ভিজে পাতাগুলো ঘুমোবার আগে
কাকে ডাকে কেউ জানে ?
শুধু হিম-হিম প্রথম শিশির কেঁপেছিল থিরথির;
শুধু রেলগাড়ি ফিরে চলে গেলে নিঝুম ইস্টিশানে
নটে গাছটিতে লেখা হয়েছিল রূপকথা পৃথিবীর….
দিদি ,এই দিদি দিদি — লক্ষ্য করেছিস মার দুষ্টুমিটা ! জানে আজকে আমার ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলা আছে, মাঠ থেকে ফিরতে দেরি হবে ; তবু আজকের দিনের লক্ষ্মীব্রতটা আমাকে দিয়েই করাতে হবে ? আমি বেশ অভিমানের সুরে বললাম। কথাটা শুনে দিদির নির্লিপ্ত উত্তর — আমি কি করে বলব ? আজকে তো বেস্পতিবার, মায়ের লক্ষ্মীপুজোর দিন । আর তোকে মায়ের গরদের শাড়িতে খুব সুন্দর দেখায়, যখন শাড়িটা ধুতির মত করে পরিয়ে দেয় মা। তোকে যা দেখায় না কি বলবো ঝন্টু !
ক্লাস ফাইভে পড়লেও আমি এসব চালাকি বুঝে গেছি। আমিতো কোন বেস্পতিবারেই সন্ধেবেলায় লক্ষ্মীপুজো করতে অস্বীকার করিনা। আজকে সেই নওদাপাড়ায় ফুটবল টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল। মা জানে সবকিছু ,তবুও আজকের দিনটা কি ম্যানেজ করে দিতে পারেনা ? না, করতে পারে না — রান্নাঘর থেকে মায়ের উত্তর । এতক্ষণে বুঝলাম, ঘাপটি মেরে মা সব শুনছিল। কেন পারেনা ? আমি গরদের শাড়ি ধুতি করে পরতে পারি ,আর দিদি গরদের শাড়ি পরে লক্ষ্মীপুজো করতে পারে না ? মেয়েরা এত লক্ষ্মী,তুমিই তো বলো।
ওই যে বললাম না ,দুষ্টুমিতে মা আমাদের তিন ভাইবোনের ওপরে যায়। হঠাৎ গুনগুন করে গান ধরল — আমারে বাঁধবি তোরা, সেই বাঁধন কি তোদের আছে ?
তার মানে বকলমে বলে দিল — খেলতে যাবি , ফিরে এসে পুজোটাও করবি। মায়ের কথা শুনে দিদির কী হি হি হাসি ! দেখ কেমন লাগে ! তুই ব্যাটা ফুটবল খেলে খেলে বেড়াবি , আর আমি বসে বসে লক্ষ্মীপুজো করবো ? মা তোকে সিলেক্ট করেছে, তুই করবি । ব্যাস ! আর কোন কথা হবেনা ।
বিকেল তিনটের মধ্যে মাঠে পৌঁছতে হবে ।বাবা হেডস্যারকে চিঠি লিখে রিকোয়েস্ট করেছে , আমাকে দেড়টায় হাফছুটি করে দিতে। সেমিফাইনাল ম্যাচ বলে কথা ! আকাশে বাতাসে পুজো লেগে গেছে । অথচ আমাদের স্কুলের টার্মিনাল পরীক্ষা এখনো শেষ হয়নি। আচ্ছা পরীক্ষা আর ফুটবল , দুটোর মধ্যে এত বিরোধ কেন বল দেখি দিদি ? হেড স্যারের সে কি গম্ভীর মুখ ! জানে আমি স্কুল কেটে সিনেমায় যাচ্ছি না। বনহুগলীর কাছে নতুন সিনেমা হল অনন্যা সবে খুলেছে । আর সেখানে নুন শো’য় হিট হিট সব বাংলা-হিন্দি সিনেমা । স্কুলের উঁচু ক্লাসে দাদাদের আর কে দেখে ! পাঁচিল টপকে বারোটা তিনটে শো দেখে তারপর আবার ফিরে এসে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করছে । ভাবা যায়!
আর আমি ? ক্লাস ফাইভের এক পয়সা আধ পয়সার ছেলে । আমার ফুটবল ছাড়া আর কি আছে ? মাঝেমধ্যে ক্লাসে চিৎকার করে গেয়ে উঠি– সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল ..
প্রত্যেক শনিবার স্কুল ছুটির পর লাফ মেরে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ি ।শেষ পর্যন্ত স্কুলের দপ্তরি লক্ষ্মীদা এসে সবগুলোকে বাড়ি পাঠায় আর থলে বোঝাই করে চার-পাঁচটা ফুটবল নিয়ে স্কুলের দিকে গজগজ করতে করতে পাড়ি দেয়। আমরাও আবার স্কুল ব্যাগ নিয়ে ভালো মানুষের মতো যে যার বাড়ি ফিরি। বাড়ি কি আর এমনি ফিরি ? ওই এঁড়েদা মাঠ থেকে বাড়ি পর্যন্ত এক কিলোমিটার পথ যে কোনো একটা ঢিলপাটকেল বুটের ডগা দিয়ে মারতে মারতে, মাঠ থেকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসতে হবে — সেটাই কম্পিটিশন । আমার বুটের ডগাটা এমনভাবে ছিঁড়তে হবে, যাতে বাবা পুজোর সময় নতুন জুতো কিনে দিতে খুঁতখুঁত না করে । আর জুতো বলে জুতো ! একেবারে বাটার সুপারটাফ বা জুনিয়ার বুট । যাইহোক হেডমাস্টারমশাইকে মাঝেমধ্যে আমরা রেগে গেলে হেডু বলে ডাকতাম। সেই হেডু আজ হাসিমুখে হাফছুটির চিঠিতে সই করে দিতেই –ওরে আমায় কে আর পায় ! চালাও পানসি বেলঘরিয়া..থুড়ি থুড়ি… নওদাপাড়া…..