অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৩৩)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
সব কথা শেষ হলে ,চলো ঘরে যাই…
কবিতার পরমান্নে মিলবো সবাই ;
কথা দাও ,দেখা হবে জীবনে- জীবনে ,
দৃষ্টি-বৃষ্টি মিশে যাবে স্নিগ্ধ উচ্চারণে।
গোপগড় টিলার মাথায় একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের সাদামাটা খাওয়াটাও জমে গেল কারো কারো নম্র দৃষ্টিতে ,আর পাগল বিন্দাসের অনর্গল রসিকতায়। খাওয়া শেষ করে আবার ওরা ফিরে এলো গাছের ছায়ায়।আসলে , একটা অস্বস্তি সকলের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেটা হল — কবিতা যাপনের আগামী সমবেত জীবনটা কেমন করে চলবে ? উন্মনাই হয়তো তিথির চেয়েও একটু বেশি চিন্তিত ছিল । কারণ , সে অনুভব করেছিল , তার কবিমন অন্তরঙ্গে যতটা কবি ,বহিরঙ্গে ততটা অভিভাবক হয়তো নন। যাঁকে ঘিরে তার কবিতাজন্মের স্বপ্ন , সেই অমলেন্দু কী আদৌ পারবে উন্মনার অতীত জীবনের তিক্ততা ভুলিয়ে দিতে ? কবিতা নিয়ে আগামী দিনের জন্য তার কোনো মাস্টার প্ল্যান আদৌ আছে তো ? মাটির দিকে তাকিয়ে একমনে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে তার মনে হচ্ছিল–স্বামী প্রাণতোষকে পুরোপুরি ছেড়ে এসে , এই মানুষটার হৃদয়ে সে বাসা বাঁধতে পারবে তো ?
না না , ফ্ল্যাটবাড়ির খাঁচা-জীবন নয়,উন্মনার স্বপ্ন তো বাবুই পাখির বাসার মতো একটা স্বপ্নের আশ্রয়,একটা সত্যিকারের নীড় ! অমলেন্দুর সঙ্গে যৌথ জীবনে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে না তো ? কবিতাজন্ম মানে তো তার কাছে ,কমিউনের সংসার জীবন নয় , তিথি হয়তো ঠিকই বলেছে । সাধারণ জীবনের মধ্যেও একটা দারুণ রোমান্টিক ও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্তর থাকে, সোনালি দুঃখ থাকে , গোপন ব্যথা থাকে,মাঝে মাঝে অতল নির্জনতা থাকে । সন্তানের প্রতি অপত্য স্নেহ ও কর্তব্যবোধ থাকে। মা বাবার বার্ধক্যের প্রতি সজাগ অনুভূতি আর অন্তহীন ভালোবাসা থাকে । অর্থনৈতিক বা যে কোনো কারণেই হোক , যৌথ পরিবার বা সাম্যবাদী কমিউন , কোনোটাই চিরজীবী হয়নি। প্রতিনিয়ত পরীক্ষা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও সবশেষে সঠিক সিদ্ধান্ত ; এইভাবেই তো সমাজ সামনের এগিয়ে চলে। তাছাড়া, কবিতাজন্মের নিশ্চিত অন্ন জুটে গেলে, খাওয়ার শেষে কবিতার পরিবর্তে ভাতঘুম আসবে না তো ? প্রাণচর্চার তীর্থস্থান শেষ পর্যন্ত কর্মনাশা নেশার আখড়ায় পরিণত হবে না তো ? বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই কথাগুলোই উন্মনা সবার সামনে ধীরে ধীরে মেলে ধরলো ! উন্মনার বক্তব্য শেষে সবাই বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলো । অপরাহ্ন ক্রমশ পশ্চিম দিকে হেলছে। অমলেন্দুর মধ্যে একটা সন্ন্যাসীপ্রতিম স্তব্ধতা আছে। উন্মনা বুঝে উঠতে পারছিল না , তার বক্তব্যে অমলেন্দু উদ্বুদ্ধ হলো না ঝিমিয়ে গেল ? শুভ সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করলো — আমি অনেকবার সিরিয়াসলি চেষ্টা করে দেখেছি ,সরকারি চাকরি আমার ভাগ্যে জুটবে না। তাই আমি কবি ও কবিতার আশ্রমিক জীবনেই বিশ্বাসী। জানি , মন লাগিয়ে , ধ্যান দিয়ে লিখতে পারলে একদিন আমার বই অনেক বিক্রি হবে।