গল্পেরা জোনাকি -তে অসীম বিশ্বাস

ফিরে পাওয়া

আরব সাগরে তখন সূর্য’টা গাঢ় লাল হয়ে অস্ত যাচ্ছে। মেরিন ড্রাইভে উচ্ছল মানুষের ভিড়। অনেকের মাঝেও অর্পিতার মনে হ’ল বড় একা সে। বিয়ের বছর ঘুরতে চলেছে তবুও মুম্বইয়ের প্রতি কোন রকম আগ্রহ মনের মণিকোঠাতে গড়ে উঠতে পারেনি।
অর্পিতা সেটাই মনে মনে ভাবছিল , ভাবছিল ওর আজ তো সুখে থাকার দিন; বাড়ি, গাড়ি এবং ঐশ্বৰ্য্য সব পেয়েছে রমেশের কাছ থেকে।
বাবা তাঁর একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন সব কিছুই পরখ করে।
রমেশ ইঞ্জিনিয়ার এবং ভারতের একটি নাম করা সরকারি সংস্থার ক্লাস ওয়ান অফিসার। বিয়েতে সব আত্মীয় স্বজন বলেছিলেন বাবাকে -এমন ঘর নাকি ভাগ্য করে পেতে হয়।
সব থেকেও অর্পিতা মনে করে ওর মত হতভাগিনী কেউ নেই এই পৃথিবীতে।
হঠাৎ অর্পিতার শোভনের কথা মনে পড়ে গেলো। মনে মনে ভাবলো ও নিশ্চয় এতো দিনে ভুলেই গেছে। অর্পিতা নিজের মনেই বলে উঠলো ভুলে যাওয়াই ভালো।
অর্পিতার বিয়ের আগের দিন গুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলো। শোভন আর ও একই অফিসে চাকরি করতো। অর্পিতা ছিল হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্টে আর শোভন ফিনান্সে।
অর্পিতা অফিস শেষে একদিন স্কুটি স্টার্ট দিতে গিয়ে দেখে সামনের চাকা পাঞ্চার । একদম হাওয়া নেই। সেদিন বেড়তে একটু দেরিও হয়েছে। শীতের বেলা তাই বাইরে অন্ধকার হয়ে গেছে। কি করবে বুঝতে না পেরে স্কুটি টা টেলতে টেলতে চলা শুরু করলো, যদি কাছা কাছি কোথাও পাঞ্চার রিপেয়ার করা যায়। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো- কি হয়েছে ম্যাডাম? অর্পিতা তাকিয়ে দেখে বাইকে শোভন। পরিচয় বা আলাপ ছিল না তবে মুখ চেনা চেনি । অর্পিতা বললো- তেমন কিছু নয় , পাঞ্চার বোধ হয়।
শোভন বাইকটা স্ট্যান্ড করে সামনের চাকায় হাত দিয়ে দেখলো একদম হাওয়া নেই। শোভন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বললো ম্যাডাম আমি শোভন এই অফিসের একাউণ্টেন্ট।
অর্পিতা বললো – আমি এইচ আরে আছি, অর্পিতা।
শোভন বললো – আপনি কোথায় থাকেন?
অর্পিতা বললো- বেহালা চৌরাস্তা।
শোভন বললো- ও আচ্ছা, আপনি যদি মনে করেন আমার সাথে যেতে পারেন, আমি শকুন্তলা পার্কে থাকি।
আর আপনার পাঞ্চার রিপেয়ার করার দোকান প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। স্কুটি’টা লক করে এখানেই রেখে দিন। গেটে যাওয়ার সময় সিকিউরিটি কে বলে দিচ্ছি।
অর্পিতা একটু সময় নিয়ে বললো ঠিক আছে আপনি অজন্তা সিনেমা হলের সামনে নামিয়ে দিলেই হবে।
সেই দিনের বাইকে করে যাওয়া আর শোভনের ব্যবহার দুতিন মাসেই প্রেমে পরিণত হয়েছিল। অফিস কামাই করে মেট্রোয় সিনেমা দেখা, নিউ মার্কেটে শপিং , আমিনিয়ায় বিরিয়ানি খাওয়া , প্রিন্সেপ ঘাটে শোভনের কাঁধে মাথা রেখে গঙ্গার বুকে সূর্য অস্ত যাওয়ার ছবি মোবাইলে ধরে রাখা ব্লা ব্লা ব্লা..!
