ভূমি সংস্কার ও বিয়ে সম্পর্কিত আইনকে বিপ্লবের উত্থানের সাথে সাথে কার্যকরণ ও জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করা হল স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া।ইতিহাসে তেমনি দেখা গেছে, যেমন ফ্রেঞ্চ ও রাশিয়ার বিপ্লবের সময়। ফলে চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর ভূমি সংস্কার এবং বিয়ের নতুন আইন প্রবর্তন শুরু হয়েছিল। সামাজিক আর্থিক বিধিও প্রাসংগিক ছিল সংস্কারের। চীনাদের ক্ষেত্রে ভূমি সংস্কার আর বিয়ে বিধি আবশ্যিক ছিল।Chuguku Hoseishi Kenkyu (The study of the History of Chinese Legal System 1960) থেকে জানা যায় চীনাদের আইনপ্রণয়ন ও পরবর্তীকালীন নানা সংস্কার।
১৯৫০ সালে চীনাদের নতুন বিয়ের আইন কার্যকর হয়। পুরাণো চীনাদের বিয়ের দার্শণিকতত্ত্বকে অস্বীকার করে।পুরাণো বিয়ের কথায় চীনাদের একটা প্রবাদ আছে যে, ‘নুডলস দিয়ে মধ্যহ্নভোজন সারা যায়না’, অর্থাৎ মহিলারা মানুষতুল্য নয়।সন্তান প্রসব বা মেয়েদের হিসাবে রাখা হতনা। মহিলারা বাচ্চা প্রসব না করতে পারলে তাদের ডিভোর্স দিয়ে দেওয়া হত।মেয়েদের ক্রীত দাসের মত ব্যবসায়িক মূল্যে দেনা পাওনার কাজে লাগান হত।
Shan-hsi প্রদেশের একটা প্রবাদ এখনও বিদ্যমান, বিপ্লবের আগে নিয়ম ছিল, একটা মেয়ে জন্মালে তার মূল্য এক “shih” শষ্য, আর তার বয়েস বাড়ার সাথে সাথে এক “Koku” প্রতি বছর মূল্য বৃদ্ধি পেত।যে ক্রেতা সেই মেয়েকে কিনত তার কথা
অনুযায়ী মহিলাকে চলতে হত, সে তার স্বামী। এটা শোনা যায়,একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে মারধোর বা যেকোন সময় চড়তে পারত, যেন ঘোড়া। স্ত্রী রেগে গেলে বা স্বামী রেগে গেলে মারধোর প্রচলিত ছিল।একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে মারতে না পারলে বিচারের অবমাননা ধরা হত।
“Lo-Han-ch’ien”, একটা উপন্যাসে লেখক Chao-shu-li বলছেন, স্বামী স্ত্রীকে তার ‘চেহারার’ জন্য শুধু পেটাত। কনফুসিয়ান ভাবনা হল, স্বামী হলেন স্ত্রীর কাছে স্বর্গ।চাষীদের ভাগ্যে তাই লেখা। যে স্ত্রী তার স্বামীকে ছেড়ে যেতে পারতনা তার দুরাবস্থার সীমা ছিলনা, আর স্ত্রীরা স্বামী ছেড়ে কোথায় যাবে? সে ব্যবস্থাও ছিলনা।
বিপ্লবের পর এসব অবস্থা পালটে যায়।নতুন নারী পুরুষের মর্যাদা হল সমান সমান। যে যার ঘামের মূল্যে মূল্যায়িত। মেয়েরা তার বাপের সম্পত্তি নয়, মেয়েকে বাবারা আর কেনাবেচা করতে পারবেনা বা স্ত্রী স্বামীর বস্তু নয় বা কর্তা নয়।ভূমিসংস্কারে মেয়েরা উত্তরাধিকার সূত্রে ছেলেদের সমান সমান জমির মালিক হয়ে গেল। বিপ্লবের আগের আইন একেবারে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে গেল। নতুন সমাজে সকল রকম সামাজিক মর্যাদা মহিলারা পুরুষের সমান পেল। নতুন এক প্রবাদ সৃষ্টি হল, “বিবাহ আইন অলসতা নিরাময় করে এবং খাদ্য সরবরাহকে বীমা করতে সহায়তা করে”।
