T3 || শ্যামা আমার || দীপাঞ্জলী সংখ্যায় জয়িতা ভট্টাচার্য

বিপ্লবের নারী
অশ্বযুধা বা কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় চতুর্ভুজা,কৌশিকা,শ্যামা,কালী……মায়ের পুজো।
অনার্য এ দেবী এনিগ্মা আজও। তিনি আবহমানকে গ্রাস করেন ,তিনি যৌনতার দেবী,প্রণয়ের দেবী । আবার প্রজননের ও মাতৃরূপী দেবী তিনি।তিনি মনের অন্ধকার নাশ করে অকৃত্রিম সুভাষিত করেন মন।স্বামিজী বলেছেন হৃদয়ে দ্বৈত সত্ত্বার সহবাস ,শুভ -অশুভ,নারী-পুরুষ।আলো থাকলে অন্ধকারও থাকবে।প্রাসঙ্গিকভাবে,কালীপূজার মাধ্যমে সমাজে সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিবাদ করার প্রেরণা পাওয়া যায়।এ পূজার মাধ্যমে সামাজিক বন্ধনও স্থাপিত হয়।কালীপূজার মাধ্যমে গুরুজনদের সম্মান করার আদর্শ স্থাপিত হয়।কালীদেবীর মূর্তি জ্ঞান, কর্ম,কর্মফল ও ত্যাগের তাৎপর্য তুলে ধরে।কালীপূজার মাধ্যমে মোক্ষলাভও হয়।কালীদেবীর কোমরের হাতগুলো কর্মের তাৎপর্য তুলে ধরে ও শ্মশানবাস জীবনের শেষ পরিণতিকে নির্দেশ করে।এছাড়া বলা হয়েছে মুন্ডগুলো জ্ঞানের ধারক।যে অনার্য নারী নিম্ন জাতীয় আদিবাসীদের বা বিধর্মীদের নিধন (যাদের দানব বলে ঘৃণা করা হয়েছে) করে আর্যদেরও মন জয় করেছেন,তাঁর পার্বতী বা আর্যরূপের খন্ডিত যোনি পুজ্য পুরুষের কাছে।কি ভীষণ বৈপরীত্য !
যদিও আইনকানুনের বালাই সে সময় ছিলোনা মনে হয় ।তাই এই সংহার কাহিনী প্রচলিত ।
প্রো-ফেমিনিসমের চূরান্ত রূপ এই কালী।
নারী সর্ব অর্থে বিপ্লবী।
সংসার শ্মশান হলে নারী তা ভেঙে বেড়িয়ে যাবার শক্তি রাখে ।যে নারী কমলে কাহিনী সেই নারী করালবদনা কালী,রক্ষাকালী,জহুরা মা।
পুরুষের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে তাকে প্রণয়াস্ত্রে নাস্তানাবুদ করেন এ নারী ।মাইথোলজি বা পুরান সেকালের সাহিত্য। একালের মতোই তাতে তৎকালীন সমাজের ছবি,কল্পনার, ফিকশনের ,চরিত্র সমাজ ব্যবস্থার স্ট্যান্ডার্ড এবং বাস্তবের প্রতিবিম্ব।
তবে জাতি বিদ্বেষ ও নিম্নজাতিকে সহিংস আক্রমণের গল্পটি তত্কালীন আর্যদের অবদান অবশ্যই।
যে নারী পায়ের তলায় রাখে পুরুষকে সে নারী সর্বনাশের দেবী । সেদিন বাঙালির ডুম্ স ডে ।সেই নারী গৃহে পুরুষের (স্বামী) দ্বারা আজ আইনগত ভাবে ধর্ষিতা ।আমাদের দেশে স্বামীকে দ্বারা ধর্ষণ বেয়াইনি নয়।
যে নারী আলোয় উদ্ভাষিত করে আঁধারমন সেই নারী পথে পড়ে থাকে ক্ষত বি়ক্ষত যোনি নিয়ে ।
আমরা মা কালীকে দেখি ।এক নগ্ন নারী মানুষের মুন্ডু গলায় পড়ে দাঁড়ানো।যদি আজ হয় বাস্তব হতো তবে তো জেল। মেটাফর বটেই।
ষোড়শ খৃষ্টাব্দ অবধি কালীপুজোর তেমন কোনও ইতিহাস নেই। নবদ্বীপে আগেভাগেই ও নিগম বাগীশেষর তন্ত্র সাধনা বিখ্যাত। অষ্টদশ শতকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ধূমপান করে কালী পুজোর প্রচলন করেন। পরে ধনী বাড়িতে ও ডাকাত সম্প্রদায়ে এই পুজো সমারোহ করে হতে লাগল। ডাকাত কালীর কথা বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে দেখা যায়।শান্ত পুজো নামে পরিচিত কালী পুজোয় আগে নরবলী হতো।১০৮ ছাগ বলি হয় গর্ব করে বলা হতো।আজও হয় বলি ।ভক্তির প্লাবন ডাকে বিভৎ রক্তপাতে।
তবে একটা সময় প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় ছিল জনসংখ্যা কম ছিল বলে।বৃহদারণ্য উপনিষদে মহিষ বলির কথা আছে পুত্র আকাংখায়।তবে
মনের পশুকে নিধন যদি উদ্দেশ্য হয়
তবে অন্য ধর্মে একই প্রথা থাকলে তা ছি ছিক্কার হয় কেন?
যারা কামাখ্যায় (কিরাত জাতির উপেক্ষিত দেবী)র যোনি পূজো করেন তাঁরা বাস্তবে সেই যোনি যা প্রণয়ের ও সৃষ্টির উত্স ,তাকে কতটা সম্মান দেন???
যারা মেয়েরা সংক্ষিপ্ত পোষাক পড়লে জিভ বার করেন তাঁরাই আবার নগ্ন কালীকে পভক্তিভরে দেখন ।
এদেশে বা ঘটিদের এদিন অলক্ষ্মী বিদায় করে ধন লক্ষ্মীর আবাহন।মাটির তিনটি মণ্ডল মুখ চোখ দাগ দিয়ে কুলো পিটিয়ে দল বেঁধে জলে ফেলা হয়।
তারপর রাতে পুজো শুরু।
সারা ভারতেই এই ধনলক্ষ্মীর পুজো হয়।অর্থাৎ আমাদের ধর্মীয় কালচারেও যতই ভক্তি ও ত্যাগের দিক থাকুক অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রসারের ওপর সমান জোর দেওয়া হয়েছে।ধন ও মান কে গুরুত্ব ও স্বীকৃতি দিয়ে এই ধনলক্ষ্মীর পুজো।
আদিবাসী নারী নেত্রীর উপাখ্যান দ্রাবিড় দেশেও সুপ্রাচীন ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
ধর্মকে যুক্তি দিয়ে মানলে এ দিপাবলী সত্যি মনের অন্ধকার দূর করবে ,খারাপ চিন্তা কে নাশ করবে।রেসিজিমের বিরুদ্ধে পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নারীর চিরন্তন জীবনযুদ্ধের প্রতীক মহাকালী।মনের গ্লানি,সংকোচ অশিক্ষার আঁধার ঘুচিয়ে অবসাদ আর বিষাদের কালো জয় করার উৎসব দীপাবলী।
জয় মা