অবশেষে সেই দিনটাও এলো।
সেদিন শনিবার, একটু দেরি করেই বাড়ি ফিরেছিল অর্পিতা।
ফ্রেশ হয়ে ড্রইং রুমে টিভির সামনে বসতেই বাবা বললেন- ছেলেটি কে?
অর্পিতা একটু অবাক হয়ে তাকাতেই, বাবা আবার বললেন- তোমার অফিস তো তারাতলায়, তুমি অফিস টাইমে ফোর্টউইলিয়ামের সামনে দিয়ে বাইকে ছেলেটির সাথে কোথায় যাচ্ছিলে?
অর্পিতা কিছু বলার আগেই, অর্পিতার মা ভেতর থেকে এসে উত্তর দিলেন- ওর নাম শোভন, অর্পিতার বন্ধু , একই অফিসে চাকরি করে। আমাদের বাড়িতে একদিন এসেছিল, তুমি তখন দিল্লী গেছিলে অফিসের কাজে। ছেলেটি খুব ভালো, বাড়িতে বিধবা মা আছেন। নিজেদের ফ্ল্যাটেই থাকে। অফিসে ফিনান্স অফিসার। ওর মায়ের সাথেও একদিন ফোনে কথা বলে বুঝেছি অর্পিতাকে উনার খুব পছন্দ। ভেবেছিলাম তোমাকে একদিন বলবো কিন্তু তোমার ব্যস্ততা সে সুযোগ করে দেয়’নি।
অলোক বাবু ( অর্পিতার বাবা) নিজের স্ত্রী শোভার দিকে তাকিয়ে বললেন- ও তুমিও এই নাটকের সাথে যুক্ত? বলেই ভেতরের ঘরে চলে গেলেন।
সেদিন বাড়িতে আর কারো সাথে কোন কথা হলো না বিশেষ।
রাতে ঘুমানোর আগে অর্পিতার ঘরে শোভাদেবী এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন চিন্তা করিস না।
অর্পিতা মাকে বললো-দেখো বাবা কিছু একটা করবেই। বাবা সব সময় বলেন ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কারো সাথেই আমার বিয়ে দেবেন না।
সোমবার অর্পিতা অফিসে গেলো , লাঞ্চের সময় শোভনের খোঁজ করলো কোথাও পেলো না। তিনটে নাগাদ ফোন করলো কিন্তু শোভন ফোন ওঠালো না। ঠিক সন্ধ্যা নাগাদ শোভনের ফোন এলো। অর্পিতা বললো- তুমি কোথায়?
শোভন বললো- আমি অফিসে গিয়ে ট্রান্সফার লেটার পেলাম। আমার পোস্টিং টিটাগড়ে হয়েছে। আজকেই রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। তোমার টেবিলে গিয়ে দেখলাম তুমি তখনও আসোনি। আমি বাইক শিয়ালদহ স্টেশনে রেখে ট্রেনে টিটাগড় এসে অফিস জয়েন করেছি। তোমার ফোন যখন এলো আমি তখন বসের সামনে বসে ছিলাম।
অর্পিতা বললো- ট্রান্সফার? কি করে সম্ভব?
শোভন বললো- প্রাইভেট কোম্পানীতে সব কিছুই সম্ভব!
অর্পিতা বললো- কবে দেখা করবে?
