সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৬২)

পুপুর ডায়েরি

ইস্কুলের শুরু শুরুতে স্টুডেন্টদের সংখ্যা কম ছিলো। আমরা এ আর বি সেকশন অনেক ক্লাস একসাথে বসেই করতাম। মর্নিং আর আফটারনুন দুটো পরিষ্কার ভাগ। দু ভাগেই দুটো সেকশন। নন্দিতা দাশগুপ্ত আমার সেই ছোট্ট বেলার বেষ্ট ফ্রেন্ড। আমরা পাশাপাশি বসতাম। ওর বোন, সঞ্চিতা, একটু লম্বাটে গড়ন। আমাদের থেকে অল্প ছোটো। খুব শান্ত ছিলো, চুপচাপ। আর নন্দিতা একটু গোলগাল, মিষ্টি, দু দিকে দুটো কোঁকড়াচুলের ঝুঁটি। খুব ভালো মানুষ সে বরাবর। ওর মা, মাসিমার সঙ্গে আমার মায়ের খুব ভাব। তাই ইস্কুল ছুটির পরে আমি, নন্দিতা আর সঞ্চিতাকে সামনে ছেড়ে দিয়ে দুই মা আস্তে আস্তে গল্প করতে করতে আসতেন সাউদার্ন অ্যাভিনিউর ফুটপাথ ধরে।

তখন তো সাউদার্ন অ্যাভিনিউ ফাঁকা রাস্তা। রাস্তার ধার সাজানো ছিলো ফুলের গাছে সারি সারি। পাশে গোল গোল লোহার ঢাকা দেয়া জলের সোর্স ছিলো। মা বলতেন গঙ্গার জল পাইপের মধ্যে দিয়ে এইগুলোতে এসে পৌঁছায়।সেখান থেকেই জল নিয়ে করপোরেশনের লোকেরা রেগুলার পরিষ্কার ঝকঝকে করে রাখতেন রাস্তাঘাট। রিকশা করে যেতে যেতে দেখতে পেতাম। দক্ষিণ কলকাতার রাস্তায় চলা একটা আরামের ব্যাপার ছিলো তখন। মায়েরা গল্প করতে করতে আসতেন সাউদার্ন অ্যাভিনিউর বাস স্টপেজ পর্যন্ত। নার্সারি টু – তে একদিন বেরিয়ে দেখি ইস্কুলের সামনেই একটা টানা রিকশা রাখা আছে। লোহায় মোড়া লম্বা কাঠের হ্যান্ডেল দুটো নীচে নামানো মাটি ছুঁয়ে। নন্দিতারা দু বোনে উঠে বসে বলল,এই, রিকশা চড়ি?? আমি হাতলের ভেতরে গলে গিয়ে বললাম, চড়, তোরা বস, আমি টেনে দিচ্ছি। রোজ দেখি ত কাকুকে টানতে। এ আর ভারি কথা কী? এই বার হাতলের মধ্যে গলে গিয়ে মাটি থেকে হাতল তুলে নিলাম। ওরা হেসে কুটিপাটি, একটু বোধহয় চেঁচালোও সাথে, ভয় পেয়ে। আমি ততক্ষণে রিকশাশুদ্ধু দু চার পা হেঁটে ফেলেছি…..

এই বার মায়েরা দেখতে পেয়ে গেলেন! সে কী চীৎকার, দৌড়ে এসে আমার কাছ থেকে হ্যাণ্ডেল নিয়ে, ওদের কোলে করে নামিয়ে, উফফ, কী যে বকুনি খেলাম!! কিন্তু খুব খারাপ চালাইনি, সত্যি, ফেলেও দিইনি। আজও বুঝি না এত বকুনি দেবার কী ছিলো বাবা। অথচ নন্দিতা এই পঞ্চাশ পেরিয়েও ফেবুতে লেখে, সেই রিকশা চড়ার কথা ভুলতে পারেনি। আচ্ছা, যদি সে দিন ওদের সেই রিকশায় না চড়াতাম, এই ছবিটা পেত কী?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।