা পেয়ে গেলো — থাক ওকথা। আপনার লেখা দু একটা লাইন শোনান।
উন্মনা যেন এই কথাটার জন্যেই প্রতীক্ষা করছিল।
খুব ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করলো —
একটু শিশির,একটু উষ্ণ,একটু চালের গুঁড়ি;
হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি আমার, হৃদয় খোঁড়াখুঁড়ি…
আমার চোখে তোর জোড়া চোখ পাগল অনর্গল,
নতুন গুড়ের গন্ধ ঠোঁটে, হিমে ভিজবো,চল।
ও টুসু , আয় পলাশ ডালে ,গাঁয়ের সাঁঝবেলাতে,
প্রথম ছোঁবো,জ্বর বাধাবো,জাউয়ের ফ্যানা ভাতে।
চাঁদ ভাসাবো ধানের গোলায়, তোর মেঘলা চুলে,
সাতজন্মের ভাব আড়ি ভাব –তুই যাস না ভুলে…
কবিতাটা শেষ করে , একটু থেমে বললো — জানাবেন না কেমন লাগলো ? অমলেন্দুর অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছিল । শুধু বলতে পারলো — ভালো লেগেছে। আরো যে কথাগুলো বলতে পারলাম না , দেখা হলে বলবো। সামনের মাসের প্রথম সপ্তাহে আসবেন কিন্তু। মনে থাকবে তো ?
দু’একটা মুহূর্ত অনন্তকালের মতো বয়ে যেতে লাগলো । ওরা দুজনেই ফোন ধরে আছে। কেউই — আচ্ছা রাখছি , বলে ফোনটা কেটে দিতে পারলো না।
সময় বয়ে যেতে লাগলো।
সময় বয়ে যেতে থাকলো…
ক্রমশ