চীনের বিপ্লবের আগে মহিলাদের ইচ্ছামত বিয়ে করার স্বাধীনতা ছিলনা, ছেলেদেরও ইচ্ছামত বিয়ে করার অধিকার ছিলনা।বিয়ের প্রাথমিক বিবেচভনা ছিল দুটি কৃষক গোষ্ঠির মধ্যেকার আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদার অনুপাত। সমান সমান বা কাছা কাছি হলে বিবেচিত হত।এর মূল কারণ নিহিত ছিল পরিবারে শ্রমশক্তির যোগান দেওয়া।এবং এসব নির্ণয় হত দুই গোষ্ঠির বয়স্ক পুরুষ বা পিতার মধ্যে।
পরিবার বা গোষ্ঠির বড় কর্তা তার ছোট ছেলেকে বিয়ে দিত হয় ১০ বছরের বড় মহিলার সাথে নয় কম দামে কিনতে পাওয়া অতি অল্প বয়সের মেয়ে। যাতে তার শ্রম দেওয়ার মত একজন যথেষ্ট যোগ্য ও লাভজনক পাওয়া যায়। বড় মহিলার সাথে বিয়ে দিলে বাইরে ক্ষেতে শ্রম দিত আর ছোট মেয়ের সাথে বিয়ে হলে ঘরের সকল কাজ কর্ম করাত। এইসব মেয়েদের ভাগ্যকে বলা হত “t’ung–yang-hsi”। এই সব প্রথা অনেক চীনা উপন্যাসে দেখা যায়। এই সব প্রথার জন্য মহিলা জনসংখ্যা কমে গেছিল, অনেক।অনেক সময় জমিদাররা তাদের ভাড়াটের অল্প বয়েসি মেয়েদের জোর করে নিয়ে চলে যেত ক্ষেতের কাজ করাবার জন্য।
এই সিস্টেমে, জমিদাররা/ জমির মালিকেরা, অনেক বিয়ে করতে পারত ও উপপত্নী রাখতে পারত।উল্টো দিকে যারা অন্যের জমিতে ভাগাবর্গা দিয়ে চাষ করত তারা বিয়ে করতে পারতনা বা বৌ জোটাতে পারতনা কারণ তাদের তত পয়সা হতনা যত পয়সা একটা বৌ কিনতে লাগে।বিয়ের বয়েস পেরিয়ে গেলে পুরুষেরা তাদের ছোট ভাইয়ের বৌ বা ভাইপো দের উপর বৌ কেনার দায় দিত যাতে ভবিষ্যতে শ্রমশক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া বৌ বন্ধক রাখা(tien-ch’i) বা চুক্তি মত সময়ের(tsu-ch’i) জন্য বৌ পাওয়া যেত। গরীবেরা এই ভাবেই বৌ পেত।Fu-chien, Che-chiang, Chiang-hsi প্রভৃতি প্রদেশে এইসব প্রথা চালু ছিল।
যারা বৌ ভাড়া দিত বা বন্ধক দেওয়া নেওয়া করত উভয়েই ছিল দরিদ্র শ্রেণীর। এইসব ভাড়া বা বন্ধকী বৌদের গর্ভে যে সন্তান জন্মাত তাই ছিল লাভ ও শ্রম শক্তির উপায়। এবং সন্তানেরা একই সিস্টেমে ক্রীতদাসের মত কেনা বেচা হত।বৌয়েরা যদি পরকীয়া করত, মালিক জানেনা ভান করে থাকত বা উপেক্ষা করত কারণ বৌ ছাড়া মানে অনেক ক্ষতি।
১৯৩১ সালে (Chiang-hsi Soviet Republic) সোভিয়েটে বিয়ের নতুন প্রথা হয়েছিল, চীনে সেটা হতে অনেক দেরী হয়েছ, কারণ চীন বার বার আইন পাল্টেছে । শেষ ১৯৫০ সালে বিয়ের সংস্কার পরিণতি পায়।নতুন বিয়ের আইনে ছেলেরা ২০ আর মেয়েরা ১৮তে বিয়ে করতে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আগে অনেক কম বয়সে বিয়ে হত। আর সন্তানের দায় নারী বা পুরুষের মধ্যেকার বিষয়। কোন ধর্ম বিয়েতে সমস্যা করতে পারতনা নতুন নিয়মে।রাশিয়ার মতো মুক্ত বিয়ে ছিলনা। একজন একজনেই সীমা বদ্ধ থাকবে। সমান অধিকার নরনারীর, চীনকে তার সামন্ত তান্ত্রিক প্রথা যা ছিল আগে তার সাথে কিছুটা বোঝাপড়া করতে হয়েছিল।