অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৩৬)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

কেন ঘুমহীন জেগে আছো কবিমন ?
কেন এই অহেতুক তোলপাড় ?
কেন তুমি মন খারাপের এই বৃত্তে ,
রক্তক্ষরণের কাছে নতজানু হলে ?
কেন ? কেন ঘুমহীন তুমি ?

বসন্ত শেষে গ্রীষ্ম আসছে , তাই ভোরের আলোও যেন কিছুটা তাড়াতাড়ি পৃথিবীর ঘুম ভাঙাচ্ছে । তিথির ফোন শেষ হবার পরে একটু একটু করে , বড় বিষাদের মতো ঘুমহীন এই রাত উষার উঠোনে পৌঁছে গেল ।‌ নেট অফ করতে ভুলে গেছিল অমলেন্দু। তার অতি সাধারণ জীবনযাপনে , সাংবাদিকতার চাকরিতে স্মার্টফোনে মাসিক নেটের আয়ু বাঁচিয়ে রাখা খুব জরুরি । ঘুম না আসায় তিথির কথা ভাবছিল সে। একবার উঠে উঠোনের দরজা খুলে , শেষ রাতকে প্রশ্ন করেছিলো , মানুষের এই অন্তহীন বেদনাবোধ ও তার উপশম কিভাবে সম্ভব ? তিথির জীবন বাদল মেঘের মতো একজন সম্ভাবনাময় কবির কাছে ক্রমশ অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে কেন ? নারী হিসেবে তিথির আকর্ষণ তো প্রশ্নহীন ! ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা, রুচিবোধ,মেধা, সংস্কৃতি-চেতনা – কোনো কিছুতেই তো সে কম নয় ! ইদানিং কোনো মেয়ের কাছে সে শোনেনি যে , সে তার প্রেমিক অথবা স্বামীর সারা জীবনের ভাত কাপড়ের দায় নিতে রাজি আছে । এমন দৃঢ়চেতা নারীর বন্ধুত্ব কবি বাদল মেঘের ভালো লাগছে না ? কবি বাদল মেঘের তো প্রতিষ্ঠিত হতে এখনো অনেক বছর লাগবে।‌ অনেক লড়াই এখনও বাকি । সেখানে তো তিথি তার সহযোদ্ধা হতে পারতো । হঠাৎ চমকে উঠলো অমলেন্দু। বাদল মেঘ তিথিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে না তো ? এই বয়স থেকেই ব্যক্তিত্বের সংঘাত শুরু হয়ে গেল ? একজন দারুণ সম্ভাবনাময় নারী , আরেক জন প্রতিশ্রুতিবান পুরুষ একে অপরের সাফল্য ব্যর্থতার ভাগ সারাজীবন ধরে নিতে পারবে না ? ইগো আর ভালোবাসার এই লড়াই থেকে তিথি যদি শেষ পর্যন্ত নিজেকে সরিয়ে নিয়ে , অন্য কোনো দিগন্তের কাছে সঁপে দেয় , তাহলে তো এই আশ্চর্য যুগলবন্দি থেকে পৃথিবী বঞ্চিত হবে । পন্ডিত রবিশঙ্কর আর ওস্তাদ আল্লারাখার সার্থক যুগলবন্দির কথা মনে পড়ে গেল অমলেন্দুর। অনেক দিন আগের কলামন্দির আর নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামের দুটি আশ্চর্য সন্ধ্যার কথা অমলেন্দু কোনোদিন ভুলতে পারবেনা। ভুলতে পারবে না, অনন্যা সুচিত্রা মিত্রের গানের সঙ্গে ওস্তাদ আমজাদ আলির সরোদ। অমিতাভ চৌধুরীর অসাধারণ ছড়ার সঙ্গে পূর্ণেন্দু পত্রীর দারুণ দারুণ ছবি ভোলা যায় ! দরজা বন্ধ করে, জল খেয়ে বিছানায় শুতে শুতে অমলেন্দু প্রতিজ্ঞা করলো — তিথি আর বাদল মেঘের এই যুগলবন্দিটা কিছুতেই ভাঙতে দেওয়া যাবে না।বিশ্বচরাচর এই দুটি ছেলেমেয়েকে মিলিয়ে দিয়েছেন ক্ষণিকার ‘এক গাঁয়ে’ কবিতায় —
আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি
সেই আমাদের একটি মাত্র সুখ ,…