শোভন বললো – জানিনা! ফোনে যোগাযোগ করবো।
অর্পিতার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
বাড়িতে ফিরে এলো।
বাড়িতে ঢুকে দেখে সেখানে অন্য নাটকের চলছে।
ঘরে ঢুকতেই বাবা বললেন- এই যে আমার মেয়ে অপু মানে অর্পিতা।
অর্পিতা দেখলো সোফায় এক বয়স্ক ব্যক্তি এবং পাশে এক যুবক বসে আছেন। দূর থেকে নমস্কার করতেই মা বললেন ফ্রেশ হয়ে এসো।
অর্পিতা ভেতরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে ফোন করলো শোভন কে। শোভন ফোন তুললো না। অর্পিতা মেসেজ করলো- বাবা আমার বিয়ের ব্যাবস্থা করছেন। কোন রিপ্লাই এলো না।
অর্পিতা নিজের মনটাকে শক্ত করলো। তৈরী হয়ে সামনের ঘরে আসতেই কানে শুনলো বিয়ের দিন ঠিক হচ্ছে।
ঠিক সেই সময় মোবাইলে শোভনের মেসেজ এলো- Congratulations!
অর্পিতার বাবা বললেন- এসো মা তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই, ইনি মুম্বাই পোর্ট ট্রাস্টের Executive Director, Mr Bibhash Halder আমার স্কুল জীবনের বন্ধু আর ওনার একমাত্র পুত্র শ্ৰীমান রমেশ হালদার, Oil India র Engineer, Class one officer.
অর্পিতা প্রণাম করলো বিভাষ বাবুকে ও নমস্কার জানালো রমেশ বাবুকে।
টুক টাক কথাবার্তায় কিছুটা সময় গেলো তারপর ডিনারের আয়োজন।
খাবার টেবিলে রমেশ জিজ্ঞাসা করলো- মুম্বাই গেছেন কখনও ?
অর্পিতা বললো- না।
রমেশ বললো- একবার আসুন মুম্বাই।
অর্পিতা বললো- যাবো।
কুড়ি দিনের মাথায় বিয়ে হয়ে গেলো। অলোক বাবু বেশ ধুমধাম করে একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিলেন। কোথাও কোন কার্পণ্য করেন নি।
অর্পিতা পারি দিলো মুম্বাই।
বিয়ের পরে শশুড় বাড়িতে সমস্ত রকম সুযোগ সুবিধা পেয়েছে কিন্তু সুখী হতে পারেনি। মা- বাবা ফোন করলে বলে- খুব ভাল আছি।
এভাবেই দিন কাটছিলো। মনটা খারাপ হলে মেরিন ড্রাইভে এসে বসে থাকে অনেকক্ষণ। আজ শোভনের কথা খুব মনে পড়ছে ।
হঠাৎ গাড়ির চালক এসে বললো- মেমসাহেব ঘর চলিয়ে, রাত হো গয়া।
গাড়িতে ফিরতে ফিরতেই ঠিক করলো আজ যে করেই হোক রাতে শোভন কে ফোন করবে। অর্পিতা মনে মনে ভাবলো- শোভন কি ভাবে নেবে কে জানে। তবুও মেসেজ করে দিলো- শোভন রাত বারোটা নাগাদ ফোন করবো জেগে থেকো।
সেদিন রাতে শরীর খারাপের অজুহাতে অর্পিতা কিছুই খেলোনা।
ঠিক বারোটার সময় শোভন’কে ফোন করতেই ওপার থেকে ফোনে শোভন বললো- হ্যালো
শোভনের গলা শুনেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো অর্পিতা।
কান্নার শব্দে পাশে শুয়ে থাকা রমেশের ঘুম ভেঙ্গে গেলো।
রমেশ কিছু বোঝার আগেই শুনতে পেলো অর্পিতা বলছে- আমাকে নিয়ে যাও শোভন, আমি আর পারছিনা থাকতে। এভাবে থাকলে আমি মরে যাবো। আমাকে তুমি বাঁচাও।
প্রায় দশ মিনিট ধরে কথা বলে অর্পিতা ফোন রাখলো।
