অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ২৮)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
তুমি আমার বালুচরী , কবেকার জামদানী !
তুমি আমার বোবা ঠোঁটে মা নিষাদ বাণী ;
তুমি আমার পলাশ শাখায় ভরা ফাগুন মাস ,
লজ্জা-বৃন্তে ফুটে থাকা থরথর নিঃশ্বাস।
চিল্কিগড়ে কনকদূর্গা মন্দিরের বিশাল চত্বর ছাড়িয়ে নাবাল জমি পায়ে পায়ে নেমে গেছে নদী ডুলুং পর্যন্ত । ওপারে পটে আঁকা ছবির মতো গ্রাম। নির্জনতা যেন আরও গাঢ় স্তব্ধতার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে ! নিঃসঙ্গ একটা জেলে ডিঙি থেকে ঝুপ করে শব্দ তুলে যে মাছ ধরার জাল নদীর বুকে হৃদয় বিছিয়ে দিলো ,তাও যেন চরাচরের এই স্তব্ধতাকে নিখুঁত তুলিতে এঁকে দিয়ে গেলো। সূর্য এখনও মাথার ওপর ওঠেনি , তাই, এপারে সামান্য একটু ছায়া খুঁজে ওরা দুজন বসলো একটা চ্যাটালো পাথরের ওপর । গোটা জঙ্গলমহলের অন্যতম রূপসী নদী এই ডুলুং । সাধারণ মানুষের জীবনের ওঠাপড়াকে সাক্ষী করে , হতাশা – লড়াই , সংগ্রামকে যেন বুকে নিয়ে , গ্রামীণ নদী ডুলুং বয়ে চলেছে মা প্রকৃতির আঁচলের ছায়ায় ছায়ায়। অমলেন্দু আর উন্মনা– দুজনের কানেই ভেসে এলো পাড়ের আবছা জঙ্গলের মধ্যে থেকে দুটি তাজা তরুণ কন্ঠের গান ।যেন অনেক দিন আগে কিশোর কুমার ও রুমা গুহ ঠাকুরতা যত্ন করে শোনাচ্ছেন–
এই তো হেথায় কুঞ্জছায়ায় স্বপ্ন মধুর মোহে ,এই জীবনের যে কটি দিন পাবো , তোমায় আমায় হেসে খেলে কাটিয়ে যাবো দোঁহে….স্বপ্ন মধুর মোহে…
উন্মনা সেই সুরের খেইটুকু ধরে সারা পৃথিবীর অবাক বিস্ময়ে জানতে চাইলো– আচ্ছা, আজকের প্রজন্ম প্রেম করতে এসে পুরোনো দিনের এই সুন্দর রোমান্টিক গান গাইছে ! কী আশ্চর্য তাই না ! অমলেন্দু চুপ করে তাকিয়ে থাকলো । উন্মনা আবারও বলে — এখন বাংলা, হিন্দি গানে কতরকম বৈচিত্র এসেছে ,কত রকম আধুনিকতা । সে সব ছেড়ে দিয়ে…
অমলেন্দু এবারও চুপ করে নীরবে বয়ে যাওয়া যায় নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে….
তারপর খুব শান্ত গলায় বলে — পৃথিবী ঠিক এই কারণেই আজও এত সুন্দর উন্মনা । ওরা কিন্তু গানটা সম্পূর্ণ গাইলো । তুমি শুনতে পেলে ? উন্মনা চোখ নামিয়ে বললো — বিশ্বপ্রকৃতির এই শব্দ শুনবো বলেই তো অরণ্য ও নদীর কাছে এসেছি । গুণগুণ করে গেয়ে উঠলো–
কোলাহল তো বারণ হল , এবার কথা কানে কানে ,
এখন হবে প্রাণের আলাপ কেবলমাত্র গানে গানে…
হালকা সাদা ধূসর বালি, তেরছা রোদের ছোঁয়া পেয়ে ক্রমশ তেতে উঠেছে।শীত ও গ্রীষ্মের সন্ধিক্ষণে ঋতুরাজ বসন্ত যেন জীবনের সব পাওয়া না পাওয়াকে সহনীয় করে তোলে। বালির ওপর বিছিয়ে থাকা একগুচ্ছ হলুদ ফুলের দিকে তাকিয়ে উন্মনা মুখর হল — কবি , আমরা কিছু কথা বলবো বলে এসেছিলাম না ? বাসে ঝাড়গ্রাম থেকে চিল্কিগড় আসার পথেও তো তুমি অনেক কথা বলছিলে । এখানে এসে হঠাৎ চুপ করে গেলে কেন ? কোন গভীরতায় ডুব দিলে কবি ?