একজন ঠিক মানুষের সঙ্গে আরেক জন ঠিক মানুষের দেখা হওয়াটা পৃথিবীর বিরলতম ঘটনা। ইগোর আক্রমণ থেকে এই আশ্চর্য জুটিকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে ।তাতে এই পৃথিবীরই লাভ। কারণ , এক ছাদের নিচে দুটি কবিতার খাতাই কুঁড়িতে ,ফুলে ভরে উঠবে । আচ্ছা, আরেকবার চমকে উঠলো অমলেন্দু , আজকে তিথি যে ভাবনাটাকে উস্কে দিলো — ভবিষ্যতে উন্মনা আর তার যৌথ জীবনের কথা — যদি স্বপ্নে বা বাস্তবে সেরকম ঘটনা ঘটে , তাহলেও কি একই রকম সমস্যা তৈরি হবে ? পরক্ষণেই একটু যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে। ভাগ্যিস সে কবিতা লিখতে জানে না।উন্মনার কবিতা যেন তার কাছে কথা অমৃতসমান। কবি উন্মনা লিখবে শৈশবের কথা,সেই কবিতা বলবে তার মেয়ে তোয়া। উন্মনা লিখবে নারীজন্মের কথা , সে কবিতা বলবে সে আর তার মা মৃত্তিকা। উন্মনা লিখবে ভালোবাসার কবিতা,সে কবিতা বলবে তার কবিমন অমলেন্দু ,কথক অমলেন্দু,শব্দশিল্পী অমলেন্দু। সেখানে ইগোর প্রশ্নই ওঠেনা। সে তো নারী জাগরণ দেখে উদ্ভাসিত হয়,শিক্ষিত হয়। বাড়ির সামনে দিয়ে কোনো কিশোরী সাইকেল চালিয়ে গেলে , সে‌ উন্মনার মেয়েবেলার কথা ভাবে। বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর শহরে কোনো কাজের দিনে যখন সে দেখে , মেয়েরা স্কুটি চালাচ্ছে , বা চারচাকার স্টিয়ারিংএ কোনো নারী , তখন সে যেন আরও দেখতে পায় — বিমানের ককপিটে একজন নারীকে । কোন ছোটোবেলায় মায়ের কাছে শুনেছিল , মহাকাশচারী ভ্যালেনটিনা তেরেস্কোভার কথা। অকালে ঝরে যাওয়া নভোচারী কল্পনা চাওলা তো এই সেদিনের কথা ! মনে হলো বড় হয়ে ওঠার মুহূর্তে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিত্বের কথা । আবছা ঘুমের আবেশে নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলো — ওহে অমলেন্দু, ভবিষ্যতে তোমার এই অনুভূতিগুলো বেঁচে থাকবে তো ? ইগো এসে তোমার সুন্দর ব্যক্তিত্বকে চুরমার করে দেবে না তো ? পারবে তো পাশের মানুষটার উত্থানকে মেনে নিতে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যেন স্বাভাবিক ভাবেই সে ঝিমিয়ে পড়েছিলো। ভোর পৌনে পাঁচটা নাগাদ ফোনটা বেজে উঠতেই ঘুম নয় , ঘুমের আবছা ঘোরটা কেটে গেল । উন্মনা ? এত ভোরে উঠে পড়েছে ? দু’তিন বার বাজার পরে ফোন রিসিভ করতেই — হ্যালো,কি হয়েছে কবিমন ? সারারাত ঘুমোওনি কেন ? অমলেন্দু কিছু একটা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতেই , ও প্রান্তে ঠিক ভোরের আলোর মতোই উন্মনার স্নিগ্ধ হাসি। আমি সব জানি। মানে আন্দাজ করেছিলাম।জানি , তিথি তোমাকে ফোন করবে , ঠিক না ? না না , ডিটেইলে বলতে হবে না । জানো কবিমন‌ , যখন স্বামীর ঘর করতাম , ওঁর হাঁটাচলা দেখেই মনের অবস্থা বুঝতে পারতাম,যা সব বুদ্ধিমতী স্ত্রীরাই পারে। সেটা সহজ ছিল। কারণ , সেখানে তো আমরা এক ছাদের নিচে থাকতাম । রাতের বিছানায় একফুট দূরে মানুষটা ছট্ফট্ করলে….