রমেশের মনে অর্পিতার শেষের কথাটা বারবার প্ৰতিধ্বনি হতে লাগলো- শোভন তুমি আমাকে না নিয়ে গেলে আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
অর্পিতা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
রমেশ আস্তে করে উঠে অর্পিতার ফোনটা নিলো। নতুন ফোন, পাসওয়ার্ড’টা রমেশই সেট করে দিয়েছিলো। সামনের ঘরে এসে শেষের কল করা নাম্বার’টা রমেশ নিজের ফোনে সেভ করে নিলো। নিঃশব্দে অর্পিতার ফোনটা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো।
এর মাঝে সাতটা দিন কেটে গেলো।
সেদিন রবিবার ছিল, লাঞ্চের পর রমেশ অর্পিতাকে বললো- আজ তোমার সাথে আমিও যাবো মেরিন ড্রাইভে। তুমি তৈরী হয়ে নাও। বিকেল’টা ওখানেই কাটাবো দু’জনে।
অর্পিতার মনে পরে গেলো বিয়ের পর বেশ কয়েকবার রমেশই ওখানে নিয়ে যেতো।
দু’জনে সূর্য ডোবার অনেক আগেই মেরিন ড্রাইভে পোঁছে গেলো।
অর্পিতা গাড়ি থেকে নেমে নিৰ্দিষ্ট জায়গাতে এগোতেই থমকে দাঁড়িয়ে পরলো। নিজের চোখে দেখলো একেবারেই সামনে শোভন দাঁড়িয়ে আছে! অর্পিতা শোভনের দিকে তাকিয়েই রমেশের দিকে তাকালো।রমেশের ভাবলেশহীন মুখে কিছুই read করতে পারলো না! রমেশ ‘হাই’ বলেই হাতটা শোভনের দিকে এগিয়ে দিয়ে handshake করলো।
কিছু বোঝার আগেই রমেশ অর্পিতাকে বললো- তোমার বাবাই শোভন কে ট্রান্সফার করিয়াছিলেন এবং শোভন যদি আবার মেলামেশা করে তোমার সাথে তাহলে ওর চাকরি’ও যেতে পারে বলে ওর বস ধমকি দিয়েছিলেন। শোভনের সাথে কিভাবে যোগাযোগ করলাম সে কথা জিজ্ঞেস কোরো না। তবে ওর সাথে ফোনে কথা বলে সব জানতে পেরেছি বেশ কয়েকদিন আগে।
রমেশ কিছু কাগজ অর্পিতার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো- এগুলো পড়ে সই করে দাও। অর্পিতা হাতে নিয়ে দেখলো- ডিভোর্স ফাইল করার কাগজ পত্র।
অর্পিতা শোভনের দিকে তাকালো।
শোভন বললো- সই করে দাও।
রমেশ পেন এগিয়ে দিতেই অর্পিতা সই করে দিলো।
রমেশ কলকাতা যাওয়ার দুটো প্লেনের টিকিট শোভনের হাতে দিয়ে বললো রাত ৭ টা ৫০ শে ডিপার্চার T2 থেকে।
অর্পিতা কিছু বলতে যাওয়ার আগেই রমেশ বললো- তোমার জামাকাপড় আর গয়নাগাটি সব একটা বড় ব্যাগে ভরে গাড়ির ডিকি’তে রাখা আছে।
তোমরা গাড়ি নিয়ে এগোও। ড্রাইভার কে বলা আছে। আমি উবের কিংবা ওলা করে নিচ্ছি।
অর্পিতার কাছে সমস্তটাই স্বপ্ন মনে হচ্ছিল।
রমেশ ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিতেই অর্পিতা বললো- দাঁড়াও!
অর্পিতা বিয়ের পর এই প্রথম পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।
শোভন হাত মিলিয়ে জিজ্ঞাসা করলো- আপনি কেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন?
রমেশ কোন জবাব না দিয়ে ভিরের মধ্যে মিশে গিয়ে চিৎকার করে বললো- আমি নপুংসক।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।