— অমলেন্দু যেন খুব লজ্জা পেয়ে উত্তর দিলো — আমাকে প্লিজ কবি বলে ডেকো না উন্মনা , কারণ কবি হতে না পারার যন্রণা আমাকে কুরে কুরে খায় । যে সু-মেধার ঐশ্বর্যে তুমি ,প্রলয় ,শুভ ,বাদল মেঘ কবিতা রচনা করো ,তা আমার কাছে চিরদিন অধরা মাধুরী হয়েই থেকে যাবে।তাকে ছন্দ বন্ধনে ধরবার চেষ্টাও করবো না। কারণ, আমি কবিতার মতো করে যাই লিখি না কেন , লেখার শেষে মনে হয়,এ কথাগুলো এভাবে কেউ আগেই বলে গেছে । খবরের কাগজের পাতায় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ের রিপোর্টাজ লিখতে লিখতেই বুড়িয়ে গেলাম । তবে কবিতা না লেখার যন্রণাটাকে ধরে রেখেছি । জন্মান্তরে তাকে কলমের ডগায় আনবো ,কথা দিলাম । আমাকে প্লিজ কবি বোলো না । সেদিন রাতের ফোনে তুমি আমাকে সুন্দর একটি নামে ডেকেছিলে। তোমার মনে আছে কিনা জানি না। কিন্তু তোমার মুখে আমার সেই নতুন নাম চিরদিন আমার চোখের পাতায় লেগে থাকবে উন্মনা । তুমি আমাকে ডেকেছিলে কবিমন বলে । তোমাদের মতো কবিতা লিখতে না পারলেও আমার অবশ্যই একটা কবিমন আছে। তাই আমি বাংলা কবিতার দিগন্তকে ছুঁতে চাই , কন্ঠস্বরের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চাই , মানুষের ড্রয়িং রুম থেকে মিছিলে মিছিলে । তথাকথিত আবৃত্তি শিল্পী আমি কখনোই হতে চাইনি উন্মনা ,যারা শুধু আবৃত্তিযোগ্য কবিতাই খুঁজে বেড়ায় আর প্রিয় কবিদের কাছে আবদার জানায় ,তার বলার জন্য উপযুক্ত কবিতা লিখে দিতে। আমি অবাক হয়ে যাই ,কোনো কোনো কবি কি করে এই অন্যায় আবদার সহ্য করেন ? আমার বুকজোড়া , হৃদয়জোড়া কবিমন নিয়ে যে কোনো সুন্দর কবিতাকে সবসময় মানুষের কাছে তুলে ধরতে চেষ্টা করি । যাতে সাধারণ মানুষের কাছে কবিতা পৌঁছে যেতে পারে। যাতে তারা কবিতা থেকে উঠে এসে মিছিলে যেতে পারে , মিছিল থেকে ফিরে এসে আবার কবিতার কাছেই নতজানু হতে পারে । শুনতে শুনতে আবিষ্ট উন্মনার চোখে একটু মেঘ ঘনিয়ে এলো । তবু সেই ব্যক্তিত্বময়ী দৃঢ় ও নিশ্চিত বললো — তুমি কবিতা লিখতে পারো না , একথা আমি সাত জন্মেও বিশ্বাস করবো না । তুমি লেখো না , এটা তোমার জেদ কবিমন ।
—- হ্যাঁ ,জেদ । হ্যাঁ, আমি কবিতা লিখি; কিন্তু সে কবিতা ফুলের মতো ফুটে ওঠে কই ? প্রতিদিন নানা ধরনের পত্রিকায় আর সোস্যাল মিডিয়ার পাতায় যে হাজার হাজার কবিতা চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় , সেই সব কবিতার ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে কী লাভ উন্মনা ? যদি এমন কবিতা লিখতে পারতাম , যে কবিতা পড়ে একজন জীবনযুদ্ধে বিধ্বস্ত মানুষ রেললাইনে গলা দিতে গিয়ে আবার ফিরে আসতো জীবনের কাছে , প্রতিদিনের সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের কাছে ; দিনের পর দিন ব্যর্থতা , ব্যর্থতা ও ব্যর্থতার শেষে এক চিলতে সফলতার কাছে এসে দাঁড়াতে পারতো যদি আমার কবিতা পড়ে ,তাহলে সব ভুলে ,সব ছেড়ে শুধু কবিতাই লিখতাম।
কী লাভ উন্মনা , প্রতিদিন কবিতার নামে আবর্জনা লিখে ?
উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিলো অমলেন্দু। হঠাৎ অনুভব করলো , ওর মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের উপরে, উন্মনার হাতের স্নিগ্ধতা এসে স্পর্শ করলো।
— কবিমন,তাহলে আমরা সবাই তো ব্যর্থ কবি। অন্তত আমি তো কোনোদিনও সেই মানের কবিতা লিখতে পারবো না । উন্মনার বাড়ানো হাতের স্পর্শ আশরীর অনুভব করে অমলেন্দু ধীরে ধীরে জবাব দিলো–
তোমরা পারবে । কেননা কবিতা লেখার মেধা তোমাদের মধ্যে আছে । চেষ্টা করলে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে কোটি টাকার আজগুবি স্বপ্নের মতো কিছু লিখে দেওয়া যায় , কবিতা লেখা যায় না । দিনরাত ফোনাফুনি করে কিছু পরষ্পরের পিঠ চুলকোনো বন্ধুত্ব হতে পারে ,সেটা কিছুতেই কবিতার বন্ধুত্ব নয়।
— তাহলে কিরকম বন্ধুত্বের কথা তোমার মনে আসে , কবিমন ?
— ধরো , বরিশাল জেলার কীর্তনখোলা নদীর ধারে কোনো বিকেলে , অথবা রাঢ় বাংলার কোনো নির্জন প্লাটফর্মে , অর্জুন গাছের নিচে দেখা হয়ে গেল জীবনানন্দ আর বিভূতিভূষণের । একজন কবিতাকে মহাকাব্য করে দিতে পারেন , অন্যজন পারেন পথের আদি-অন্তকে মহাকাব্যিক রূপ দিতে । তাঁদের দুজনের কথা বলার মধ্যে যে শত সহস্র কুঁড়ি, ফুল হয়ে ফুটবে — সেই কথা শুনবে আকাশ বাতাস নদী জঙ্গল পাহাড় ! সাধারণ মানুষ হয়তো তাঁদের চট করে চিনতেও পারবে না , তবুও তাদের মনে হবে , ঈশ্বর ও প্রকৃতির কথোপকথন বোধহয় এভাবেই সৃষ্টি হয়! উন্মনা ,আমি কবি নই , তবু মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করি — কবি বিষ্ণু দে , বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত , পশ্চিমী দুনিয়ার কবিতা নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন।
উন্মনা ,কেমন হতে পারে সেই সংলাপ ? কোন আশ্চর্য ও বিরল আলোর বিচ্ছুরণ হতে পারে সেই সংলাপ থেকে ? উন্মনা, প্লিজ ভাবার চেষ্টা কর , বাংলা ভাষার কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরিজি ভাষায় অনুবাদ করছেন তাঁর কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি থেকে। ঘরে নিমগ্ন স্তব্ধতা।জানলার বাইরে হয়তো ঝড়ের রাতে বোলপুরের দিগন্তে তালবনের হাহাকার ! কবিগুরুর মেধা পৃথিবীর সব কিছু থেকে বিচ্যুত হয়ে , তাঁর নিজের কবিতা অনুবাদ করে চলেছে , এমন একটি ভাষায়, যা তাঁর মাতৃভাষা নয়। উন্মনা , কবিতা লেখবার জন্য সেই একাগ্রতা আমাদের দরকার। যার ধারে কাছেও বাস্তব দুনিয়া আমাদের পৌঁছতে দেয় না !