আজ অনেকদিন হলো , সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি । এখন আর সে দিনগুলোর কথা ভাবিনা। আর তুমি ? কবিমন , সংসার আমাকে ঘর ও ঘরণী করেও তার অধিকার কেড়ে নিয়েছে।তাই তোমাকে সেই সংসারের কর্তা ভাবতে পারি না। তুমি আমার দিগন্ত অথবা আকাশ।আকাশের মুখ ভার হলেও যেমন মাটির পিঁপড়েরা বোঝে ,আমার নখ-দর্পণে তোমার মুখচ্ছবি ভাসিয়ে দিলে , আমিও ঠিক তেমনই বুঝতে পারি । কবিমন , জানিনা, এ কোন আশ্লেষে তুমি আমাকে বেঁধে ফেলেছো। তোমার রাতের বাবুইবাসায় আমি ঝিকমিক জোনাকির দীপ হয়ে জ্বলি কবিমন।‌অমলেন্দু ঠিক বুঝতে পারছিলো না তিথির কথা সে শুরু করবে কিভাবে। তবুও , বেশ কিছুক্ষণ ধরে তিথির সমস্যার কথা তাকে বলতেই হলো। উন্মনা মন দিয়ে শুনলো। বললো– আমিও ঠিক এটাই আন্দাজ করেছিলাম। মিটিং চলাকালীন তোমার প্রতি ওর অতিরিক্ত আগ্রহ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম , তোমাকে ও কিছু বলতে চায়। তোমার শান্ত ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ ও এড়াতে পারছেনা। তোমার আশ্চর্য পৌরুষে নারীর কমনীয়তাও আছে।আমি জানতাম তুমি তিথির সমস্যাটাও বুঝবে। এসো কবিমন আমরা দুজনেই ওদের বন্ধু হই । বিশেষ করে আমি ওর অসমবয়সী বন্ধু হতে রাজি আছি। কবি বাদল মেঘ যদি ওকে জীবন থেকে হারিয়ে ফেলে , তাহলে শুধু সে নয় , তিথির জীবনও যে ধ্বংস হয়ে যাবে , সেটা আমি মিটিং চলাকালীনই বুঝতে পেরেছিলাম। কবিমন , থাক ওসব কথা । তুমি যখন তিথির সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলছিলে ,তখন আমার বুকের মধ্যে কয়েকটা শব্দ জমা হচ্ছিল। খাতার পাতায় লিখলাম।‌ তিথিকে সরিয়ে এই ভোরের আলোয় যখন আমি এসেই পড়েছি তোমার কাছে ,তখন আর অসময়ে ঘুমের কোনো সম্ভাবনাই নেই তোমার। বরং শোনো আমার নতুন কবিতা। শুনবে কবিমন ? অমলেন্দু আজকে কথা হারিয়ে ফেলেছে।তার শুধু মনে হলো — এই মুহূর্তে তার কবিতার নারী তার কাছে এসেছে ? নতুন কবিতা নিয়ে এসেছে ? প্রত্যেক নারীই যেন আশ্চর্য সুগন্ধ বহন করে ! অমলেন্দু এই মুহূর্তে উন্মনার সেই ঘ্রাণ অনুভব করলো। উন্মনা পড়তে শুরু করলো তার কবিতা —
বুকের অতলে থাকে নিভৃত স্বদেশ,
যে জানে , সে জানার অধিক জানে,
রা কাড়েনা মুখে।
একলা চলার পথে ডুকরে, ককিয়ে ওঠে ।
প্রতারিত হতে হতে , প্রসারিত মানচিত্রে
উন্মাদের মতো ঘুরে মরে।
অবশেষে ফিরে আসে একমুঠো সবুজের খুব কাছাকাছি।
নরম পায়ের ছাপ এঁকে দেয় পরিত্যক্ত ভাঙা ঘরে ,অরণ্যগভীরে।
দুঃশাসনের কাছে বারবার হেরে গিয়ে , আবার বিছিয়ে দেয় মাধুকরী জীবনযাপন।
এবং বাঁচতে চায় ।
বুকের অতলে থাকে নিভৃত স্বদেশ,
যে জানে , সে জানার অধিক জানে ;
চুপ করে থাকে ।

অমলেন্দুর হৃদয়জোড়া হাহাকার যেন ডুকরে উঠছিল এমন কবিতা শুনে। সে যখন সুন্দরী তিথির একগুচ্ছ রূপসী সংলাপে ক্রমশ আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল ,তখন তার কবিতার নারী উন্মনা তার কবিহৃদয়ের সবটুকু উজাড় করে দিচ্ছিল কবিতায় কবিতায় !
উদভ্রান্ত অমলেন্দুর শুধু মনে হতে লাগলো — উন্মনা এখন তার কাছে ? তার ভাঙা ঘরে চৈত্রের জোছনা হয়ে এসেছে ?
সত্যি ? কোনোদিনও এমন ঘটনা ঘটবে তার জীবনে ?
তার একলা জীবনে ? মনে পড়লো গতকাল সভাশেষে বাসে ওঠবার সময় উন্মনা কিছুটা অন্যমনস্কতায়,কিছুটা আবেগে তার খুব কাছে চলে এসেছিল। অমলেন্দুর বাহুতে উন্মনার নরম বুকের ছোঁয়া যেন পুষ্পবৃষ্টির মতো ঝরে পড়েছিল। সেই পাগল করা ছোঁয়া আর নারী হৃদয়ের সুগন্ধ , ঠিক এই মুহূর্তে যেন তার ঘরের প্রথম আলোতে মিশে আছে ! পিপাসার্ত অমলেন্দু উন্মাদের মতো সেই নতুন পাতার গন্ধকে জড়িয়ে ধরে বললো — আমি তোমাকে সত্যিই পেলাম ,উন্মনা !

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।