আমার একা থাকার জীবনে সেই অর্থ আমি এই আশ্রমে দান করবো । নারী নয় , আমার জীবনের একমাত্র প্রেম কবিতা। আমি আপনাদের মতো হাফ হার্টেড,
হাফ প্রফেশনাল হতে চাইনা । আমাকে ক্ষমা করবেন। প্রলয় একমনে সব কিছু নোট করছিল। সেই দিকে তাকিয়ে অমলেন্দু বাদল মেঘকে বললো — কবি, এবার তোমার পালা । তোমার মতামত জানাও । বাদল মেঘ কোনো ভূমিকা না করে জানালো — আমিও লেখার জগতে প্রফেশনাল হতে চাই। তা না হলে , গোটা জীবনটাই না ঘরকা না ঘাটকা হয়ে থাকতে হবে । যে কোনো কাজে ফুলটাইমার হতে না পারলে তাতে সফলতা আসতে পারে না । রাধার কাছেও শ্রীকৃষ্ণ ষোলো আনা ছাপিয়ে আঠারো আনা চেয়েছিল। তার মানে, একেবারে ফুল সাবমিশন। কবিতা আমার কাছে সেই অন্তরঙ্গ আত্মসমর্পণ চেয়েছে এবং আমি তা দিতে রাজি ।তিথি , আমি তোমাকে একটা কথা জানাতে চাই– তুমি প্লিজ আমার সঙ্গে সংসার জীবনের স্বপ্ন দেখো না । আমাকে ভালোবাসলে , আমার কবিতাজন্মের শতছিন্ন,তালি মারা জীবনটাকেও ভালোবাসতে হবে । সেটা কি তুমি পারবে ? অমলেন্দু লক্ষ্য করলো , কবি বাদল মেঘের কথাগুলো শুনতে শুনতে তিথির সুন্দর মুখটাতে কেমন যেন নিবিড় বিষণ্ণতা আর জেদি কাঠিন্য জমা হয়েছে । প্রাণপণে সে চোখের জল সামলাচ্ছে। তিথির মুখের দিকে তাকিয়ে বাদল মেঘ হঠাৎ চুপ করে গেল। আর ঠিক সেইখান থেকেই কবি প্রলয় তার বক্তব্য শুরু করলো — আমি আগেও বলেছি,অন্য রাজ্যে আমার জন্য এমন একটা চাকরির অফার আছে ,যার সঙ্গে কবিতার কোনো দূরতম সম্পর্কও থাকবে না । অথচ আমি কবিতাকে ঘিরে আমার বাংলাতেই থাকতে চাই । আমার সংসার প্রতিপালনের জন্য একটা স্থায়ী রোজগার দরকার। তার সঙ্গে এই কবিতা জীবন ও কবিতার সংসার সুন্দর করে চালানোর জন্য আমি যে কোনো কাজ করতে রাজি আছি , যদি অমলেন্দুদা আমাকে উপযুক্ত মনে করেন । আমার মনে হয় ,আমরা কেউই বিশাল দূরত্বে থাকি না, কাজেই সপ্তাহের শেষে , আমরা একটা গোটা দিন রাত্রি কাটিয়ে আবার কর্মজগতে ফিরে যেতে পারি। মাসে দুমাসে একবার করে কবিতার ওয়ার্কশপ, আলোচনা বা সেমিনারের বন্দোবস্ত করতে হবে , যেখানে কোনো মননশীল কবি শুধুমাত্র কবিতার টানে এসে আমাদের পথনির্দেশ দেবেন । বাচিকশিল্পীরা এসে কবিতার প্রয়োগ কৌশল অর্থাৎ আবৃত্তির সঠিক ভাবনা আমাদের মধ্যে চারিয়ে দেবেন।প্রান্তিক জেলার কবিরা প্রায়ই সঠিক উচ্চারণের সমস্যায় ভোগেন, মাইক্রোফোন ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারার ফলে তাদের কবিতা নিবেদন হয়তো প্রার্থিত মাত্রায় পৌঁছতে পারেনা; বাচিকশিল্পী বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা প্রতিনিয়ত শিখবো এই বিষয়টা । আর, আমরা আবৃত্তিশিল্পীদের বোঝাবার চেষ্টা করবো যে, আবৃত্তিযোগ্য কবিতা বলে কোনো কথার বাস্তবতাই নেই। যে কোনো একটি সুন্দর কবিতা সঠিক উচ্চারণ, কন্ঠমাধুর্য ও ভাবপ্রকাশের মধ্যে দিয়ে বোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাই বাচিকশিল্পীদের প্রধান কাজ।