বেশ খানিকক্ষণ স্তব্ধতার প্রহর কেটে গেল।ফাল্গুনের শীর্ণ নদী পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে আপন গতিতে তিরতির করে বয়ে চলেছে ।মন্দিরের দিক থেকে নেমে আসার পর দুটি ছেলে মেয়ে জিন্সের প্যান্ট গুটিয়ে হাত ধরাধরি করে জল পেরিয়ে, দিব্যি ওদিকের গ্রামের দিকে হাঁটা লাগালো। ক্রমশ দৃষ্টিসীমার বাইরে,পল্লী নির্জনতায় হারিয়ে গেল। উন্মনা অবাক বিস্ময়ে একটার পর একটা ছবি তুলে রাখছিলো তার স্মার্টফোনে। তার কবিমনকে চুপ করে যেতে দেখে , নিঃশব্দে বাড়ি থেকে আনা খাবার কাগজের প্লেটে বেড়ে দিলো , জলের বোতল। লুচি , আলুভাজা আর ডিমের কষা খাওয়ার পর তার শেষ আস্বাদ আঙুল চেটে নিতে দেখে উন্মনা বুঝলো , অমলেন্দুর খিদে লেগেছিলো । নারীর নিজস্ব অতল স্নেহে তার হৃদয়ের দুকুল ছাপিয়ে গেল। বিবাহিত জীবনের নিবিড় দিনগুলোয় , স্বামী প্রাণতোষকে ঠিক এইভাবে সামনে বসে খাওয়াতো সে।অধ্যাপক প্রাণতোষ কিন্তু আঙুল চাটতো না । স্ত্রীর কাছেও সে তার নিজস্ব সফিসটিকেশন বজায় রাখতো। উচ্চশিক্ষিতা উন্মনা যখন গরম চায়ে নরম হাতরুটি ডুবিয়ে পরম তৃপ্তিতে চিবোতো , প্রাণতোষ ভুরু কুঁচকে সেখানে থেকে নিঃশব্দে উঠে যেত । মায়ের বাড়ির গাঁইয়া অভ্যেস ছাড়তে পারেনি বলে , উন্মনাও লজ্জিত হতো। আজ দুজনেই আঙুল চাটতে চাটতে হঠাৎ দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। অমলেন্দু ঘড়ি দেখতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিয়ে বললো–
উন্মনা, আজ তোমার নিজের কবিতা শোনাবে না ?
— ভয় লাগছে কবিমন , কবিতা সৃষ্টি রহস্যের যে গভীরতায় তুমি পৌঁছে দিলে,সেখান থেকে নিজের কবিতা বলতে সংকোচ হচ্ছে। বরং তুমি গীতাঞ্জলি থেকে কবিতা শোনাও।
আরও দুটি ছেলেমেয়ে হাত ধরাধরি করে আবছা জঙ্গলের অন্দরমহলে ঢুকে গেল।
দেখতে দেখতে উন্মনার গা শিরশির করে উঠলো। অমলেন্দুর যেন সেদিকে ভ্রূক্ষেপই নেই । নিজস্ব কন্ঠমাধুর্য দিয়ে বলে যেতে লাগলো—
যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে
সবার পিছে,সবার নীচে ,সব হারাদের মাঝে।
…………
………..
Here is thy footstool
and there rest thy feet
where live the poorest , and lowliest,and lost.
……………
……………
নদীর ওপরে আবছা ঘনিয়ে আসছে অনিবার্য বিকেল।কবিতার গভীরতায় স্তব্ধ হয়ে গেছে নারী উন্মনা। নিভৃত প্রাণের দেবতার প্রতি এই কবিতার শব্দ চয়ন আর তার ইংরেজি অনুবাদ আজকের এই অপরাহ্নকে যেন চিরদিনের গুহাচিত্র করে দিলো !
উন্মনাকে চুপ করে থাকতে দেখে আকুল অমলেন্দু এবার বলে উঠলো — কবি , তোমার কবিতা শোনাও।
তোমার কবিমন প্রাণ পেতে দিয়ে কবি উন্মনার কবিতা শুনবে।
ক্রমশ