কবি ও বাচিকশিল্পীদের মধ্যে এই বোধ ও বন্ধুতা যেন চিরস্থায়ী হয়। এটাই হবে আমাদের কবিতা জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। কবিতা লিখে প্রফেশনাল হবার কথা আপাতত না হয় পাঁচ বছরের জন্য তোলা থাক। আসুন আমরা কাজটা শুরু করি।
পাগলা বিন্দাস, গানের বিন্দাস,সবসময় বিন্দাস হয়ে থাকা মানুষ বিন্দাস যেন এই মুহূর্তটার জন্যেই অপেক্ষা করছিল।তার সুরেলা কন্ঠ গেয়ে উঠলো– ভালোবাসি ভালোবাসি,এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি, ভালোবাসি ভালোবাসি…. গানের নেশার সবাইকে বুঁদ করে দিয়ে হঠাৎ গানটা আচমকা থামিয়ে বললো — আমি কবিতা বুঝি না। কিন্তু সেই কবিতা গান হয়ে গেলে আমি বুঝতে পারি।তাই মিটিংএর কেউ না হয়েও , এই কথাটাই বলতে চাই– ভালোবাসা থাকলে ,পাথর কুঁদে মা অহল্যার মুখও ফুটিয়ে তোলা যায় , আর বাঁজা গাছও ফুলে ফুলে ছয়লাপ হয়ে যায় । সবথেকে বড় কথা , আমার গুরু অমলেন্দু স্যার যেখানে আছেন , সেই কুটিরের বেড়ার ধারে বন কলমীর নীলচে ফুলে কবিতা ফুটে উঠবেই । ভোরের আলো ভরে যাবে খোলে আর খঞ্জনীতে।বলেই আবার গেয়ে উঠলো — জাগো রে এই নগরবাসী,মুখে জয় রাধা শ্রীরাধা বইল্যা পোহাইলো নিশি…
বিন্দাসের গান শুনতে শুনতে উন্মনার মনে হচ্ছিল , গোটা যুদ্ধবাজ,রক্তপাতের দুনিয়া যেন এই মুহূর্তে মানুষ বিন্দাসের ধুলোমাখা পায়ের কাছে দুটো শিমুল ফুল রেখে , মাটিতে লুটিয়ে বলছে — ক্ষমা করো ক্ষমা করো।
যেন নিজেকেই শোনাতে চেয়ে বিকেলের আকাশের দিকে মুখ তুলে স্নিগ্ধ উন্মনা, কবিতার উন্মনা নিজের লেখা কবিতায় বলে গেল–
না থাকুক পলাশের ডালে মুক্ত হাওয়া
বাকি থেকে যাক কিছু চাওয়া আর পাওয়া
তবুও কলম কালি মন
লেখে,লিখে রাখে দিনক্ষণ,
তুচ্ছতার উর্ধে ইতিহাস হয়ে যাওয়া
না পেলাম দুধে-আমে সাংসারিক সুখ
দু’জোড়া ঠোঁটের ভালোবাসা উন্মুখ
তবু ব্যর্থতার শেষে
ভেসে যাবো নিরুদ্দেশে
যে দিগন্তে নতজানু যন্ত্রণার সুখের অসুখ
যদি সব নাও হয় স্বচ্ছ,অবিরত ;
ক্ষরণ-বিন্দুতে,রক্তে,
হৃদয়ের ক্ষত ;
বলির শোণিতে ভাসে পথ
থামবে না আঠারোর রথ
দিনগুলো ফিরে পাবো
যেন ঠিক কবিতার মতো…
তিথির দুহাতে উন্মনার দুটো হাত , তিথির দুচোখে নিবিড় মুগ্ধতা।বাকি সবাই যেন চিত্রার্পিত ! বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অমলেন্দু বললো–বিকেল হয়ে এলো।সকলের বাড়ি ফিরতে হবে। আজকের মিটিং কি এখানেই শেষ করবো আমরা ? তিথির দুহাতের মুঠো থেকে নিজের হাত দুটো আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে উন্মনা প্রাণপণে বলে উঠলো–না না ,তা কি করে হয় ? আমরা আপনার কথা শুনবো না ? আমাদের সকলের মাথার ওপর তো আপনিই রয়েছেন।আপনি কিছু বলুন ।
ক্রমশ